ধ্রুবজ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়: “আপনি জেলা সভাপতি? আমি কলেজে পড়ি। এই যে ২০ টাকা। এটা নিন। দলের পতাকা কিনবেন।” শনিবার সবে বিকেল গড়িয়েছে। মধ্যমগ্রামে তৃণমূলের জেলা পার্টি অফিসে তখন থিকথিকে ভিড়। দরজা ঠেলে অল্পবয়সি দু’টি মেয়ে এসে দাঁড়িয়েছে উত্তর ২৪ পরগনা জেলা সভাপতি জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের টেবিলের সামনে। বাড়ানো হাতে ধরা ২০ টাকার নোট। ঘরময় প্রবল ব্যস্ততা। জেলায় দলের কোর কমিটির ক’জনের সঙ্গে বসে ভোটের স্ট্র্যাটেজি নিয়ে শেষ মুহূর্তের আলোচনা সারছেন জেলা সভাপতি। আর তার মধ্যেই দুই তরুণীর এভাবে ২০ টাকা এগিয়ে দিয়ে দলের পতাকা কিনতে বলায় হকচকিয়ে গেলেন বেদম! অপ্রত্যাশিত হলেও দলের পতাকা কিনতে যখন টাকা দিচ্ছে, তখন বিষয়টা খতিয়ে জানতেই হয়!
[অরুণাচলে সীমান্ত লঙ্ঘন করছে ভারতীয় সেনা, অভিযোগ চিনের]
‘কেস’ কী বুঝতে দুজনকে বসিয়ে প্রথমেই লস্যির অর্ডার দেন জ্যোতিপ্রিয়বাবু। ভ্যাপসা গরমে মেয়েটির একটু গলা ভিজলে কথায় কথায় জানতে পারেন, ওঁরা দুই বোন। বড়জন কলেজে পড়েন। প্রথম বর্ষ। নাম রাবেয়া সুলতানা। বাড়ি হাবড়ায়। দশম শ্রেণীর ছাত্রী বোনকে সঙ্গে নিয়ে সেখান থেকেই এসেছেন মধ্যমগ্রামের পার্টি অফিসে। রাবেয়ার আবদার, তার টাকা তৃণমূলের পতাকা তৈরির কাজে লাগুক। এই মুহূর্তে দলের ছোট ছোট যে পতাকাগুলো তৈরি করা হয়, তার একেকটির দাম পাঁচ টাকা। কুড়ি টাকায় চারটি পতাকা মিলবে। টাকার অঙ্কে যদিও এই সংখ্যাটা খুব একটা বেশি নয়। তবে জ্যোতিপ্রিয়বাবুর কথায়, “টাকাটা বড় কথা নয়। মেয়েটার মনটাই বড়।” এর পরই খাদ্যমন্ত্রী জানিয়ে দেন, মনোনয়নপর্ব মিটলে জেলায় দল প্রথম যে পতাকা নিয়ে প্রচারে নামবে, সেই পতাকা ওই কুড়ি টাকার বিনিময়েই বানাতে হবে।
রাজ্যজুড়ে যখন বিরোধীদের মনোনয়ন রুখতে তৃণমূলের বিরুদ্ধে মারধরের অভিযোগ উঠছে, তখন উত্তর ২৪ পরগনা জেলায় এই ছবি একেবারেই বিপরীতধর্মী। কিন্তু আচমকা এভাবে দুই বোন এসে তৃণমূলের নেতাদের হাতে টাকা তুলে দিলেন কেন? জেলা পার্টি অফিস সূত্রের খবর, রাবেয়া কলেজে ভর্তি হওয়ার পরই তাঁর হাতে কন্যাশ্রীর টাকা এসে পৌঁছেছে। দুই বোনই সবুজসাথীর সাইকেল পেয়েছে। তৃণমূল সরকারের কাছে এত প্রাপ্তির পর আর তাই বাড়িতে বসে থাকতে পারেননি তাঁরা। কলেজে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ৩০০ টাকার একটা টিউশন পড়ানো শুরু করেছে আঠারো বছরের রাবেয়া। মুখ্যমন্ত্রীর দলকে এবার কিছুটা প্রতিদান দিতে চান তিনি। টিউশন পড়ানোর টাকা থেকেই তাই কুড়িটা টাকা এনেছেন। একটাই ইচ্ছে, ওই টাকায় তৃণমূলের প্রচার হোক।
[‘চার আনা জ্ঞান নেই আপনাদের’, শুভব্রতর কথায় চিকিৎসকদের চক্ষু চড়কগাছ]
ইচ্ছে আরও আছে। টুকটুক করে তার প্রায় পুরোটাই বলে ফেললেন রাবেয়া। জ্যোতিপ্রিয়বাবুকে জানালেন, বাড়িতে থাকলে ফাঁকা ঘরে তিনি এখন থেকেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দেওয়া প্র্যাকটিস করেন। নকল করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে! রাবেয়ার অকপট স্বীকারোক্তি, “বলা প্র্যাকটিস করছি। প্রচারে গিয়ে যেমন নেতারা বলেন। দিদি বলেন। ঠিক সেভাবে। ভাল করে শেখা হলে মানুষের কাছে গিয়ে বলব মমতা কত কী করেছেন রাজ্যের জন্য।” জানিয়েছেন, আগামী পাঁচ বছর পঞ্চায়েতের কাজও শিখতে চান। এই পাঁচ বছরের গোটা সময়টা দলের পাশে থেকে প্রচার করে, পঞ্চায়েতের কাজ শিখে কাটাবেন তিনি। তাঁর বড় সাধ ২০২৩-এ পঞ্চায়েতের প্রার্থী হবেন! তাই জন্যই এখন মন দিয়ে কাজ শিখতে চান অষ্টাদশী কলেজছাত্রী।
ওই একরত্তি মেয়ের এত বড় ইচ্ছের কথা শুনে চমকে গিয়েছেন তুখোড় রাজনীতিবিদ। জ্যোতিপ্রিয়বাবুর কথায়, “এই হল আমাদের মুখ্যমন্ত্রীর ক্যারিশমা। মানুষ নিজে থেকে আমাদের সঙ্গে আসতে চান।” আর রাবেয়া? তাকে কি ২০২৩-এ পঞ্চায়েতে প্রার্থী করবে দল? জেলা সভাপতির কথায়, “নিজের ইচ্ছেয় যখন কাজ শিখতে এসেছে, জানবেন তার ইচ্ছেটাই সবচেয়ে বড়। ও নিজের জোরেই সবটা করে নেবে। দল ওর পাশে আছে।”
The post পতাকা কিনতে ২০ টাকা! পার্টি অফিসে হাজির কলেজ ছাত্রী appeared first on Sangbad Pratidin.
