shono
Advertisement
Purulia

কৃষি বর্ষে অভিনব রীতি, 'ভূত' থেকে বাঁচতে ভৌতিক দেবদেবী-অপদেবতার পুজো পুরুলিয়ায়

সাবেক মানভূমের মানুষজনের বিশ্বাস, এই পয়লা মাঘ আধিভৌতিক দেবদেবীর আরাধনা করলে ভৌতিক বিপদ বা অলৌকিক ঘটনা থেকে রেহাই মিলবে।
Published By: Sucheta SenguptaPosted: 09:38 PM Jan 15, 2026Updated: 09:47 PM Jan 15, 2026

'ভূত' ঠেকাতে ভৌতিক দেবদেবীর পূজার্চনা, অপদেবতাদের আরাধনা! অবাক লাগছে? কিন্তু পয়লা মাঘ, বৃহস্পতিবার আখান যাত্তার দিনে ছোটনাগপুর মালভূমির অন্তর্গত পুরুলিয়ার মানুষজন বিভিন্ন লৌকিক দেবদেবীর সঙ্গে এই ভৌতিক বা আধিভৌতিক দেবদেবীর আরাধনা করলেন। সঙ্গে হয়ে গেল নানা অপদেবতার পুজোও। তবে এসব ভৌতিক দেবদেবীর কোনও মূর্তি বা ছবি নেই। পুরুলিয়া জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন জঙ্গলের বড় বড় টিলা বা পাথরকেই এসব দেবদেবী রূপে দীর্ঘদিন ধরে আরাধনা চলছে।

Advertisement

সাবেক মানভূমের মানুষজনের বিশ্বাস, এই পয়লা মাঘ আধিভৌতিক দেবদেবীর আরাধনা করলে ভৌতিক বিপদ বা অলৌকিক ঘটনা থেকে রেহাই মিলবে। আর তাই কুদরা, গড়ান ভূত, মটকা ভূত, মেছো ভূত, পিলকা ভূত, চুড়িন ভূত, বাসাত ভূতের পুজো হলো পুরুলিয়ার বিভিন্ন জঙ্গলে। সেইসঙ্গে নানান জাগ্রত লৌকিক দেবদেবী তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য খেলাইচণ্ডী, গরাম ঠাকুর, বাঘড়াই বুড়ি, সন্ন্যাসী ব্রহ্মচারী আরও কত কী! আর এই পূজার্চনা ঘিরে হলো হাঁস, মোরগ, এমনকি পায়রা বলিও।

[caption id="attachment_1117097" align="aligncenter" width="720"]

পুরুলিয়া দু'নম্বর ব্লকের
বাঁধগড়ে বাবা বাণেশ্বর। নিজস্ব চিত্র[/caption]

এই দেবদেবীর পুজো করেই পয়লা মাঘে কৃষি বর্ষের সূচনায় জমিতে দু'পাক লাঙল দিলেন কৃষকরা। কৃষি বর্ষকে ঘিরে শত-সহস্র রীতি আর সেভাবে চোখে না পড়লেও এই লাঙল দেওয়ার ছবি আজও দেখা যায়। পুরুলিয়া তথা সাবেক মানভূমের গ্রামীণ সমাজে মাঘের প্রথম দিনটিকে বাংলা নববর্ষ ও অক্ষয় তৃতীয়ার মতই পবিত্র হিসাবে দেখা হয়। এই দিন পুরুলিয়ার গ্রামাঞ্চলের মানুষজন নিজেদের ঘর-দুয়ার নির্মাণের কাজের যেমন সূচনা করেন, তেমনই শুরু করেন নতুন ব্যবসা।

পুরুলিয়ার লোকসংস্কৃতি গবেষক সুভাষ রায় বলেন, "১ মাঘ বিস্তীর্ণ ছোটনাগপুর মালভূমি এলাকায় আখান যাত্তা হিসাবে পালন হয়। এই দিনটি ভীষণই শুভ। জেলা জুড়ে বিভিন্ন লৌকিক দেবদেবীর পূজো হয়। সেই দেবদেবীর পূজার্চনা বছরের অন্যান্য দিন না হলেও এদিন হবেই। আর তারপরেই মানুষজন কৃষি বর্ষের নানান রীতিতে মেতে ওঠেন। যদিও সেই রীতি গুলির অনেকটাই হারিয়ে গিয়েছে। আর এই লৌকিক দেব-দেবীর মধ্যেই ভৌতিক বা আধি ভৌতিক দেব-দেবী রয়েছে। তবে এই দেব-দেবীর পূজা মূলত জঙ্গলেই হয়। কোনও অলৌকিক বিপদ থেকে বাঁচতেই হয় আরাধনা। ঘরে সুখ-শান্তি বজায় রাখতে আমার ঘরেই হল সন্ন্যাসী ব্রহ্মচারীর পূজা। ইনি বাস্তু দেবতা।"

