দিব্যেন্দু মজুমদার: জ্বলছে প্রায় শ-দেড়েক মাটির উনুন। মডেল কিচেনের চার দেওয়ালের গণ্ডি ছেড়ে খোলা আকাশের নিচে জমেছে রান্না-বান্না। ব্যস্ত গৃহিণীরা। দূর থেকে দেখে মনে হয় যেন, এ কোনও অভিনব বনভোজনের আসর বসেছে অকালে। অনেকটা সেরকম হলেও, আসলে এর নেপথ্যে মিশে আছে দেবী শীতলার স্বপ্নাদেশ। আর তাই ফাল্গুন মাসের শুক্লা তিথিতে বিশেষ এই দিনটির জন্য সারা বছর ধরে ধরে অপেক্ষা করে থাকেন চুঁচুড়ার দক্ষিণ সিমলা গ্রামের বাসিন্দারা।
[ স্বামীর সঙ্গে বচসার জের, সন্তানকে কুপিয়ে খুন করল মা ]
গত মঙ্গলবার ছিল এই বিশেষ দিন। বছরের এই বিশেষ দিনটিতে কারওর ঘরে উনুন জ্বলবে না। রীতি মেনে শীতলা দেবীর মন্দির সংলগ্ন খোলা মাঠে মাটির উনুন তৈরি করে গৃহিণীরা তাতে রান্না করেন। আর সেই মাটির উনুনে তৈরি করা খাবারই পরিবারের সকলে খান। এলাকার প্রায় সকল বাসিন্দাই তাতে শামিল। কমবেশি শ-দেড়েক মাটির উনুন জ্বলে। এই দিনটিতে ঘরে তৈরি করা রান্না করা খাবার খাওয়া চলবে না, এ নিয়ম মেনে চলেন হাল হামলের ছেলেপিলেরাও।
কিন্তু কোথা থেকে এল এই প্রথা?
কথিত আছে, প্রায় শতাধিক বছর আগে এই গ্রামে বসন্ত রোগ মহামারির আকার ধারণ করেছিল। সেসময় গ্রামেরই সতীশচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়কে মা শীতলা স্বপ্নাদেশ দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমাকে গ্রামে প্রতিষ্ঠা করে আমার মন্দিরের পাশে গ্রামের সকলকে নিয়ে একসঙ্গে খাওয়া দাওয়ার আয়োজন কর।’ এরপরই সতীশচন্দ্রবাবু ১৩২৭ বঙ্গাব্দে মায়ের পঞ্চমুণ্ডির আসন স্থাপন করেন। আর মন্দির সংলগ্ন খোলা মাঠে সেই সময় থেকেই চলে আসছে এই রান্নার আয়োজন। বাড়ির মহিলা মাটির উনুন তৈরি করে তাতে রান্না করেন। আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব মিলে প্রায় দুই হাজার লোক এদিন খাওয়া দাওয়া করেন খোলা আকাশের নিচে। আর দিনের বেলায় বেঁচে থাকা খাবার রাতে বাড়ি নিয়ে গিয়ে খান গ্রামের বাসিন্দারা। কারণ দেবীর স্বপ্নাদেশ, এই দিনটিতে কারওর ঘরে উনুন জ্বালানো চলবে না।
[ বণ্টনে বেনিয়ম, বাঁকুড়ায় সাসপেন্ড রেশন ডিলার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি-সহ তিন ]
বহু বছর ধরে চলে আসায় এ প্রথায় আজও ছেদ নেই। এককালে বসন্তের কোপ ছিল ভারী। তা থেকে বাঁচতেই হয়তো এই প্রথার প্রচলন। প্রবীণরা বলেন, জীবাণু যাতে না ছড়ায়, সে কারণেই এই রীতি। এর পিছনে নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক কারণও আছে। উল্লেখ্য, এই সময় দেবী শীতলার পুজোরও রেওয়াজ আছে বিভিন্ন অঞ্চলে। তবে সময় পেরিয়ে বসন্তের দাপট কমেছে। কিন্তু প্রথার মাহাত্ম্য কমেনি। বরং এখনকার সময়ে এ যেন অনেকটাই হয়ে উঠেছে মিলনমেলা। ব্যস্ত দিনকালে পাড়ার একে অপরের সঙ্গে দেখা হওয়াই ভার। ফলে এই একটা দিন যেন সকলের সঙ্গে সকলের দেখা হওয়ার, ভাবনা আদানপ্রদানের দিন। একসঙ্গে বসে খেয়ে আত্মীয়তা অনভবের দিন। আসেন আত্মীয়-স্বজনরাই। দেবী শীতলার স্বপ্নাদেশ হোক বা অভিনব বনভোজন-চুঁচুড়ার দক্ষিণ সিমলা গ্রামের বাসিন্দারা খাবারের পাশাপাশি চেটেপুটে নেন এই মিলনের আনন্দটুকুও।
The post দেবীর স্বপ্নাদেশ থেকে প্রথার সূচনা, অভিনব ‘বনভোজনে’ মশগুল চুঁচুড়ার গ্রাম appeared first on Sangbad Pratidin.
