ব্রতদীপ ভট্টাচার্য: চাল, ডাল, আটা, চিনি, ওষুধ। সঙ্গে বকফুল, সরষেশাক, কচুর লতির ফরমায়েশও! লকডাউনের খাঁ-খাঁ বাজারে প্রবীণদের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে মহাবিপাকে বারাসতের পুলিশ। কিছু বাড়ি থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের পাশাপাশি রসনাতৃপ্তির বিবিধ উপচারের এমন সব তালিকাও পুলিশের হাতে ধরানো হচ্ছে।
প্রবীণ বা প্রবীণা আবদারের সুরে বলছেন, “বাজারে যখন যাচ্ছই, একটু শাপলা পেলে এনো তো! অনেক দিন খাওয়া হয়নি।” কেউ কেউ ইলিশমাছের খোঁজও করতে ছাড়ছেন না। কচুর শাক দিয়ে জমে যাবে! স্বাভাবিকভাবেই পুলিশকর্তারা পড়েছেন আতান্তরে। তাঁদের আক্ষেপ, অনেকেই পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝছেন, আবার অনেকের মধ্যে নূন্যতম বিবেচনাবোধ দেখা যাচ্ছে না। “প্রচণ্ড চাপের মধ্যেও একাকী প্রবীণদের সাহায্যে পুলিশকর্মীরা এগিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু সেই সুযোগের এমন অপব্যবহার হওয়াটা দুর্ভাগ্যজনক।”–মন্তব্য জেলা পুলিশের এক কর্তার।
রাজ্যজুড়ে বহু শহর ও গ্রামে বহু প্রবীণ দম্পতি বা একাকী প্রবীণ রয়েছেন। কেউ নিঃসন্তান, কারও ছেলেমেয়ে অন্যত্র থাকেন। লকডাউন শুরু হওয়ার পর সব চেয়ে বেশি আতান্তরে তাঁরাই পড়েছেন। খাবার তো বটেই, তাঁদের সব চেয়ে বেশি প্রয়োজন ওষুধ ও চিকিৎসা পরিষেবার। সে কথা মাথায় রেখেই মুখ্যমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন পুলিশ ওঁদের পাশে দাঁড়াবে। প্রয়োজন হলে বাজার পৌঁছে দেবে, অসুস্থ হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে। মুখ্যমন্ত্রীর সেই নির্দেশ মেনেই বারাসত জেলা পুলিশ হেল্পলাইন চালু করে। কোনও প্রবীণ নাগরিক খাদ্যসামগ্রী ও চিকিৎসাজনিত সমস্যায় পড়লে সেই হেল্পলাইনে ফোন করলেই সাহায্য পাঠাবে পুলিশ। এই কাজের জন্য কয়েকজন সিভিক ভলান্টিয়ার ও ফুড অ্যাপ ডেলিভারি কর্মীদেরও দায়িত্ব দেওয়া হয় পুলিশের তরফ থেকে। প্রবীণরা ফোন করলেই বাজার থেকে ওষুধ বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া দায়িত্ব নিচ্ছেন তাঁরা। কিন্তু এরই অহেতুক ফায়দা তোলা হচ্ছে বলে অভিযোগ।
[আরও পড়ুন: করোনা আক্রান্তের চিকিৎসা করায় গোটা নার্সিংহোম এখন কোয়ারেন্টাইনে]
পুলিশ সূত্রে খবর, সম্প্রতি বারাসত পুলিশ জেলার মধ্যেই পুলিশকর্মীরা এমন বেশ কিছু অবাঞ্ছিত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন। এই পরিষেবা চালু হওয়ার পর দ্বিতীয় দিন বারাসতের গোবিন্দ ব্যারাক থেকে এক প্রবীণ দম্পতির ফোন আসে হেল্পলাইনে। তাঁরা বলেন, দু’জনেই বার্ধক্যজনিত সমস্যায় ভুগছেন। একা থাকেন, তাই বাজার করতে পারছেন না। থানা থেকে সিভিক ভলান্টিয়ারদের পাঠানো হয় তাঁদের বাড়িতে। রান্নার জন্য লম্বা লিস্ট ও টাকা ধরিয়ে দেন ওই দম্পতি। তার সঙ্গে বলে দেন, বাজার থেকে একটু সরষেশাক আনতে। এই অচলাবস্থার মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসই মিলছে না। সেখানে শাক! গোটা বাজার ঘুরে সরষেশাক না পেয়ে ফিরে যান ওই সিভিক ভলান্টিয়াররা। কিন্তু প্রবীণ দম্পতিও নাছোড়বান্দা। সরষেশাক তাঁদের লাগবেই। তাই বাধ্য হয়ে আবার বাজারে যান সিভিক ভলান্টিয়াররা। গোটা শহর ঘুরে শেষমেশ উদ্ধার হয় সরষেশাক।
শুধু বারাসত নয়, জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকেই এমন অহেতুক আবদার পাচ্ছেন পুলিশকর্মীরা। শাসনের একটি ঘটনায় দেখা যায়, ছেলে বাড়িতেই রয়েছেন। অথচ পুলিশের হেল্পলাইনে ফোন করে জানান, তাঁর বৃদ্ধ বাবা বাড়িতে একা থাকেন। ওষুধের প্রয়োজন। শাসন থানার পুলিশকর্মীরা তাঁর কথামতো ওষুধ কিনে বাড়িতে পৌঁছতে যান। কিন্তু গিয়ে দেখেন তরতাজা ছেলে বাড়িতেই বসে। বিষয়টি নিয়ে তাঁকে চেপে ধরতে ওই যুবকের সাফাই, “আসলে দেখছিলাম, সত্য়িই হেল্পলাইনে ফোন করলে কেউ আসেন কি না।”
[আরও পড়ুন: বাসন্তী পুজোর আয়োজনে কাটছাঁট, চাঁদার টাকায় দুস্থদের খাবার বিলি উদ্যোক্তাদের]
The post সরষেশাক-কচুর লতি আনার আবদার প্রবীণদের, লকডাউনে বিপাকে পুলিশ appeared first on Sangbad Pratidin.
