চন্দ্রশেখর চট্টোপাধ্যায়, আসানসোল: মা কামিন খাটে বাবুদের বাড়িতে, বাবা ভিন রাজ্যে কাজ করে ইটভাঁটায়। হতদরিদ্র সেই বাবা মায়ের মেয়ে মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হয়েছে প্রথম বিভাগে। ৬৪ শতাংশ নম্বর পেয়ে মাটির কুঁড়েঘরে যেন সাঁঝবাতি জ্বেলে দিয়েছে রিতু বাউরি। তাকে দেখতে আসছে পাড়ার মা-কাকিমারা। শুভেচ্ছা জানিয়েছেন গ্রামের লোকজন। মা মালা বাউরির মুখে চওড়া হাসি। বাবা অর্জুন এখন ঝাড়খণ্ডের রাঁচিতে। রিতু জানায়, তাঁর বাবা বলেছিলেন ‘তুই কিন্তু কামিন হওয়ার লাইগে জন্মাস নাই’। লেখাপড়ার শেখার ‘তেইজটা’ বুকের ভেতর জ্বেলে দিয়েছিল রিতুর মা-বাবা দুজনেই। কুলটির মিঠানি গ্রামের রিতু বাউরির মাধ্যমিকের সাফল্য দেবব্রত সিংহের সেই বিখ্যাত কবিতাকেই যেন মনে পড়িয়ে দিল আরেকবার।
মিঠানি হাইস্কুল থেকে পড়াশোনা রিতু বাউরির। মাধ্যমিকে ৪৫২ পেয়ে ‘এ’ গ্রেডে পাশ করেছে সে। বাংলা, ইতিহাস, ভূগোল, অঙ্ক, বিজ্ঞান প্রত্যেকটি বিষয়ে ‘এ’ ও ‘এ-প্লাস’ পেয়েছে রিতু। অথচ তার ছিল না বাড়তি কোনও টিউশনি। স্কুল শিক্ষকদের পড়ানোর ওপর ভর করেই এই ফলাফল করেছে সে। রিতু জানায়, গ্রামের দীপেন স্যর(প্রাক্তন শিক্ষক) সাধ্যমতো অঙ্ক ও বিজ্ঞান পড়িয়ে সাহায্য করেছেন। এখন তাঁর দুঃশ্চিন্তা আগামিদিনে কীভাবে সে পড়াশোনা করবে। উঁচু ক্লাস, দামি বইপত্র, প্রত্যেকটি বিষয়ে আলাদা টিউশনি প্রয়োজন। কিন্তু বাড়ির যা আর্থিক অবস্থা তাতে হয়তো সায়েন্স নিয়ে তার পড়াশোনা হবে না। ইচ্ছে না থাকলেও আর্টস নিয়েই হয়তো পড়তে হবে, আক্ষেপ রিতু বাউরির।
সংসারে অনটন তাই গৃহস্থ বাড়িতে ঘরমোছা বাসনধোয়ার কাজ করেন রিতুর মা মালা। উপযুক্ত কাজ না পাওয়ায় পরিবার ছেড়ে গৃহকর্তা অর্জুনকে থাকতে হয় ঝাড়খণ্ডের রাঁচিতে। সেখানে ফায়ার ব্রিকসের ভাটায় দিনমজুরির কাজ করে সে। দু-তিন মাস পর বাড়িতে এসে সংসার খরচের কিছু টাকা তুলে দিয়ে যায় মালার হাতে। এরমধ্যেই চলে মেয়ের লেখাপড়া। রিতুর দাদা প্রসাদ উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে রামকৃষ্ণ মিশন থেকে মোবাইল রিপেয়ারিংয়ের কোর্স করছে। উদ্দেশ্য, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মা-বাবার সঙ্গে সংসারে আর্থিক সাহায্য করা। একটি মাত্র বোন রিতু। ভাল ফল করে রিতু বাউরির চোখে জল। একদিকে আনন্দের, অন্যদিকে উদ্বেগের। স্বপ্নপূরণের লক্ষ্যে সে আরও পড়তে চায়। উচ্চশিক্ষার জন্য প্রয়োজন সাহায্যের। কোনও সহৃদয় ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় তবেই হবে স্বপ্নপূরণ। মালা বাউরি বলেন, ‘ঘরের বাসনকোসন ধোয়া-মোছার কাজ করতে দিই না মেয়েকে। আমি চাই না সে আমার মত কামিনগিরি খাটুক। লেখাপড়া করে মস্ত বড় হোক। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করুক। সেই তেইজ টুকুর জন্যই তো লেখাপড়া শেখাচ্ছি মেয়েকে’
The post মা পরিচারিকা-বাবা দিনমজুর, মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হয়ে কুঁড়েঘরের সাঁঝবাতি মিঠানির রিতু appeared first on Sangbad Pratidin.
