গৌতম ব্রহ্ম: প্রতিমার উচ্চতা বেশি হওয়ায় শহরের একটি পুজো বন্ধ হয়েছিল। মুখ ঢেকেছিল ‘সবচেয়ে বড় দুর্গা’। কিন্তু জানেন কি, উচ্চতা বেশি হওয়ায় শহরের সিংহভাগ বারোয়ারি পুজোর দুর্গাপ্রতিমায় প্রাণপ্রতিষ্ঠাই করতে পারেন না পুরোহিতরা?
বিশ্বাস না হলে আবার পড়ুন।
‘প্রাণহীন’ মূর্তিতেই মাতৃবন্দনা করছে বহু বারোয়ারি। এমনই বিস্ফোরক অভিযোগ তুললেন পুরোহিতদের একাংশ। তাঁদের বক্তব্য, রক্তচন্দন, কুশ, আতপ চাল, বেলপাতা ও রঙিন ফুলে দেবীর বাঁ গালে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করতে হয়। কিন্তু আজকাল মূর্তি এত উঁচু হচ্ছে যে, পুরোহিতরা নাগাল পাচ্ছেন না। ফলে, মনে মনেই চলছে প্রাণপ্রতিষ্ঠার পর্ব। অনেকটা সেই ‘আমার চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ…’ গোছের।
[পাঁজির প্যাঁচে পঞ্চমীতেই এবার দেবীর বোধন, ষষ্ঠীতে অধিবাস]
গত বছর এক পুরোহিত মায়ের বাম গালের নাগাল পেতে ইলেকট্রিশিয়ানের মই নিয়ে উঠেছিলেন। পা ফসকে ঠ্যাং ভেঙে ছিল। তাই ইচ্ছে থাকলেও দুর্ঘটনার আশঙ্কায় কেউ ওই ঝুঁকি নেওয়ার সাহস দেখান না। অতএব মৃৎপ্রতিমায় প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয় না। বিষয়টি যে উদ্বেগজনক তা স্বীকার করে নিয়েছেন পুজোকর্তাদের একাংশ। ‘অবসর’-এর শ্যামলনাথ দাস জানিয়েছেন, “সমস্যার মোকাবিলায় অ্যালুমিনিয়ামের মই কেনা হয়েছে। আমরা আপস করি না। পুরোহিতের নিদান অনুযায়ী কাজ হয়। বাকিদেরও এই মনোভাব হওয়া উচিত।” ‘ফোরাম ফর দুর্গোৎসব’—এর যুগ্ম সম্পাদক শাশ্বত বসু অবশ্য পুরোহিতদের সঙ্গে সহমত নন। তাঁর মত, “উত্তর ও দক্ষিণ কলকাতার পুরনো সব পুজোই নিষ্ঠা সহকারে পুজো করে।”
আবার অনেক পুজো কমিটি ‘পলিটিক্যালি কারেক্ট’ থাকার বাসনায় বড় মূর্তির নিচে ছোট মূর্তি বসিয়ে পুজো করেন। কিন্তু শাস্ত্র বলে একই মণ্ডপে একই দেবীর দু’টো মূর্তি থাকতে পারে না। যেমন একই মন্দিরে দু’টো জলশঙ্খের পুজো করার বিধান নেই। এমনটাই জানালেন ‘বঙ্গীয় পুরোহিত কল্যাণ পরিষদ’-এর সাধারণ সম্পাদক সুরজিৎ চট্টোপাধ্যায়। তাঁর মত, বেলগাছের বদলে বিল্বশাখা ছেদন করে বারোয়ারি মণ্ডপ দেবীকে মণ্ডপে আবাহন করে। যা একধরনের ‘ফাঁকিবাজি’ বলেই মনে করছেন অনেকে। “শাস্ত্র অনুযায়ী, দেবী আশ্রয় নেন ফলবতী বিল্ববৃক্ষে। ওই বৃক্ষের বেলপাতাতেই প্রাণ পায় নবপত্রিকা। কিন্তু পুজোকর্তাদের অত সব দেখার সময় কই? দশকর্মার জিনিস আনার লোকই পাওয়া যায় না অনেক সময়।” আক্ষেপ সুরজিৎবাবুর।
[সময়ের অনুরণনে বাঁচার প্রকৃত অর্থ খুঁজবে সেলিমপুর পল্লী]
এবছর পঞ্চমীর সন্ধ্যায় বোধন হচ্ছে দেবীর। ষষ্ঠীতে অধিবাস। সপ্তমীর সকালে নবপত্রিকার প্রবেশ। দেবীর প্রাণপ্রতিষ্ঠা, চক্ষুদান। এবারও সেই একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি হবে বলে পুরোহিতমহলের একাংশের আশঙ্কা। মানিকতলা টোলের ‘বৈদিক পণ্ডিত-পুরোহিত মহামিলন কেন্দ্র’-র সাধারণ সম্পাদক পণ্ডিত নিতাই চক্রবর্তীর অভিযোগ, দশকর্মা ভাণ্ডারগুলি ঠিকঠাক জিনিসপত্র দেয় না। বহু দশকর্ম ভাণ্ডার গঙ্গাজল ‘ফ্রি’ দিচ্ছে। কিন্তু অভিযোগ, গঙ্গাজল বলে আখেরে বোতলবন্দি ‘ট্যাপ ওয়াটার’ বিক্রি হচ্ছে। তাহলে উপায়?
পুরোহিতদের বক্তব্য, দেবীকে তো আমরা ঘরের মেয়ে উমা হিসাবেই পুজো করি। অতএব তাঁর আকার-আকৃতিও মানুষের মতো হওয়া বাঞ্ছনীয়। ভেজালের হাত থেকে মাকে বাঁচাতে অনেক পুরোহিত দশমৃত্তিকার বদলে গঙ্গামাটি ও দশ সমুদ্রের জলের পরিবর্তে গঙ্গাজল ও আটরকমের তেলের বদলে বিশুদ্ধ জবাকুসুম তেল ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন।
[এবার পুজোয় বদ্ধভূমিতে চিলতে আকাশের খোঁজে উল্টোডাঙা পল্লিশ্রী]
[চিত্র প্রতীকী]
The post সিংহভাগ বারোয়ারি পুজোর দুর্গাপ্রতিমায় প্রাণপ্রতিষ্ঠাই করতে পারেন না পুরোহিতরা! appeared first on Sangbad Pratidin.
