সালটা ১৯৮৭। ফরওয়ার্ড ব্লকের রাজ্যের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক অশোক ঘোষ পুরুলিয়ায় বলেছিলেন, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মজয়ন্তীতে কুচকাওয়াজের ব্যবস্থা করতে হবে। ওই কুচকাওয়াজের মধ্য দিয়ে দেশনায়ককে এমনভাবে সম্মান জানাতে হবে যা মানানসই হয়। নেতার নির্দেশের পরেই শুরু হয়ে যায় কাজ। ১৯৮৮ সালের ১ জানুয়ারি নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজের অনুপ্রেরণায় পুরুলিয়া ফরওয়ার্ড ব্লকের তৎকালীন লাল দুর্গ বাঘমুন্ডির সুইসা-নোয়াডি এলাকায় নেতাজি প্রেমে ডুবে থাকা মানুষজন মিলে গঠন করেন আজাদ হিন্দ বাহিনী। যা ফরওয়ার্ড ব্লকের আজাদ হিন্দ স্বেচ্ছাসেবক বা ভলান্টিয়ার বাহিনী বলে পরিচিত।
১০০ জন যুবক- কিশোরকে নিয়ে গঠিত হয় এই বাহিনী। যার প্রথম কমান্ডার ইন চিফ ছিলেন মহেশ্বর কুইরি। আজ তিনি বয়সের ভারে ন্যুব্জ। বয়স ৮৪। মারা গিয়েছেন নেতা অশোক ঘোষ। কিন্তু ফরওয়ার্ড ব্লকের ভরাডুবির পরেও ওই নেতার অবর্তমানে নেতাজির আদর্শে গঠন হওয়া আজাদ হিন্দ বাহিনী আজও রয়েছে। অতীতের সেই বাহিনীর গরিমা আজ আর নেই। কিন্তু শুক্রবার দেশনায়কের জন্মদিনে পুরুলিয়ার বাঘমুন্ডির সেই সুইসা জনপদের নেতাজী সুভাষ আশ্রমে ওই বাহিনী কুচকাওয়াজ করবে। তবে ওই বাহিনীর যুবকরা নন। বিভিন্ন জায়গায় কাজের সূত্রে তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলেও ওই বাহিনীর 'বসন্ত ব্রিগেড' অর্থাৎ ৩ বছর থেকে ১৩ বছর বয়সী পর্যন্ত কিশোররা তাদের কুচকাওয়াজ প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে স্যালুট জানাবেন নেতাজিকে। এই বাহিনীর তৎকালীন সর্বকনিষ্ঠ সদস্য ছিল মাত্র ৪ বছর বয়সের নোয়াডি গ্রামের বাসিন্দা রুদ্রশঙ্কর কুইরি। সেই সময় তার প্যারেড নজর কেড়েছিল। আজ তার বয়স ১২ বছর। এখনও সে ওই বাহিনীতে রয়েছে।
আজও এইভাবে কুচকাওয়াজের মহড়া চলে আজাদ হিন্দ বাহিনীর। নিজস্ব চিত্র
১৯৬৪ সালে নেতাজি প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়েই সেই সময় কংগ্রেসের অত্যাচার, জুলুমবাজি, নির্যাতনের বিরুদ্ধে ফরওয়ার্ড ব্লকের যুবকরা তৈরি করেছিলেন সুভাষ সেনা। যার নেতৃত্বে ছিলেন ২২ বছর বয়সী বাঘমুন্ডি ব্লকের তুনতুড়ি- সুইসা গ্রাম পঞ্চায়েতের ওই মহেশ্বর কুইরি-ই। পরবর্তীকালে ওই সুভাষ সেনা গড়ে উঠেছিল হাওড়ার উলুবেড়িয়াতে ওই এলাকার ফরওয়ার্ড ব্লক নেতা নানু ঘোষের নেতৃত্বে। ফরওয়ার্ড ব্লকের তৎকালীন রাজ্য সম্পাদক অশোক ঘোষের আদেশের পর পুরুলিয়ার ওই সুভাষ সেনা আজাদ হিন্দ বাহিনীতে রূপ পায়। যা বাংলার মধ্যে পুরুলিয়া ছাড়া আর কোথাও নেই।
ওই বাহিনীর প্রথম কমান্ডার ইন চিফ পুরুলিয়া শহরের রাঁচি রোড বাই লেনের বাসিন্দা মহেশ্বর কুইরি বলছিলেন, "আমাদের প্রয়াত নেতা অশোক ঘোষের আদেশ অনুযায়ী নেতাজির আদর্শ ও অনুপ্রেরণায় গঠিত হওয়া আজাদ হিন্দ বাহিনী শুধু কুচকাওয়াজ নয়। এলাকার অন্যায়, অবিচার সেই সঙ্গে দলের বিভিন্ন সম্মেলনে স্বেচ্ছাসেবকের ভূমিকায় থেকে সমস্ত কর্মসূচিকে সফল করা অন্যতম বড় দায়িত্ব ছিল। দেশ-বিদেশ থেকে যে কমরেডরা বাংলায় আসতেন। আমাদের কার্যকলাপ দেখতেন তাদেরকে গার্ড অফ অনার দিতাম আমরা।" এখন ওই কমান্ডার ইন চিফের দায়িত্বে রয়েছেন ওই বাহিনীর একসময় অ্যাসিস্ট্যান্ট কমান্ডারের দায়িত্বে থাকা তথা মহেশ্বর কুইরির ছেলে ৫৮ বছরের হরিশঙ্কর কুইরি। তিনি পেশায় পুরুলিয়া আদালতের আইনজীবী। পেশাগত নানান কাজের মধ্যেও ওই বাহিনীকে বাঁচিয়ে রেখেছেন ফরওয়ার্ড ব্লকের এই কঠিন সময়েও।
