যুদ্ধের 'কাঁটা' এবার দেবদেবীর সেবাতেও। ইরান-ইজরায়েল যুদ্ধের জেরে বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহকারী হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় রান্নার গ্যাসের জোগানে টান পড়েছে। আর তাতেই হাজার হাজার ভক্তের নিয়মিত অন্নসেবা থমকে যাচ্ছে নৈহাটির বড়মা মন্দিরে। আগামী সোমবার থেকে মন্দিরে নিঃশুল্ক অন্নভোগ পরিষেবা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিল মন্দির কর্তৃপক্ষ। মন্দির সূত্রে জানা গিয়েছে, হরমুজ প্রণালী ঘিরে জাহাজ চলাচলে সমস্যা তৈরি হওয়ায় এলপিজি আমদানিতে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। তারই প্রভাব পড়েছে রাজ্যের গ্যাস সরবরাহে। ফলে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক মানুষের জন্য মন্দিরের অন্নশালায় রান্না চালিয়ে যাওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিকল্প ব্যবস্থা করেছে দক্ষিণেশ্বর লাগোয়া আদ্যাপীঠ মন্দির কর্তৃপক্ষ। সেখানে দেবদেবীর সেবাকর্ম বজায় রাখতে ডিজেল চালিত উনুনে রান্নার কথা ভাবা হচ্ছে।
নৈহাটির বড়মার মন্দিরে নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, সোম, বুধ ও শুক্রবার প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭০০ জন ভক্ত এখানে অন্নপ্রসাদ গ্রহণ করেন। অন্যদিকে, শনি ও মঙ্গলবার ভিড় কয়েকগুণ বেশি - সেই দিনগুলিতে প্রায় তিন হাজার মানুষের জন্য ভোগের আয়োজন করা হয়। অর্থাৎ সপ্তাহে কয়েক হাজার মানুষের জন্য এই অন্নসেবাই ছিল নিয়মিত ভরসা। পরিষেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরাসরি প্রভাব পড়বে সেই বিপুল সংখ্যক ভক্তের উপর। এ বিষয়ে বিধায়ক সনৎ দে বলেন, “বড়মা মন্দির ভোগ বিতরণ বন্ধ করতে চাইছে না। সকলের কাছে তারা আবেদন করেছে, আমিও চেষ্টা করেছি। কিন্তু রান্নার গ্যাস সরবরাহে সঙ্কট তৈরি হওয়ায় সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।”
নৈহাটি বড়কালী পূজা সমিতি ট্রাস্টের সম্পাদক তাপস ভট্টাচার্য বলেন, “গ্যাস সরবরাহ কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এত বড় আকারে রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই অনিচ্ছাসত্ত্বেও আগামী সোমবার থেকে পরিষেবা আপাতত স্থগিত রাখতে হচ্ছে। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলেই অন্নভোগ পরিষেবা ফের চালু করা হবে।” আপাতত বড়মার মন্দিরে ভোগের হাঁড়ি ঠান্ডা - আর তার সঙ্গে থমকে গেল হাজার হাজার ভক্তের প্রতিদিনের অন্নপ্রসাদের আয়োজন।
মন্দিরে মন্দিরে ভক্তদের ভোগ বিতরণে কোপ পড়তে চলেছে। নিজস্ব ছবি
একই পরিস্থিতি দক্ষিণেশ্বর রামকৃষ্ণ সংঘ আদ্যাপীঠেও। এই প্রতিষ্ঠানে আবাসিক প্রায় আড়াই হাজার ছাত্রছাত্রী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, বিধবা মা ও সাধু-সন্ন্যাসীর জন্য প্রতিদিন দু’বেলা রান্না করতে হয়। পাশাপাশি প্রতিদিন অন্তত ৫০০ জনকে ‘নরনারায়ণ সেবা’ হিসেবে খাবার দেওয়া হয়। সবমিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার মানুষের জন্য প্রসাদ প্রস্তুত করতে হয়, যা এতদিন সম্পূর্ণই গ্যাসের উপর নির্ভরশীল ছিল। কর্তৃপক্ষের দাবি, এই ভোগ বা সেবার পরিমাণ কমানো সম্ভব নয়। বহু বছর ধরে নির্দিষ্ট নিয়মে নির্দিষ্ট পরিমাণ চাল দিয়ে ভোগ রান্না হয়ে আসছে। সেই প্রথা বজায় রেখেই কোনওভাবে পরিষেবা চালু রাখার চেষ্টা চলছে।
দক্ষিণেশ্বর রামকৃষ্ণ সংঘ আদ্যাপীঠের সাধারণ সম্পাদক ব্রহ্মচারী মুরাল ভাই জানান, আশ্রমে বহু বছর ধরে নির্দিষ্ট পরিমাণ চাল দিয়ে রামকৃষ্ণদেব, আদ্যা মা ও রাধাকৃষ্ণের ভোগ রান্না হয়। সেই নির্ধারিত ভোগ বা নরনারায়ণ সেবা বন্ধ করা সম্ভব নয়। তাঁর কথায়, "গ্যাসের সংকটের কারণে এখন রান্না চালানো কঠিন হয়ে উঠেছে। তাই বিকল্প হিসেবে ডিজেলের উনুন ব্যবহার করে কীভাবে রান্না চালু রাখা যায়, তা নিয়ে ভাবনা শুরু হয়েছে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘদিন থাকবে না বলেই আশাবাদী আশ্রম কর্তৃপক্ষ। তাঁদের আশা, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে গ্যাস সরবরাহও দ্রুত আগের মতো হবে।" আপাতত সংকটের মধ্যেও আদ্যাপীঠে একটাই চেষ্টা, কোনওভাবেই যেন বন্ধ না হয় ভোগ ও নরনারায়ণ সেবা।
