সুমিত বিশ্বাস, পুরুলিয়া: এ যেন ভাঙা ঘরে চাঁদের আলো। এক চিলতে ভাঙাচোরা কুঁড়ে ঘরে পদ্মশ্রী এসেছে। কিন্তু সেই ঘরের যে শ্রী ফেরেনি। পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়তলির বাঘমুণ্ডির সিন্দ্রি গ্রামের ‘গাছদাদু’ দুখু মাঝির নাম এ তল্লাটে জানেন না এমন মানুষ নেই। সাইকেল নিয়ে গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে ঘুরে বৃক্ষরোপণের কাজ নিঃশব্দে, নীরবে হলেও সম্প্রতি এই কাজ চাউর হয়ে যায় অযোধ্যা পাহাড়তলি ছাড়িয়ে সমগ্র জেলাতেই। সমাজকর্মী দুখু পেয়েছেন পদ্মশ্রী।
কিন্তু যে ঘরে তার বাস সেখানে ভালো করে সূর্যের আলো ঢোকে না। তার মধ্যেই প্রতিবন্ধী ছোট ছেলে শম্ভু মাঝিকে নিয়ে কোন ভাবে দিন গুজরান করেন তাঁরা। বড় ছেলে নির্মল পরিবার নিয়ে অন্যত্র থাকেন। তাহলে দুখুর চলে কি করে? সরকারি প্রকল্পের সহায়তা। সেইসঙ্গে তার বৃক্ষরোপণের কাজ দেখে খুশি হয়ে তাঁর পাশে দাঁড়ান সকলেই । একসময় দিনমজুরি করে তার সংসার চলতো বটে। কিন্তু ৭৮ এ পৌঁছে সেভাবে আর পারেন না। তাই তার স্ত্রী চুমকি মাঝি সেই কাজ করেন। তবে পেটের জন্য স্ত্রীকে এই কাজ করতে হলেও স্বামীর বৃক্ষরোপনের কাজে সবসময়ই সাহায্য করে থাকেন তিনি। গাছে জল দিয়ে পরিচর্যা করা থেকে চারা গাছ তৈরির কাজেও উপস্থিতি থাকে তাঁর।
[আরও পড়ুন: অফিসের স্ট্রেস থেকেই রাজ্যে বাড়ছে সন্ধ্যার পথদুর্ঘটনা! সমীক্ষায় এল চাঞ্চল্যকর তথ্য]
পদ্মশ্রী পেয়ে ভীষণই খুশি এই প্রান্তিক মানুষটি। কিন্তু আক্ষেপ ঝরে পড়ে তাঁর গলায়। এক চিলতে ঘরের শ্রী আজও না ফেরায়। দুখুর কথায়, “শুনেছিলাম আমার নাম সরকারের ঘর পাওয়ার তালিকায় ছিলো। কিন্তু আবার হঠাৎ করেই শুনলাম কে যেন বাদ দিয়ে দিয়েছে। জানিনা ঘরের শ্রী কবে ফিরবে? তবে এটা জানি। ঈশ্বর চাইলে ঘর হবেই।” সাইকেল নিয়ে ঘর থেকে বার হয়ে যান দুখু। কাজ সামলে তারই পিছনে চলেন স্ত্রী।
১২ বছর বয়স থেকে গাছ বসানো শুরু করেছিলেন দুখু।পরিবারের আর্থিক অবস্থা খারাপ থাকায় নিরক্ষরতা ঘোচেনি দুখুর। কিন্তু তার বৃক্ষরোপণের অভিযান চলছেই সেই কৈশোরের আগে থেকেই। তাই তার বৃক্ষকে ঘিরে কত কি নাম ‘গাছদাদু’, ‘বৃক্ষমানব’, ‘বৃক্ষসাথী’। দুখু বলেন, “তখন আমার ১২ বছর বয়স হবে। আমাদের গ্রামের মোহন শাহ বলে একজন ছিলেন। আমি কাকা বলতাম তাকে। তিনি আমাকে বলেছিলেন গাছ বসাতে। গাছ বাঁচলে আমরা বাঁচবো। তারপর থেকেই আমার এই কাজ চলছে।”
দুখুর ভাঙাচোরা সাইকেল এখন বদলে দিয়েছে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। সেখানে লেখা বৃক্ষমানব, শ্রী দুখু মাঝি। ওই সাইকেলে চড়েই চলে তাঁর কাজ। গত জুলাই পর্যন্ত তাঁর ঝুলিতে গাছ বসানোর সংখ্যা ছিল হাজার দুয়েক। আর এই কয়েক মাসেই সংখ্যাটা প্রায় ৮-৯ হাজার। তাঁর বৃক্ষরোপণে কি নেই? শাল, শিমূল, পলাশ, কুসুম, কূল, আম, পেয়ারা, জাম, বট। পতিত জমি থেকে পুকুর পাড়। সেই সঙ্গে রাস্তার দু’পাশ জুড়ে বৃক্ষ রোপনে আরও সবুজ করে তুলেছেন অযোধ্যা পাহাড়তলিকে। তাই তাঁর সাইকেলে লেখা, ‘সেভ অযোধ্যা হিলস’। আর সেই বার্তা ছড়িয়ে দিতেই পদ্মশ্রী ‘গাছদাদু’ বলছেন, “আমি যেদিন থাকবো না তারপরও এক হাজার দুখু মাঝি জন্মাবে। তাদের হাত ধরে হাজার, হাজার লক্ষ, লক্ষ বৃক্ষরোপণ হবে।”
