অন্তত ১৫০টি আসনে ভোট লুট করেছে বিজেপি, ফল প্রকাশের পর এমনই দাবি করেছিলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু মাত্র ৫০টি কেন্দ্রে ভোট লুটের অভিযোগের 'তথ্য' জোগাড় করে মামলার প্রস্তুতি শুরু করল তৃণমূল। জানা গিয়েছে, নেত্রীর পিছু টানছেন পরাজিত প্রার্থীরাই। তাঁরাই চাইছেন না এ নিয়ে নতুন করে আবার মামলার টানাটানি শুরু হোক। পরাজয়ের গ্লানি তো বটেই, একইসঙ্গে হতাশাও চেপে বসেছে বেশিরভাগের পরাজিত প্রার্থীর মধ্যে। নেতৃত্বকে তাঁরা ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দিয়েছেন, বিজেপি যেখানে সরকার গড়ে ফেলেছে, সেখানে মামলায় নেমে যদি জয়ও আসে, তাতেই বা আর কী লাভ? তৃণমূল তো আবার সরকারে চলে আসবে না!
পরাজিত প্রার্থীদের পালটা বোঝানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছে নেতৃত্ব। নির্বাচনে পরাজিত দলের এক শীর্ষ নেতা দলনেত্রীর প্রস্তাব এবং উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, "পরাজয়ের গ্লানির ভার অনেক। তাতে এখন দলের মধ্যে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, দল ধরে রাখা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। এখন নতুন করে লড়াইয়ের মানসিকতার শক্তি জুটিয়ে আবার ময়দানে নামা শক্ত। তবু লড়াই ছাড়া আমাদের উপায়ও নেই।" পরাজিতদের মধ্যে এমনও অনেক প্রার্থী আছেন যাঁরা নেত্রীর প্রস্তাব মেনে নিয়েছেন। এমন একজন প্রার্থী বলেন, "নেত্রী বারবার ভোট লুটের অভিযোগ তুলেছেন। সেটা যে কথার কথা নয় এই মামলায় সেটাই প্রমাণের চেষ্টা হচ্ছে। এই আইনি লড়াইয়ে একটা আসনও যদি জেতা সম্ভব হয়, তাহলে সেটাই তো প্রমাণ করে দেবে দলনেত্রী বা প্রার্থীরা যে ভোট লুটের অভিযোগ বিজেপির বিরুদ্ধে তুলছিলেন সেটা মিথ্যা নয়। সেটাই দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।" ভগ্ন মানসিক পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে সেটাই দলকে নতুন আলোর সঞ্চার করতে পারে বলে মনে করছেন পরাজিত দু’একজন প্রার্থী।
কবে মামলা ফাইল হতে পারে? আপাতত আদালতে গ্রীষ্মাবকাশ চলছে। জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে কোর্ট খুলতে পারে। তারপরই মামলা দায়ের করতে পারেন মমতা। ভোটের ফল বেরিয়েছে ৪ মে। নিয়ম অনুযায়ী, ফলাফল বেরনোর দেড় মাসের মধ্যে মামলা দায়ের করতে হয়। এই রাজ্যে ফলাফলের তারিখের হিসেবে সেই সীমা ২০ জুন। ফলাফল বেরনোর ২০ দিনের মাথায় ফেসবুক লাইভ করে মমতার অভিযোগ ছিল, অন্তত ১৫০ আসনে ভোট লুট করেছে বিজেপি। এই লুট না হলে তৃণমূল ২২০-র বেশি আসনে জিতত। এই আসনগুলির মধ্যে তাঁর নিজের ভবানীপুর কেন্দ্রের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। সব মিলিয়ে ১০০টির কাছাকাছি কেন্দ্রের ভোট লুটের তথ্য এই মাসের মধ্যেই জোগাড় করে নেওয়া সম্ভব বলে দাবি দলের একটি অংশের। তবে এখনও পর্যন্ত ৬০-এর কাছাকাছি কেন্দ্রের তথ্য হাতে এলেও বাঁধ সাধছেন পরাজিত প্রার্থীরাই। তবু তাঁদের মোটামুটি রাজি করিয়ে ২০ জুনের মধ্যে প্রাথমিকভাবে অন্তত ১০টি মামলা দায়ের করিয়ে নিতে চাইছে তৃণমূল।
এসআইআর পর্বের প্রথম ধাপ ছিল ‘ডিলিশন’। তার পর ‘অ্যাডজুডিকেশন’। তৃণমূল নেতৃত্বের বক্তব্য, যেখানে ৩০ হাজার মার্জিনে বিজেপি প্রার্থী জিতেছেন, সেখানে দেখা গিয়েছে ১০ হাজার নাম ‘ডিলিট’ হয়েছিল। আবার কোথাও ২০ হাজারের মার্জিনে জয় হয়ে থাকলে, ৮ হাজার নাম ‘ডিলিট’ হয়েছে। তারপর ‘অ্যাডজুডিকেশন’ পর্বে যাঁরা বাদ পড়েছেন, সেই তালিকায় হয়তো ১২ হাজার নাম রয়েছে। সেখানে ১০ হাজারের মার্জিনে জিতেছেন বিজেপি প্রার্থী। আরও পরে ট্রাইব্যুনাল পর্বে এসে ৭৫ শতাংশ নাম ছাড় পেয়ে গেলেও ১০ হাজার ভোটারের নাম হয়তো এখনও বিচারাধীন। কে বলতে পারে, বাকি থেকে যাওয়া ওই ভোটাররা তৃণমূলকে ভোট দিতেন না? এটাই মমতার করতে চাওয়া মামলার অভিযোগের একটি বিশেষ দিক।
এছাড়াও রয়েছে ভোট গণনার দিনের প্রত্যক্ষ প্রমাণ। যার অন্যতম হাতিয়ার সিসিটিভি ফুটেজ বলে জানাচ্ছেন দলের রাজ্য সহ সভাপতি জয়প্রকাশ মজুমদার। তাঁদের কথায়, বহু জায়গায় ইভিএমে থেকে যাওয়া বিপুল চার্জ নিয়ে সন্দেহ রয়ে গিয়েছে। সারাদিন ভোট চলার পর কীভাবে সেই যন্ত্রে ৯০ শতাংশ চার্জ থাকে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হবে। ভিভিপ্যাট ইউনিটের সঙ্গে অনেকাংশে মেলেনি ভোটদানের তথ্যের সিরিয়াল নম্বর। তৃণমূলের বক্তব্য, সিসিটিভি ফুটেজে তৃণমূলের কাউন্টিং এজেন্টদের উপর বিজেপি প্রার্থী ও কর্মীদের শারীরিক ও মানসিক অত্যাচারের ছবি ধরা পড়েছে। সেটাও মামলায় বড় অস্ত্র।