[caption id="attachment_1117099" align="aligncenter" width="1200"]

পুরুলিয়ার বলরামপুরের গরাম ঠাকুরের থান। নিজস্ব
চিত্র[/caption]

রঘুনাথপুর থানার চেলিয়ামা গ্রামে বাগতি পাড়ার শেষ প্রান্তে দুটি পাথরের খণ্ড রয়েছে। তার মধ্যে একটিতে এদিন কুদরার পুজো করা হয়। এছাড়া এই থানার একাধিক গ্রামে ঘরে ঘরে এই ভূতের পূজা করা হয় অলৌকিক বিপদ থেকে বাঁচতে। এই সাবেক মানভূমে আজও একটি প্রবাদ শোনা যায়, "কাল কুদরা বাড়ির ভূত / শূয়র দিলেই চাপ চুপ।" রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী তথা রাজ্য তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক শান্তিরাম মাহাতো বলেন, "আমাদের বাড়িতে বাঘুৎ ঠাকুর রয়েছে। এদিন ওই দেবতার পূজো করি আমরা।" গ্রামীণ লৌকিক দেবদেবীর মধ্যে পাঁচ বহনী, সাত বহনী, বকস অপদেবতার পুজো হয়। এছাড়া শস্য বৃদ্ধিকারী, রোগ বিঘ্ন নাশক, জন্তু জানোয়ার, গৃহে বসবাসকারী, পূর্বপুরুষ দেবতা, পুরাণ দেবদেবীর পুজোয় মেতে ওঠে এই সাবেক মানভূম।

পুরুলিয়ার সাঁতুড়ির লৌকিক দেবী। নিজস্ব চিত্র

ঝাড়খণ্ড ছুঁয়ে থাকা এই জেলায় ডাইনি, ভূত-পেত্নী কুসংস্কারের থাবা দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন বিজ্ঞানমনস্ক সংগঠন থেকে প্রশাসন ধারাবাহিকভাবে সচেতনতার প্রচার চালিয়ে গেলেও ওই কুসংস্কার থেকে জেলাকে মুক্ত করা যায়নি। তাই বিভিন্ন ভৌতিক, অলৌকিক কাণ্ড যেমন সামনে আনা হয়, সেসব ঘটনা ঘিরে নানান অঘটনও ঘটে যায়। আর সেই ভৌতিক বা অলৌকিক ঘটনা থেকে বাঁচতেই দীর্ঘদিনের বিশ্বাস এখনও আঁকড়ে রয়েছে এই জঙ্গলমহলের জেলায়। ওই ভৌতিক দেবদেবীর পূজা না করলে যদি বিপদ হয়? এই আশঙ্কা থেকেই জঙ্গলে গিয়ে রীতিমতো আরাধনা চলে কুকুর কুদরা, কুকুর কুদরী, শুয়রা ভূত, ছাগল্যা ভূতের।

পুরুলিয়ার বরাবাজারের হাতিখেদা। নিজস্ব চিত্র

পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের পুরুলিয়া জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক তথা চিকিৎসক নয়ন মুখোপাধ্যায় বলেন, "এগুলো মানুষজনের দুর্বলতা। অলৌকিক ঘটনা এড়াতেই এইসব পুজো চলে। যদি ওই ভৌতিক দেব-দেবীর পুজোর মধ্য দিয়ে তাদেরকে সন্তুষ্ট করা যায়। তবে বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে এই বিষয়টি আর দেখা যাচ্ছে না। এই বিষয়কে ঘিরে তারা উৎসবে মাতছেন। কিন্তু এসব পূজার্চনায় মিশে যাচ্ছেন না। মানুষজনের সংস্কার থাকুক, বিশ্বাস থাকুক। কিন্তু এইসব ভৌতিক বিষয়কে ঘিরে যাতে মানুষজন প্রতারণার শিকার না হন। মানুষজন যাতে ঠকে না যান সেটা সকলকেই দেখতে হবে।"

এই আখান যাত্তাকে ঘিরে বিভিন্ন লৌকিক দেবদেবীর পুজোর পাশাপাশি পুরুলিয়ায় বেশ কয়েকদিন মেলা চলবে। কিন্তু কৃষি বর্ষকে ঘিরে যে সকল রীতিনীতি ছিল, তার সবগুলো চোখে পড়ছে না। যাঁরা ধান চাষের কাজে যুক্ত থাকেন অর্থাৎ যারা গরু-মহিষ বাছুর মাঠে চরান, লাঙল দেন, জমিতে ধানের চারা পোঁতেন, তাঁদের সঙ্গে এই দিনই চাষাবাদের কাজের বিনিময়ে কত পরিমান ধান দেওয়া হবে তার চুক্তি হতো। কেউ আবার আগাম অর্থ নিয়ে নিতেন। আবার বিভিন্ন বকেয়া এই দিন শোধ হয়ে নতুনভাবে চুক্তি সম্পন্ন হতো।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement