এবারের বিশ্বকাপে (FIFA World Cup 2026) রেফারিং নিয়ে টুকরো-টাকরা বিতর্ক হয়েছে বটে। তবে শেষ ষোলোয় আর্জেন্টিনা-মিশর মাচের (Argentina vs Egypt ) পর সেই বিতর্ক যেন এভারেস্ট-সম হয়ে উঠেছে। বিতর্কের কেন্দ্রে রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ের একটার পর একটা সিদ্ধান্ত, যা লিওনেল মেসিদের (Lionel Messi) মহাকাব্যিক প্রত্যাবর্তনের পরতে পরতে জড়িত বলে অভিযোগ উঠছে। আটলান্টায় ম্যাচ শেষে ক্ষোভ গোপন করেনি মিশর। কোচ হোসেম হাসান থেকে ফুটবলার মোস্তাফা জিকো-প্রকাশ্যেই ফিফার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে দিয়েছেন। সরাসরিই বলেছেন, আর্জেন্টিনার বিদায় ঠেকিয়ে প্রতিযোগিতার আকর্ষণ ধরে রাখার মানসিকতা থেকেই এহেন পদক্ষেপ করেছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ামক সংস্থা। আর তার বলি হয়েছে মিশরের মতো আন্ডারডগ।
কোন কোন সিদ্ধান্তে বিতর্ক? দ্বিতীয়ার্ধের মাঝে কাউন্টার অ্যাটাক থেকে দুর্ধর্ষ একটা গোল করেছিলেন জিকো। তবে সেই গোল 'ভার' দেখে বাতিল করেন রেফারি। প্রতিআক্রমণের সূচনায় আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে পায়ের পাতায় বুটের স্টাড দিয়ে আঘাতের দায়ে। আবার আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় গোলের আগে তাদের বক্সে মহম্মদ সালাহকে প্রায় একইরকম আঘাত করেন জুলিয়ান আলভারেজ যা উপেক্ষা করেন রেফারি। আবার আর্জেন্টিনার তৃতীয় গোলের আগে তাদের বক্সে জার্সি টেনে হামদি ফাথিকে ফেলে দেন অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। খেলা চালিয়ে যান রেফারি, গোল করে ম্যাচ জেতে আর্জেন্টিনা।
রেফারির এহেন সব সিদ্ধান্তে চটেছেন আনেকেই। ফিফার কর্মকাণ্ড নিয়ে সরব হওয়ার মধ্যে রয়েছেন গ্যারি কাসপারভের মতো বিদগ্ধ দাবাড়ু থেকে কিংবদন্তি ইংলিশ ফরোয়ার্ড অ্যালেন শিয়ারার। ফরাসি রেফারির সিদ্ধান্তে অবাক গ্রাহাম স্কটও। প্রিমিয়ার লিগের এই প্রাক্তন রেফারির ব্যাখ্যা, "জিকোর গোলটা একেবারে ন্যায্য ছিল। গোলের আগে লিসান্দ্রো আর আর্টিনার সংঘর্ষ কোনওভাবেই ফাউল নয়। এছাড়া পুরো বিষয়টি হয়েছে আর্জেন্টিনার গোলের প্রায় উল্টোদিকে। ওদের সুযোগ ছিল মিশরের থেকে বল কেড়ে নেওয়ার। ফলে গোল বাতিলের পর মিশরের ক্ষেপে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ এই ঘটনা ভিএআরের হস্তক্ষেপ করার মতো ছিল না। ভিএআর নিজেদের এক্তিয়ারের বাইরে দিয়ে কাজ করেছে কার্যত। কারণ সাধারণত ভিএআর গোল থেকে এত দূরের ঘটনায় হস্তক্ষেপ করে না। সালাহর ক্ষেত্রেও বলব, ফাউল ছিল না। কারণ দু'পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ এমন কিছু বেশি হানি। ঠিক একই কারণে, লিসান্দ্রোর ক্ষেত্রেও ফাউল ছিল না।"
মেক্সিকান রেফারি ফের্নান্দো গুরেইরোও মানছেন, রেফারির সিদ্ধান্তে সুবিধা পেয়েছে আর্জেন্টিনা। গত বিশ্বকাপে একাধিক ম্যাচ খেলিয়েছেন তিনি। ফাইনালে ছিলেন ভিএআরের দায়িত্বে। সেই ফের্নান্দো বলছিলেন, "জিকোর গোলটার আগে কোনও ফাউল হয়নি। ওই মুহূর্তকে আক্রমণের সূচনা হিসেব দেখাটা ঠিক নয়। কারণ তারপরও আর্জেন্টিনার হাতে অনেকটা সময় ছিল মিশরকে ঠেকানোর মতো। তাছাড়া ওদের ডিফেন্ডাররা নিজেদের জায়গাতেই ছিল। তিন-তিনবার আর্জেন্টিনা বল কাড়ার সুযোগ পেয়েছিল ওই গোলের সময়। ফলে এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে ভিএআরের নীতির বিরেধী। কারণ সেখানে বলা আছে, যদি এমন ঘটনা আর গোলের মাঝে বেশি সময় না থাকে তবেই ভিএআর হস্তক্ষেপ করবে। এখানে ভার ভুল করেছে আর মিশরকে তার মাশুল দিতে হচ্ছে।"
চাঁচাছোলা ভাষায় আক্রমণ শানিয়েছেন জোসে মোরিনহো। তাঁর মতে, "আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে ২-০ গোলে এগিয়ে থাকা কখনও যথেষ্ট নয়। কারণ লড়াইটা প্রতিপক্ষের ১১ জনের পাশাপাশি রেফারি আর ভিএআরের বিরুদ্ধেও। জিকোর ওই অসাধারণ গোলটা বাতিল করার ছিল। তাই ভিএআর অতটা পিছনে গিয়েছিল কারণ খুঁজতে। সালাহকে বক্সে যেভাবে ফাউল করা হল, নিশ্চিত পেনাল্টি। তাতে মিশরের জয়ের সম্ভাবনা বাড়ত। কিন্তু তা হয়নি। উল্টে সেখান থেকে আক্রমণে এসে আর্জেন্টিনা গোল করে গিয়েছে। পুরোটাই এখন যেন সিনেমা-যেখানে ম্যাচের ফলাফল যেন আগে থেকেই নির্ধারিত আছে।
