মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর উদ্যোগে বিধানসভায় 'গুন্ডাদমন বিল' পাস হওয়ার ৯ দিনের মাথায় নাবালিকাকে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় অন্যতম অভিযুক্তকে আত্মরক্ষার্থে 'এনকাউন্টার' করতে বাধ্য হলেন রাজ্য পুলিশের দুই দক্ষ গুন্ডাদমন অফিসার। শুধু পুলিশ মহল নয়, রাজ্যজুড়েই আমজনতার মুখে মুখে ও সোশাল মিডিয়া জুড়ে যে দুই অফিসারের এই 'সাহসী ভূমিকা' আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে তাঁরা হলেন অর্ঘ্য মণ্ডল ও রনি সরকার। বলতে দ্বিধা নেই, এক ধর্ষককে 'এনকাউন্টারে খতম' করার জন্য রাতারাতি দুই অফিসার সমস্ত পুলিশকর্মীদের কাছে যেমন গর্বের সহকর্মী হয়ে উঠেছেন তেমনই বাংলার সিংহভাগ মহিলা ও জনতা ভূয়সী প্রশংসায় ভরিয়ে দিচ্ছেন। এমন ঘটনায় 'জিরো টলারেন্স' হতে ১০০ শতাংশ ক্ষমতা প্রয়োগের দায়িত্ব দেওয়ার সম্পূর্ণ কৃতিত্বই যে মুখ্যমন্ত্রীর, তা স্বীকার করছেন বারুইপুরে 'এনকাউন্টার'-কাণ্ডের দুই 'নায়ক' অর্ঘ্য-রনি।
ঘটনার বর্ণনায় বুধবার ম্যাজিস্ট্রেটকে দেওয়া জবানবন্দিতে অফিসাররা জানিয়েছেন, প্রাণ বাঁচাতেই বাধ্য হয়ে অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলকে সার্ভিস রিভলভার থেকে দুই রাউন্ড গুলি চালাতে বাধ্য হয়েছেন। কারণ, নাবালিকাকে যৌন নির্যাতন ও খুনের ঘটনার পুনর্নির্মাণে সূর্যপুরের নাচনগাছা গ্রামে রাতে গেলে আচমকাই নাটকীয়ভাবে প্রথমে রনির কোমর থেকে সার্ভিস রিভলভার ছিনতাই করে প্রভাস। ঝাঁপিয়ে পড়ে ধরতে গেলে আমাদের এক রাউন্ড গুলি চালায় অভিযুক্ত। সঙ্গে সঙ্গে মাথা নিচু করায় রনি কোনওক্রমে বেঁচে যায়। ততক্ষণে আত্মরক্ষার্থে নিজের রিভলভার থেকে প্রভাসকে তাক করে পর পর দু'রাউন্ড গুলি চালায় অর্ঘ্য। প্রথম গুলিটি প্রভাসের ডানদিকে বুকের নিচে, পরেরটি ডানদিকে কোমরের উপরে পেটের কাছে লাগে। ছুটে পালাতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে ঘাসের মধ্যে পড়ে যায়। রাজ্য পুলিশের আইজি (প্রেসিডেন্সি রেঞ্জ) কঙ্করপ্রসাদ বারুই, পুলিশ সুপার থেকে ম্যাজিস্ট্রেটকে এবং ভিডিওগ্রাফি বয়ানে এমনই নাটকীয় ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন দুই অফিসারই।
অর্ঘ্য-রনি আরও বলেন, শেষ মুহূর্তে বাঁচার জন্য তীব্র আকুতি ছিল প্রভাসের। চিৎকার করে বলতে থাকে, বাঁচান স্যর, বাঁচান। যাঁর রিভলভার ছিনতাই করে গুলি ছুড়তে ছুড়তে পালাচ্ছিল প্রভাস, সেই গুন্ডাদমন অফিসার রনি সরকার বর্তমানে ক্যানিং থানার আইসি। এবার বিধানসভা ভোটে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন তাঁকে বকুলতলা থানার ওসি করেছিল। কনস্টেবল থেকে ধাপে ধাপে যোগ্যতার পরিচয় দিয়ে সাব ইন্সপেক্টর হয়েছেন তিনি। ক্যানিংয়ের আগে নরেন্দ্রপুর, বারুইপুর, জয়নগর-সহ একাধিক থানায় অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কাজ করেছেন রনি।
অন্যদিকে, ২০১৪ সালের ব্যাচের অফিসার অর্ঘ্য মণ্ডল বর্তমানে বারুইপুর থানার গুন্ডাদমন অফিসার হিসাবে সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন। দীর্ঘদিন জয়নগর, সোনারপুর, কুলতলি থানায় একাধিক দায়িত্ব সামলেছেন। একসময় বারুইপুরের এসওজি ইনচার্জ-ও ছিলেন অর্ঘ্য। বছর ১৫ আগে বারুইপুরে এসডিপিও ও পরে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসাবে সুনামের সঙ্গে কাজ করা কঙ্করপ্রসাদ বারুই বর্তমানে আইজি প্রেসিডেন্সি রেঞ্জ। আর সেই কঙ্করপ্রসাদকেই বারুইপুরে পাঠিয়ে ধর্ষক ও গুন্ডাদের শায়েস্তা করতে তাঁর 'জমা-খরচ মডেল'কে বাস্তবায়নে জিরো টলারেন্স' নীতি কার্যকর করার দায়িত্ব দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। আর প্রথম রাউন্ডেই ডিজি সিদ্ধিনাথ গুপ্তার তৈরি করে দেওয়া সিট-এর টিম যে মুখ্যমন্ত্রীর 'আস্থা ও ভরসা'র মর্যাদা রেখেছে তার প্রমাণ দিলেন অর্থ্য-রনি।
সুপ্রিম কোর্টের গাইড লাইন মেনে পুলিশি এনকাউন্টারে মৃত্যু হওয়ায় এফআইআর করে তদন্ত শুরু হয়েছে। তদন্তটি সিট না সিআইডি করবে তা রাত পর্যন্ত জানা যায়নি। অবশ্য ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের তদন্ত বাধ্যতামূলক হওয়ায় তার কাজও শুরু হয়েছে। ঘটনাটি মানবাধিকার কমিশনেও জানানো হচ্ছে। দুই অফিসার অর্ঘ্য মণ্ডল ও রনি সরকারের অস্ত্র দুটির ফরেনসিক পরীক্ষা হবে। নিহত প্রভাসের রক্তের নমুনা, আঙুলের ছাপ-সহ ঘটনাস্থল নাচনগাছা গ্রাম থেকে সংগৃহীত সমস্ত প্রমাণ সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
