৩৩ বছর আগে একসঙ্গে লড়াই করেছিলেন, শাসকের গুলি হজম করেছিলেন। ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই যুব কংগ্রেসের মহাকরণ অভিযান দমন অপারেশনে তাঁকে 'মৃত' ভেবে চালান করা হয়েছিল মর্গে। সেখান থেকে ফিরে আসার পর আজীবন ভরসা রেখেছিলেন জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর। কিন্তু তিনি শাসক হতেই দলের চলার পথ বদলে গিয়েছিল। ২১ জুলাইয়ের শহিদ স্মরণ মঞ্চ হয়ে উঠেছিল বড়লোক, সেলিব্রিটিদের জন্য। তাতে ঠাঁই ছিল না প্রকৃত যোদ্ধাদের। আরেকটা একুশে জুলাইয়ের আগে যখন তৃণমূল কংগ্রেসের ছত্রাখান দশা, তখন এমন অভিযোগে সরব আন্দোলনকারী দীপক দাস। এতদিন জমে থাকা ক্ষোভ উগরে মমতার প্রতি তাঁর সতর্কবার্তা, ‘‘আপনি সংযত হোন। দলটাকে আবার পুরনো কর্মীদের নিয়ে চালান, আপনি আবার উঠে আসবেন।''
১৯৯৩ সালের একুশে জুলাই মমতার সঙ্গে মহাকরণ অভিযানে নেমে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন কল্যাণীর দীপক দাস। তাঁকে মৃত ভেবে মর্গে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু ময়নাতদন্তের আগে চিকিৎসকদের নজরে আসে, তিনি তখনও জীবিত। এভাবেই মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছিলেন। তারপর কেটে গিয়েছে ৩৩ টা বছর - 'কেউ কথা রাখেনি'। আজও নিজের রাজনৈতিক লড়াইয়ের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি বলে একরাশ অভিমান তৃণমূলের প্রাক্তন কর্মী দীপক দাসের।
এবছর দীপক কোন শিবির থেকে ডাক পেলেন? নাঃ এবারও তিনি ব্রাত্য। বললেন, ‘‘কেউ তো আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। করবেই বা কী? দলটা এতদিন কোন পথে চলেছে? মঞ্চ কাদের জন্য বাঁধা হয়েছে? শুধু বড়লোক, সেলিব্রিটিদের জন্য। যাঁরা আসল সেদিন লড়াই করেছিল, তাঁদের তো জায়গাই দেওয়া হয়নি মঞ্চে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু নিজের কাছের লোকদের গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁরাই তো এখন চোর-ডাকাত বলে গ্রেপ্তার হচ্ছে। আর ডিম ছোড়া হচ্ছে। আমি এখনও বলছি, আপনি সংযত হোন, পুরনোদের ডেকে আনুন, আবার উঠে দাঁড়াবেন।''
এখন অবশ্য সেই অভিমান বদলে গিয়েছে ক্ষোভে। এতদিনের 'বঞ্চনা'র কথা এখন বেরিয়ে আসলে লাভাস্রোতের মতো। দীপকের দাবি, যুবনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী হিসেবে তিনি একুশে জুলাইয়ের কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন। সরকার পরিবর্তনের পর একাধিকবার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা করে পরিবারের জন্য সাহায্য চেয়েছিলেন। অভিযোগ, কোনও সহযোগিতা পাননি। তাঁর কথায়, ‘‘প্রতিবারই শুধু চা-বিস্কুট খাইয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।" বর্তমানে কল্যাণীর জওহরলাল নেহরু মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে মৃতদেহবাহী গাড়ির চালক হিসেবে কাজ করে দিন গুজরান করছেন দীপক দাস।
এখানেই থেমে থাকেননি দীপক দাস। তাঁর আরও অভিযোগ, তৃণমূল কংগ্রেস দীর্ঘদিন ধরেই দলের সাধারণ কর্মীদের গুরুত্ব না দিয়ে সেলিব্রিটিদের বেশি প্রাধান্য দিয়েছে। সেই কারণে গত কয়েক বছর ধরে তিনি আর একুশে জুলাইয়ের সমাবেশে যান না। দীপকবাবুর কথায়, ‘‘যাঁরা আন্দোলনের সময় রাস্তায় নেমে লড়াই করেছিলেন, তাঁদের অনেকেই আজ উপেক্ষিত। দলের মঞ্চে কর্মীদের বদলে সেলিব্রিটিরা বেশি গুরুত্ব পেয়েছেন।"
আর এবছর? এবার তো একাধিক শহিদ দিবস পালিত হচ্ছে। শহিদ মিনারে কংগ্রেস, গান্ধী মূর্তির পাদদেশে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল আর বিড়লা তারামণ্ডলের পাশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাট তৃণমূল ওই দিনটি শহিদ স্মরণ করবেন। ঋতব্রতরা জানিয়েছিলেন, কোনও সেলিব্রিটি নয়, শহিদ তর্পণ মঞ্চে শুধু শহিদ পরিবারের সদস্যরাই ডাক পাবেন। এবছর দীপক কোন শিবির থেকে ডাক পেলেন? নাঃ এবারও তিনি ব্রাত্য। বললেন, ‘‘কেউ তো আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। করবেই বা কী? দলটা এতদিন কোন পথে চলেছে? মঞ্চ কাদের জন্য বাঁধা হয়েছে? শুধু বড়লোক, সেলিব্রিটিদের জন্য। যাঁরা আসল সেদিন লড়াই করেছিল, তাঁদের তো জায়গাই দেওয়া হয়নি মঞ্চে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু নিজের কাছের লোকদের গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁরাই তো এখন চোর-ডাকাত বলে গ্রেপ্তার হচ্ছে। আর ডিম ছোড়া হচ্ছে। আমি এখনও বলছি, আপনি সংযত হোন, পুরনোদের ডেকে আনুন, আবার উঠে দাঁড়াবেন।''
