সেই মধুর ঝংকার আর কানে বাজে না। ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে সরস্বতীর হাতে থাকা বীণা। তাই বীণাহীন বীণাপানি! এই বাদ্যযন্ত্র আশপাশে সচরাচর চোখে দেখতে পাচ্ছেন না মৃৎশিল্পীরা। আর তাই বিদ্যাদেবীর হাতে বীণার বদলে তাঁরা তুলে দিচ্ছেন তানপুরা। তাতেই পুজো হয়ে যাচ্ছে। বীণার বদলে সরস্বতীর হাতে তানপুরাই এখন ট্রেন্ডিং।
কিন্তু এ যে দর্শনগত ত্রুটি! এনিয়ে প্রভাকর ও সিদ্ধ উপাধি পাওয়া পুরুলিয়া শহরের পুরোহিত আদিত্য ঘোষাল বলেন, "দেবীকে আমরা যেভাবে দেখে এসেছি সেই মাতৃপ্রতিমায় যদি দর্শনগত ত্রুটি থাকে তাহলে কি পুজোতে মন বসবে? পুজো করতে গিয়ে এতো দোষ লাগার উপক্রম। পরিপূর্ণতাই পাচ্ছি না। বিভিন্ন ক্লাব ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সরস্বতী প্রতিমায় দেবীর হাতে দেখছি বীণার বদলে তানপুরা।"
সরস্বতী সেজে উঠছেন তানপুরায়। নিজস্ব ছবি
দেশজ সঙ্গীত চর্চার ইতিহাসে প্রাচীন এই বাদ্যযন্ত্র শিল্পকলার প্রতীক। ঋগ্বেদের মতো প্রাচীন গ্রন্থে বীণার উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু সেই বীণা কার্যত আজ অতীত। শহর পুরুলিয়ার নামোপাড়ার একটি বাদ্যযন্ত্র দোকানের মালিক চন্দ্রনাথ লাই বলেন, "আমাদের ১৮০ বছরের পুরনো দোকান। আমরা ষষ্ঠ প্রজন্ম এই বাদ্যযন্ত্রের ব্যবসা করছি। গত ৩২ বছরে মাত্র একটি রুদ্রবীণা বিক্রি করেছি। গত সাত মাস আগে বরাত পেয়ে তা খদ্দেরের হাতে তুলে দিয়েছি।" এই শহরের মধ্যবাজারের একটি বাদ্যযন্ত্র দোকানের ম্যানেজার বিনোদ আচার্যর কথায়, "আমি গত ৩০ বছর ধরে এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করছি। একটা বীণাও বিক্রি হতে দেখিনি। তবে বেশ কয়েকজন সারাতে নিয়ে আসতেন। তখন আমরা মেরামত করে দিয়েছি। আসলে সিন্থেসাইজারেই বীণা-সহ নানা বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ মিলছে। তাই ওই বাদ্যযন্ত্র আর চোখে পড়ে না।"
সেজে উঠছেন বাগদেবী। পুরুলিয়া শহরের চাষা পাড়ায়। নিজস্ব ছবি
এখন বীণাপানির হাতে থাকা বীণাই বা বাজান ক'জন? এই বাদ্যযন্ত্র বাজাতেও তো পটু হতে হবে। শহর পুরুলিয়ার বেহালা বাদক স্বরূপ চট্টোপাধ্যায় জানান, "বীণা তো আজকাল চোখেই দেখতে পাই না। বাজানো তো দূর অস্ত।" তবে শহর পুরুলিয়ার এই বাদ্যযন্ত্রের দোকানগুলি যদি বছরে একটি বরাত পান, তা কলকাতা থেকে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করেন। আসলে বৈদ্যুতিক তানপুরা বাজারে আসার পর বীণার কদর একেবারেই কমে গিয়েছে। তাছাড়া ওই বাদ্যযন্ত্র দোকানে রেখে বিক্রি করাও বেশ সমস্যার, এমনই বলছেন ব্যবসায়ীরা। কারণ বাদ্যযন্ত্রের নিচের অংশে থাকে লাউ। দোকানে রাখায় তা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়। ক্ষতির মুখে পড়তে হয় ব্যবসায়ীদের।
