নিজস্ব সংবাদদাতা, ডোমকল: তিন দিন আগে বোনঝি দেখা করতে এসেছিলেন মাসির সঙ্গে। এসে দেখেন, মাসির ঘরের জানালা-দরজা সব বন্ধ। অনেকক্ষণ ডাকাডাকির পর ভিতর থেকে মাসির আওয়াজ আসে, ‘আমরা ভাল আছি। তোরা চলে যা।‘ বিষয়টি স্বাভাবিক ঠেকেনি বোনঝির। বাড়িতে এসে জানান, মেসোমশাই মঞ্জু মাসিকে আটকে রেখেছ। এর পরই গৃহবধূর দাদা-দিদি ও জামাইবাবু চলে আসেন বোনের বাড়িতে। এসেই বোনকে ডাকাডাকি শুরু করেন তাঁরা। কিন্তু এদিন আর ভিতর থেকে কোনও আওয়াজ আসেনি। বিষয়টি প্রতিবেশীদের জানাতে তাঁরাও ডাকতে থাকেন। কিন্তু কোনও সাড়া নেই। অবস্থা বেগতিক বুঝে পুলিশে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ এসে দরজা ভেঙে ঘরের মধ্যে ঢোকে। দেখা যায় ১২ বছরের মেয়ে তোতাকে নিয়ে চুপ করে বসে আছেন বছর ৩৫-এর মঞ্জু মণ্ডল। জলঙ্গির চুয়াপাড়া গ্রামের এই ঘটনায় শোরগোল পড়ে গিয়েছে।
[ছেলে-বৌমার অত্যাচারে বাড়ি হারিয়ে এখন পথে পথে এই দম্পতি]
জানা গিয়েছে, প্রায় ছ’বছর ধরে এইভাবে গৃহবন্দি হয়ে আছেন মঞ্জুদেবী। তাঁর বাবার বাড়ি নদিয়ার করিমপুরে। সেখানে পান্নাদেবী কলেজে পড়ার সময় সহপাঠী চুয়াপাড়ার মানব মণ্ডলের সঙ্গে ১৪ বছর আগে প্রেম করে বিয়ে হয়েছিল মঞ্জুদেবীর। এই বিয়ে প্রথম দিকে মেনে নেয়নি মঞ্জুর বাবার বাড়ির লোকেরা। পরে অবশ্য সব স্বাভাবিক হয়ে যায়। মেয়ে তোতা সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী। মঞ্জুদেবীর স্বামী মানব মণ্ডল কাঠের ব্যাবসায়ী। সম্প্রতি স্যানিটেশনের ব্যবসাও শুরু করেছেন। তাঁর বন্ধু মৌলা বক্স বলেন, ‘মানব বেশ ভাল ছেলে। তবে শুনেছি, ওর স্ত্রী বাইরে আসেন না। এমনকী কোনও সামাজিক অনুষ্ঠানেও যান না।‘ প্রতিবেশী সোনালি হালদার বলেন, ‘মেয়েটিকে দেখতাম ওর বাবা স্কুলে নিয়ে যায়। মা বের হন না। ইদানীং সেই মেয়েকেও দেখা যায় না। মানব যখন বাইরে যান, বাইরে থেকে তালা মেরে চলে যান। রাতে ওই বাড়িতে আলো জ্বলে না।‘ বুধবার ওই বাড়ির ঘরে ঢুকে দেখা যায় একটি পোড়ো বাড়ির মতো। ড্যাম ঘর। ঘরের মধ্যে সব অগোছালো।
[ডাক্তার ছেড়ে ওঝার দ্বারস্থ পরিবার, মৃত্যু সাপে কাটা রোগীর]
প্রাথমিক তদন্তের পর পুলিশের অনুমান, মানসিকভাবে অসুস্থ মঞ্জু মণ্ডল। সে কারণেই এই ঘটনা ঘটিয়েছেন তিনি। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ সুমন্ত সাহা বলেন, ‘এটা স্কিৎজোফেনিয়ার রোগের লক্ষণ। এ ধরনের রোগীরা নিজেদের আবদ্ধ রাখতে ভালোবাসে। তাই ওই মহিলার এমন আচরণ।‘ মঞ্জুর জামাইবাবু বিকাশ মন্ডল বলেন, ‘আমরা নিরুপায়। মানবের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি কিন্তু পাচ্ছি না।‘ ডোমকলের এসডিপিও মাকসুদ হাসান বলেন, ‘ওই মহিলার বাবার বাড়ির লোকেদের অভিযোগের ভিত্তিতে গিয়ে আমাদের বিষয়টি অস্বাভাবিক মনে হয়েছিল। যার কারণে জানালা ভেঙে ঢুকে পুলিশ মা ও মেয়েকে উদ্ধার করেছে। কারও বিরুদ্ধে তাঁর কোনও অভিযোগ না থাকায় কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে পরিস্থিতির উপর পুলিশ নজর রেখেছে।‘ আমি ভাল আছি, স্বামীর বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ নেই, এই মুচলেকা দিয়ে থানা থেকে বাড়ি চলে যান মঞ্জুদেবী। নিজেকে এভাবে গৃহবন্দি করে রেখেছেন কেন, এই প্রশ্নের উত্তরে মঞ্জুদেবীর বিরক্তিভরা সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া, ‘আর প্রশ্ন করবেন না, প্লিজ।‘
The post মেয়েকে নিয়ে স্বেচ্ছায় ৬ বছর ধরে ঘরবন্দি মা appeared first on Sangbad Pratidin.
