সৌরভ মাজি, বর্ধমান: ছেলে খুব চঞ্চল। সাধুবাবার নিদান, রাতের অন্ধকারে দামোদরের চরে ছেলেকে হাঁটু অবধি পুঁতে দিয়ে চলে আসতে হবে। রাত পোহালেই। ছেলে শান্ত হয়ে যাবে। সাধুবাবার প্রতি অনন্ত বিশ্বাস। আর তা থেকেই অমানবিক কাজ করলেন বাবা-মা। তাতে মদত দিলেন দাদুও। ঘুটঘুটে অন্ধকারে ছেলেকে সত্যিই দামোদরের চরে হাঁটু পর্যন্ত বালিতে পুঁতে দিয়ে আসেন তাঁরা। এমনই হাড়হিম করা ঘটনার সাক্ষী হল পূর্ব বর্ধমান। তবে ৯ বছরের ওই নাবালককে গ্রামবাসী ও ভিলেজ পুলিশের সহায়তায় উদ্ধার করেছে পুলিশ। আপাতত তাকে রাখা হয়েছে সরকারি হোমে।
ওই নাবালকের বাবা অর্কদ্যুতি বিশ্বাস, মা সুস্মিতা বিশ্বাস ও অর্কর শ্বশুর সুব্রত জোয়ারদারের ঠাঁই হয়েছে শ্রীঘরে। সাধুবাবা যিনি অনন্তবাবা নামে ভক্তদের কাছে পরিচিত তাঁর সন্ধান শুরু করেছে পুলিশ। বিচারক অর্কর তিনদিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন। বাকিদের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠিয়েছে আদালত। এমন মধ্যযুগীয় ঘটনায় শোরগোল পড়েছে জেলায়। জেলাশাসক পূর্ণেন্দুকুমার মাজি জানান, ‘‘আশ্রমের এক সাধুবাবার নির্দেশে তার বাবা-মা ৯ বছরের একটি শিশুকে কীভাবে দামোদরের চরে ওইভাবে রেখে এসেছে তা ভাবতেই অবাক লাগে। একটি বাচ্চা খুব চঞ্চল বলে এভাবে তাকে বালির মধ্যে রেখে চলে আসাটা অমানবিক। এই কুসংস্কারের বিরুদ্ধে স্থানীয় পঞ্চায়েতকে নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে।’’
[আরও পড়ুন: ‘মমতাদি সব জানে, আমি দলের সঙ্গে আছি’, ফের নিজেকে ‘নির্দোষ’ দাবি জ্যোতিপ্রিয়র]
তিনি জানিয়েছেন, আইন আইনের পথে কাজ করছে। পুলিশ তদন্ত করছে। গ্রেপ্তারও হয়েছে কয়েকজন। জেলার পুলিশ সুপার আমনদীপ বলেন, ‘‘তদন্তে আরও যাদের নাম আসবে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’ জানা গিয়েছে, অর্কদের বাড়ি নদিয়ার চাকদহের নরেন্দ্রপল্লি কদমতলায়। পূর্ব বর্ধমানের রায়নার শিয়ালির এই আশ্রমের সঙ্গে ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সম্পর্ক রয়েছে অর্কদের। আশ্রমের অনন্তবাবার ‘অন্ধ ভক্ত’ তাঁরা। বর্তমানে শিয়ালিতে বিশাল এলাকাজুড়ে থাকা এই আশ্রমে থাকতেনও অর্করা। কয়েকদিন আগে তৃতীয় শ্রেণির পড়ুয়া ছেলের অতি চঞ্চলতা নিয়ে সাধুবাবাকে জানিয়েছিলেন। তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, ওই সাধুবাবা তখন নিদান দেন, ‘ছেলেকে রাতের অন্ধকারে দামোদরের চরে নিয়ে গিয়ে বালিতে হাঁটু পর্যন্ত পুঁতে ফেলে রেখে আসতে হবে। তাতেই শায়েস্তা হয়ে যাবে ছেলে। ছেলে কোথাও যাবে না। তোদের কাছেই ফিরে আসবে।’
গুরুদেবের নির্দেশ যেন দৈববাণী। তা মেনে নিতে কুণ্ঠাবোধ জাগেনি বাবা-মায়ের। সাধুবাবার কথামতো মঙ্গলবার গভীর রাতে সেটাই করে অর্ক ও তার স্ত্রী। ছেলেকে দামোদরের চরে ওইভাবে পুঁতে রেখে আশ্রমে চলে আসে অর্করা। তারপর নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ে আশ্রমে। ওই নাবালক শুনশান নিশুতি রাতে দামোদরের চরে একা একা ভয়ে কাঁপতে থাকে। কান্নাকাটি শুরু করে। একসময় বালির নিচে থেকে পা টেনে বের করে লোকালয়ে চলে আসে। কান্নার আওয়াজ শুনে গ্রামবাসীরা ওই নাবালকের কাছে আসেন।
ভিলেজ পুলিশের নজরে আসে। খবর পায় রায়না থানার পুলিশ। ওই নাবালককে নিয়ে আশ্রমে যায়। অনেক ডাকাডাকিতেও কিন্তু কেউ দরজা খুলছিল না। মিনিট চল্লিশ পরে দরজা খোলে। সুস্মিতাকে বুঝিয়ে থানায় নিয়ে যাওয়া হয় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। সেখানে পুরো ঘটনা ও সাধুবাবার নিদানের কথা জানতে পারে পুলিশ। বুধবার শিশুকল্যাণ সমিতির সদস্যরা ওই নাবালককে হোমে রাখার ব্যবস্থা করেন। অর্ক-সহ অন্যান্যরা অবশ্য গা ঢাকা দেয় আশ্রমে পুলিশকে দেখে। সুস্মিতার কাছ থেকে অর্কর মোবাইল নম্বর নিয়ে তার লোকেশন ট্র্যাক করে পুলিশ। শক্তিগড় থানা এলাকা থেকে তাদের ধরে পুলিশ।
