সৌরভ মাজি, বর্ধমান: দু’জনকে খুন করে প্রমাণ লোপাট করতে রাতের অন্ধকারে দামোদরের চরে দেহ পুড়িয়ে দেওয়া হল। ডাইনি সন্দেহে একই পরিবারের দুই সদস্যকে খুন করা হয়েছে বলে অভিযোগ। খুনের খবর পেয়ে গ্রামে পুলিশ গেলে গ্রামবাসীদের একাংশের বাধায় ফিরে আসে। প্রশাসনের লোকজনকেও বাধার মুখে পড়তে হয়। সংবাদমাধ্যমকে গ্রামে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়। যদিও এই ঘটনার সঙ্গে ডাইনি সন্দেহের কোনও যোগ নেই বলে দাবি করেছে পুলিশ। প্রাথমিক তদন্তে পারিবারিক বিবাদ বা সম্পত্তির লোভেই এই ঘটনা বলে জানিয়েছে পুলিশ।
[গলায় ফাঁস লাগানোর ছবি স্ত্রীকে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে আত্মঘাতী স্বামী]
চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটেছে পূর্ব বর্ধমানের মাধবডিহি থানার নেওর গ্রামের দিঘিরপাড় আদিবাসী পাড়ায়। পুলিশ জানিয়েছে, মৃতরা হলেন মাকু বাস্কে (৬৫) ও মঙ্গল মাণ্ডি (৬০)। সোমবার রাতে তাঁদের প্রথমে মারধর ও তারপর কুপিয়ে খুন করা হয় বলে স্থানীয়দের একাংশের দাবি। মৃত্যু নিশ্চিত করতে মুখে বিষ ঢেলে দেওয়া হয় বলেও গ্রামবাসীদের একটি সূত্রে জানা গিয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর) প্রিয়ব্রত রায় জানিয়েছেন, তাঁরাও তদন্তে জানতে পেরেছেন বিষ খাইয়ে খুন করা হয়েছে। এই ব্যাপারে মঙ্গলবার একটি অভিযোগও জমা পড়েছে বলে খবর। সেই অভিযোগে, ডাইনি সন্দেহে খুন বা পিটিয়ে মারার কথা লেখা নেই বলে দাবি পুলিশের। প্রিয়ব্রতবাবু বলেন, “প্রাথমিকভাবে আমরা জানতে পেরেছি পারিবারিক শত্রুতা বা সম্পত্তির লোভে এই ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।” তবে দেহ পুড়িয়ে দেওয়ায় তদন্তের কাজে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটছে পুলিশের। যদিও মৃতদেহের পোড়া অংশের নমুনা সংগ্রহ করে তদন্ত হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ঘটনায় জড়িত কয়েকজনকে চিহ্নিত করা গিয়েছে। তবে মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি।
গতকাল গ্রামে গিয়ে দেখা যায় পথঘাট শুনশান। কেউই মুখ খুলতে চাইছেন না। কেউ কেউ আবার গ্রামে ঢুকতেও বাধা দেন। স্থানীয় সূত্রে খবর, মৃতদের ভাইপোর নাম বিশু মাণ্ডি। তাঁর স্ত্রী রেখা গত কয়েকমাস ধরে রোগে ভুগছেন। দিন দুই আগে রেখাকে নিয়ে তাঁর স্বামী জামালপুরের রঙ্কিণীতলা এলাকার এক গুনিনের কাছে যান। ওই গুনিনই নাকি দিঘিরপাড় আদিবাসী মহল্লাতে ডাইনি আছে বলে নিদান দেয়। গ্রামের সবাইকে তার কাছে নিয়ে এলে ডাইনিকে চিহ্নিত করে দেবে বলেও জানায় সে। দু’টি ট্রাক্টরে করে নিজের কাকা মঙ্গল মাণ্ডি ও পিসি মাকু বাস্কে-সহ আদিবাসী মহল্লার বেশ কয়েকজনকে সোমবার দুপুরে বিশু ও তাঁর স্ত্রী ওই গুণিনের কাছে নিয়ে যায়। স্থানীয়দের কথায়, মাকু বাস্কে ও মঙ্গল মাণ্ডিই ডাইনি বলে বিশুকে জানায় গুনিন। তারপরই রাতে ঘটে সেই ঘটনা। গ্রামে ফিরে স্থানীয় কয়েকজন মিলে ওই দুজনকে পিটিয়ে খুন করে। মৃতদের অন্য এক ভাইপো গুরুপদ মাণ্ডি জানিয়েছেন, যা পরিস্থিতি তাতে গ্রামের অন্য কোনও ব্যক্তির যদি ফের শরীর খারাপ হয় তাহলেই বিপদ। গুনিনের কথা মেনে ডাইনি সন্দেহে অন্য কাউকেও একইভাবে প্রাণ হারাতে হতে পারে। গুরুপদ বলেন, “ঘটনার বিরোধিতা করায় আমাকেও নির্যাতন সহ্য করতে হচ্ছে।”
[বাড়িতেই আত্মঘাতী ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র, চাঞ্চল্য বালিতে]
খবর পেয়ে রাতে বিশাল পুলিশবাহিনী গ্রামে গেলেও ঢুকতে পারেনি। গভীর রাতে রায়না-২ ব্লকের বিডিও দীপ্যমান মজুমদারও গ্রামে যাওয়ার চেষ্টা করেন। গ্রামবাসীদের একাংশের বাধায় তিনিও ফিরে যান। বিডিও অবশ্য বলেন, “গ্রামের কেউ মুখ খুলতে চাইছে না। পুলিশকে তদন্তের জন্য বলা হয়েছে।” পূর্ব বর্ধমান জেলা পরিষদের সভাধিপতি দেবু টুডু বলেন, “যে কারণেই এই ঘটনা ঘটে থাকুক তা নিন্দনীয়। দোষীদের কড়া শাস্তির ব্যবস্থা করতে পুলিশকে বলা হয়েছে।” অতীতেও দেখা গিয়েছে, সম্পত্তি হাতাতে ডাইনি অপবাদ দিয়ে ঘরছাড়া করা বা পিটিয়ে মারার মত ঘটনা ঘটেছে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গাতে। এই কুসংস্কার দূর করতে ধারাবাহিক সচেতনতা প্রয়োজন।
The post ডাইনি সন্দেহে একই পরিবারের দু’জনকে খুন, তদন্তে বাধা পুলিশকে appeared first on Sangbad Pratidin.
