কুসংস্কার, অজ্ঞতা ও সামাজিক বাধা প্রতিপদে! কোনও কিছুই তাঁকে আটকাতে পারেনি!ডুয়ার্সের চা-বলয়ের প্রত্যন্ত এলাকায় কিশোরী ও তরুণীদের ঋতুস্রাব সম্পর্কিত স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধিতে গত এক দশক ধরে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন আদিবাসী কন্যা প্রীতি মিঞ্জ ওরফে 'প্যাড ওম্যান'। অবশেষে চলা ওদলাবাড়ির আদিবাসী কন্যা প্রীতি পেলেন রাজ্য সরকারের স্বীকৃতি। প্রান্তিক মেয়েদের জন্য কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষ থেকে বিশেষ সম্মাননা ও শংসাপত্র প্রদান করা হয়। মঙ্গলবার প্রীতির বাড়িতে উপস্থিত হয়ে এই সম্মাননা তাঁর হাতে তুলে দেন রাজ্যের মন্ত্রী বুলুচিক বরাইক।
চা-বাগান অধ্যুষিত এলাকায় ঋতুকালীন স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কুসংস্কার, অজ্ঞতা ও সামাজিক বাধার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন প্রীতি। নিজ উদ্যোগে চা-বাগানের ঘরে ঘরে গিয়ে মেয়েদের সঙ্গে কথা বলা, ঋতুস্রাব চলাকালীন স্বাস্থ্যবিধির প্রয়োজনীয়তা বোঝানো ও স্যানিটরি ন্যাপকিন ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করাই তাঁর কাজের মূল লক্ষ্য। এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফলে এলাকায় তিনি আজ 'প্যাড ওম্যান' নামেই পরিচিত।
বিগত ১০ বছর ধরে প্রতিকূল সামাজিক ও আর্থিক পরিস্থিতির মধ্যেও নিজের লক্ষ্যে অবিচল থেকেছেন প্রীতি। তাঁর একক প্রচেষ্টায় কয়েক হাজার কিশোরী ও যুবতী বর্তমানে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। এর ফলে শুধু স্বাস্থ্য সচেতনতাই নয়, পাশপাশি মেয়েদের আত্মবিশ্বাস ও আত্মসম্মানও অনেকটাই বেড়েছে।
প্রীতির এই নিঃস্বার্থ সামাজিক কর্মকাণ্ডের খবর পৌঁছে যায় রাজ্যের প্রশাসনিক সদর দপ্তর নবান্নে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে মুখ্যমন্ত্রীর পক্ষ থেকে তাঁকে এই বিশেষ সম্মান প্রদান করা হয়। সম্মাননা প্রদানকালে মন্ত্রী বুলুচিক বরাইক বলেন, "সমাজ গঠনের কাজে প্রীতির মতো তরুণীরাই প্রকৃত শক্তি। চা-বাগানের মতো প্রত্যন্ত এলাকায় ঋতুকালীন স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে তিনি যে আন্দোলন গড়ে তুলেছেন, তা আগামী দিনে রাজ্যের অন্যান্য অঞ্চলের জন্যও অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।"
এই বিশেষ স্বীকৃতি পেয়ে আবেগাপ্লুত প্রীতি মিজ মুখ্যমন্ত্রীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, "আমি কখনও পুরস্কার বা স্বীকৃতির আশায় কাজ শুরু করিনি। শুধু চেয়েছিলাম আমার বোনেরা যেন সুস্থ থাকে। লজ্জা বা ভয় ছাড়া নিজেদের শরীরের যত্ন নিতে পারে। মুখ্যমন্ত্রীর এই স্বীকৃতি আমার দায়িত্ব আরও বাড়িয়ে দিল।"
উল্লেখ্য, এর আগেও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ও সামাজিক সংগঠনের তরফে প্রীতি মিঞ্জ একাধিকবার সম্মানিত হয়েছেন। তবে রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানের কাছ থেকে এই স্বীকৃতি পাওয়ায় খুশির হাওয়া বইছে গোটা ওদলাবাড়ি জুড়ে। এলাকাবাসীর মতে, প্রীতির এই সাফল্য চা-বলয়ের অন্যান্য মেয়েদেরও সমাজসেবামূলক কাজে এগিয়ে আসতে অনুপ্রাণিত করবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে আরও এ ব্যাপারে সচেতন প্রজন্ম গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।
