স্টাফ রিপোর্টার, বর্ধমান: সাঁতারই যেন মিলিয়ে দিল কালনার সায়নী ও বর্ধমানের তপতীদেবীকে। সায়নী দাসের ইংলিশ চ্যানেল জয়ের রোমাঞ্চকর ঘটনার থেকে কোনও অংশে কম নয় তপতী চৌধুরির বেঁচে থাকার লড়াই। তরুণী সায়নী জলের সঙ্গে যুঝেছেন বিশ্বজয়ের জন্য। টানা চোদ্দো ঘণ্টা আট মিনিট। আর বছর বাষট্টির তপতীদেবী প্রাণ বাঁচাতে সংগ্রাম চালিয়েছেন। বারো ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে হাবুডুবু খেয়েছেন ভরা দামোদর ও মুণ্ডেশ্বরী নদীতে। শরীর সায় না দিলেও বেঁচে থাকার লড়াইয়ে হাল ছাড়েননি। সাঁতরেছেন আশি কিলোমিটারেরও বেশি। সায়নীর মতো জয়ী হয়েছেন তিনিও। জীবন সংগ্রামে জয়ী হয়ে বলেছেন, “নতুন প্রজন্মকে বলব, সবাই সাঁতার শেখো।”
বর্ধমান শহরের কালীবাজারের বাসিন্দা তপতীদেবী। বর্ধমান থানার বসতপুর কুচুট করমারপাড় শিশু শিক্ষাকেন্দ্রের শিক্ষিকা তিনি। ডিভিসি ব্যারাজ জল ছাড়ায় বর্ধমানের সদরঘাটে ভরা দামোদর দেখতে গিয়েছিলেন শনিবার বিকেলে। শহরের অনেকেই গিয়ে থাকেন। সন্ধ্যার পর শহরের জগৎবেড় এলাকায় আত্মীয়বাড়িতে ফেরার কথা ছিল তাঁর। সদরঘাটে আচমকা প্রকৃতির ডাক আসে। তার পর হাত-পা ধুতে দামোদরের একবারে ধারে চলে যান। পাড়ের মাটি আলগা থাকায় ধসে যায় মাটি। দামোদরের জলে ভেসে যান তিনি । প্রবল স্রোত টেনে নিয়ে যেতে থাকে তাঁকে। স্রোতের বেগ এতটাই বেশি ছিল যে অল্প সময়ের মধ্যেই সদরঘাট থেকে অনেকটা দূরে চলে যান।
[জলমগ্ন খানাকুলে নাতিকে বাঁচাতে গিয়ে ভেসে গেলেন দাদু]
ছোটবেলায় শেখা সাঁতারের জোরে প্রবল স্রোতকে উপেক্ষা করে শরীরটাকে ভাসিয়ে রাখেন। হাত তুলে কয়েকবার পাড়ের লোকজনের প্রতি ইশারাও করেন তিনি। কিন্তু অন্ধকারে কেউই তাঁকে দেখতে পাননি। স্রোতের টানে ভেসে যেতে থাকেন তপতীদেবী। দামোদর নদ হয়ে স্রোতের বেগ তাঁকে টেনে নিয়ে যায় মুণ্ডেশ্বরী নদীতে। বাড়তে থাকে রাত। ভাসতে থাকেন তপতীদেবী। বর্ধমান, রায়না, জামালপুর, হয়ে হুগলি জেলায় প্রবেশ করেছেন কখন, বুঝতেই পারেননি। পাড়ের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলেও পারেননি। জলের সঙ্গে লড়তে লড়তে কখন যে ভোরের আলো ফুটে গিয়েছে টের পাননি বৃদ্ধা। হাত-পা অসাড় হয়ে এসেছে তখন। দম ধরে রাখতে পারছেন না। কিন্তু কথায় আছে রাখে হরি মারে কে। হঠাৎ নজরে পড়ে একটা ভুটভুটি। কোনওক্রমে হাত দিয়ে ইশারা করেন তপতী। ভুটভুটি তাঁর কাছে আসে। পাঁচ-ছয়জন মিলে তাঁকে টেনে তোলেন জল থেকে। ঘটনাস্থল হুগলির পুড়শুরার মারকুণ্ডা ফেরিঘাট। ভুটভুটিতে ওঠার পর প্রায় সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন তিনি। নাক দিয়ে রক্ত পড়তে থাকে। তাঁকে স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়।
রবিবার রাতে কালীবাজারের বাড়ির বিছানায় শুয়ে তপতীদেবী বলেন, “রক্তবমিও হয় আমার। ওই ডাক্তার আমাকে ওষুধ ইনজেকশন দেন। গরম দুধ, চা খেতে দেওয়া হয় আমাকে।” তাঁকে উদ্ধার করে তারকেশ্বরে তাঁর বোনের ঠিকানায় খবর দেন উদ্ধারকারীরা। তার পর বর্ধমানের বাড়িতেও যোগাযোগ করা হয়। স্থানীয় পঞ্চায়েতের মাধ্যমে খবর পেয়ে পরিবারের লোকজন তপতীদেবীকে এদিনই বর্ধমানে নিয়ে আসেন। তাঁকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয় বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসা করিয়ে বাড়ি ফেরেন তপতীদেবী।
[১৯৭৮-এর বন্যার স্মৃতি ফিরল, উদ্বেগ মুখ্যমন্ত্রীর]
The post ১২ ঘণ্টা দামোদরে ভেসেও বাঁচলেন বৃদ্ধা appeared first on Sangbad Pratidin.