ফরওয়ার্ড ব্লকের তৎকালীন রাজ্য সম্পাদক অশোক ঘোষ। নিজস্ব চিত্র
তিনি বলেন, " সেই সময় ১০০ জনকে নিয়ে তৈরি হয়েছিল ওই বাহিনী। এই সংখ্যাটা বহুদিন ধরে রাখা গিয়েছিল। পরবর্তীকালে ধাপে ধাপে সংখ্যাটা কমতে থাকে। আমরা একেবারে বালক থেকে এই বাহিনী তৈরি করার চেষ্টা করলেও আজ আর ওই বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ১০০ নেই। বালক থেকে কিশোরদেরকে নিয়ে ওই বাহিনীকে কোনভাবে বাঁচিয়ে রেখেছি। সেই বাহিনী ২৩ শে জানুয়ারি দেশনায়ককে শ্রদ্ধা জানাবে।"
তবে ফরওয়ার্ড ব্লকের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য অসীম সিনহা বলেন, "দলীয়ভাবে আমাদের আলোচনা হয়েছে। আমাদের প্রয়াত নেতা অশোক ঘোষের আদেশ অনুযায়ী নেতাজির আদর্শ ও অনুপ্রেরণায় গঠিত হওয়া ওই বাহিনীকে আমরা আবার ঢেলে সাজাবো। " তাই ওই বাহিনীর পরবর্তী কমান্ডার ইন চিফ কে হবেন তাও দল চিহ্নিত করে রেখেছে। ওই এলাকার তুনতুড়ি হাইস্কুলের শিক্ষক তথা নোয়াডি গ্রামের বাসিন্দা দেবাশিস প্রসাদকে এই দায়িত্ব দেওয়া হবে। এই বাহিনীর যেমন পৃথক পতাকা রয়েছে। তেমনই রয়েছে লোগো। তাদের পোশাক একেবারে জলপাই। রয়েছে ব্যাজ। এই বাহিনীর সকলের হাতে লাঠি থাকলেও কমান্ডার ইন চিফ তরোয়াল নিয়ে গার্ড অফ অনার দেন। দলের দ্বাদশ পার্টি কংগ্রেসে নিউ দিল্লির তালকোটরা ইনডোর স্টেডিয়ামে ১৯৯১ সালের ১০ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি এই বাহিনী আলাদাভাবে নজর কেড়েছিল।
তারপর চিন, জাপান, কোরিয়া, ভিয়েতনাম, বাংলাদেশ, রাশিয়া, নেপাল থেকে কমিউনিস্টরা যখনই বাংলায় এসে ফরওয়ার্ড ব্লকের কার্যকলাপ দেখতেন। বিভিন্ন কাজের আদান-প্রদান হতো তখন পুরুলিয়ার বাঘমুন্ডির সুইসা, নোয়াডি ওই এলাকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের যুবক-কিশোরদের নিয়ে গঠিত এই বাহিনীর ডাক পড়তো। প্রাক্তন সেনাপ্রধান শঙ্কর রায়চৌধুরী থেকে ফুলনদেবীকেও এই বাহিনী গার্ড অফ অনার দিয়েছিল। ওই বাহিনীর বর্তমান কমান্ডার ইন চিফ হরিশংকর কুইরি বলেন, "বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুকেও আমরা গার্ড অফ অনার দিয়েছিলাম। ১৯৯১ সালে তিনি লোকসভা ভোটের প্রচারে পুরুলিয়া শহরের এমএসএ ময়দানে এসেছিলেন। আমাদের কুচকাওয়াজ দেখে আমাকে পিঠ চাপড়ে বাহবা জানিয়েছিলেন। "
তৎকালীন বিহারে পুরুলিয়ার বাঘমুন্ডি থেকে কিছুটা দূরে ১৯৪০ সালের মার্চে রামগড়ে আপোষ বিরোধী সম্মেলনে নেতাজিকে দেখে অভিভূত হয়ে গিয়েছিলেন এই এলাকা থেকে সেখানে যাওয়া যুবকরা। সেই নেতাজি প্রেমে সুইসাতে ১৯৬২ সালে গড়ে ওঠে নেতাজী সুভাষ আশ্রম। তারপর ওই আশ্রমের ছত্রছায়ায় নেতাজী সুভাষ ডেলি মার্কেট, নেতাজি সুভাষ লাইব্রেরি, নেতাজি সুভাষ আশ্রম মহাবিদ্যালয় গড়ে ওঠে। প্রয়াত নেতা অশোক ঘোষ বলে গিয়েছিলেন, মৃত্যুর পর তাঁর দেহ যেন ওই সুইসা আশ্রমে সমাধিস্থ করা হয়। দলীয় নেতারা সেই কথা রেখেছেন।
প্রয়াত নেতার ৮০ তম জন্মবার্ষিকীতে যে 'মহীরুহ' নামে যে সম্মাননা গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল সেখানে এই বাহিনীর কথা উল্লেখ রয়েছে। যা তুলে ধরেছিলেন তৎকালীন কমান্ডার ইন চিফ মহেশ্বর কুইরি। এই পুরুলিয়া অর্থাৎ সাবেক মানভূমে যে বারবার এসেছিলেন নেতাজি। ১৯৩৯ সালে ৯ই ডিসেম্বর নবগঠিত ফরওয়ার্ড ব্লকের সাংগঠনিক শক্তির বিকাশ ও প্রসারের কাজে জ্বর গায়ে মোট ৩০ টি সভা করেছিলেন। তারপরেই নেতাজি আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে যায় সাবেক মানভূমের এই বিস্তীর্ণ এলাকা।
