সুমিত বিশ্বাস, পুরুলিয়া: একদা রাজ্য পুলিশের হোমগার্ড থাকায় পুলিশি তদন্তের প্যাঁচ ছিল তার নখদর্পণে। তাই মোবাইলে কথা না বলে পুলিশের চোখে রীতিমতো ধুলো দিয়ে ডেরা বদলে পালিয়ে-পালিয়ে বেড়াচ্ছিল পুরুলিয়া সুচকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত সনাতন ঠাকুর।পুলিশের চোখ এড়াতে মন্দিরে সাধুর ছদ্মবেশে শেখাচ্ছিল কীর্তন-বাউল। কিন্তু শেষরক্ষা হল না। ১৭ দিন অধরা থাকার পর অবশেষে গ্রেপ্তার হল সনাতন ঠাকুর।
শনিবার সন্ধ্যায় উত্তরপ্রদেশের রেনুকোট এলাকার পিপড়ি থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুরুলিয়া পুলিশের একটি তদন্তকারী দল। রবিবার স্থানীয় একটি আদালতে সনাতনকে বিচারের জন্য তোলা হলে, আদালত তাকে ৬ দিনের টানজিট রিমান্ড দেয়। এরপর আগামী ২ আগস্ট তাকে পুরুলিয়া আদালতে তোলা হবে। পুরুলিয়ার পুলিশ সুপার জয় বিশ্বাস বলেন, “রেনুকট এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ২ আগস্ট তাকে পুরুলিয়া আদালতে তোলা হবে।” গ্রেপ্তারির খবর পেয়েই সনাতনের গ্রামে ছড়িয়েছে চাঞ্চল্য। অনেকেই তার কড়া শাস্তির দাবি তুলতে শুরু করেছেন।
বস্তুত, নিজের দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী মঙ্গলার সাড়ে তিন বছরের শিশুকে দীর্ঘদিন সুচ ফুটিয়ে যৌন নির্যাতন করত অবসরপ্রাপ্ত হোমগার্ড সনাতন। তার এই পাশবিক অত্যাচারের পর শিশুটিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলেও শেষপর্যন্ত বাঁচানো যায়নি। শরীরের থেকে সাতটি সুচ বের করা হলেও স্পেটিসেমিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গত ২০ জুলাই রাতে এসএসকেএমে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে ছোট্ট শিশুটি। ঘটনায় সনাতনের সঙ্গে জড়িত ছিল শিশুটির মা মঙ্গলাও। এখানেই শেষ নয়, সনাতন নাকি তুকতাক করত, এমনটাই জানিয়েছে অভিযুক্তর পাড়া-পড়শিরা। ঘটনাটি সামনে আসার পরই আলোড়ন ওঠে গোটা রাজ্য জুড়ে।
[পুরুলিয়া কাণ্ড: সনাতনের কুকীর্তি জেনেও কেন চুপ ছিল নির্যাতিত শিশুর মা?]
জানা গিয়েছে, পালানোর পর দু’বার নিজের ডেরা পালটায় সনাতন। প্রথমে ঝাড়খণ্ডের রামগড় জেলার মান্ডু থানা এলাকার সিড়কায় নিজের শ্যালকের বাড়িতে আত্মগোপন করেছিল সে। তারপর সেখান থেকে ডালটনগঞ্জে আরেক শ্যালকের বাড়িতে কিছুদিনের জন্য গা ঢাকা দেয়। কিন্তু ডালটনগঞ্জেও বেশিদিন ছিল না সনাতন। সেখান থেকে সে চলে আসে পিপড়িতে এক আত্মীয়ের বাড়িতে। শেষপর্যন্ত রবিবার পিপড়ি থেকেই তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এদিকে, এর মধ্যেই নির্যাতিতা শিশুটির মা মঙ্গলাকে জেরা করে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে শিশু সুরক্ষা কমিশনের নির্দেশে গঠিত সামাজিক কমিটি। শুধু মঙ্গলার সাড়ে তিন বছরের শিশুকন্যাকে সুচ ফুটিয়ে ‘খুন’ নয়, প্রথম পক্ষের স্ত্রী প্রভাবতী ঠাকুরকেও নাকি পিন গিলিয়ে মেরে ফেলেছিল সনাতন! এমনকী প্রভাবতী দেবীর মৃত্যুর পর পাড়া-পড়শি ময়নাতদন্তের কথা বললেও এড়িয়ে গিয়েছিল ওই অবসরপ্রাপ্ত হোমগার্ড। সম্প্রতি সামনে এসেছে এই ভয়ানক তথ্য।
[‘ওদের ফাঁসি চাই’, পুরুলিয়া কাণ্ডে অভিযুক্ত সনাতনের শাস্তির দাবি বউমার]
মাত্র সাড়ে তিন বছরের মেয়েকে মেরে ফেলার পর কী পরিকল্পনা ছিল সনাতন ঠাকুর ও মঙ্গলার? মঙ্গলাকে জেরা করে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছে, সনাতন ও মঙ্গলার নাকি উত্তরপ্রদেশে পালিয়ে যাওয়ার ছক ছিল। বৃন্দাবনে গিয়ে কীর্তন, বাউল গান করে দু’জনে টাকা রোজগারের পরিকল্পনাও করেছিল। গত বুধবার থেকে টানা পাঁচদিন পুরুলিয়া জেলা প্রশাসন এই ঘটনার তদন্ত করেছে। সোমবার জেলাশাসক অলোকেশ প্রসাদ রায়ের কাছে সেই তদন্তের রিপোর্টও জমা দেওয়া হবে।
শুধু সনাতনের আরেক কুকীর্তির কথা ফাঁস করাই নয়, ইতিমধ্যেই মঙ্গলা নাকি কমিটির কাছে স্বীকার করেছে, তার শিশুকন্যাকে সনাতন যৌন নির্যাতনও করত। কিন্তু কীভাবে ওইটুকু শিশুকে সনাতন সুচবিদ্ধ করত সেটা জানায়নি সে। মঙ্গলা শুধু জানিয়েছে, ঘরের কাঁথা সেলাইয়ের নামে সনাতন তাকে সুচ আনতে বলত। তবে কমিটির ধারণা, এই গোটা বিষয়টিই মঙ্গলা জানে। জেরার সময় তার শরীরী ভাষা নাকি সেই কথাই প্রমাণ করেছে। এমনটাই দাবি কমিটির। শিশুটিকে অত্যাচার-সহ তার দু’হাত ভাঙার বিষয়টি মঙ্গলা জানত বলেই মনে করছেন তদন্তকারীরা। সনাতনের প্রথম স্ত্রী-র মৃত্যুর পর সে যেমন রোগ-অসুখের কথা বলে চালিয়ে দিয়েছিল, তেমনই মঙ্গলার শিশুকন্যার বেলাতেও তুলে এনেছিল অসুস্থতার কারণ। এছাড়াও জানা গিয়েছে, হোলিতে মঙ্গলাকে বিয়ে করার আগে নাকি প্রায় দেড় মাস উত্তরপ্রদেশে কাটিয়ে এসেছে সনাতন।
