বাংলায় ভোট আসতেই ফিরে এলেন 'বিদ্যাসাগর'! ২০১৯ সালে অমিত শাহের রোড শোয়ে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মূর্তি আছাড় মেরে ভেঙে ফেলার অভিযোগ উঠেছিল বিজেপি সমর্থকদের বিরুদ্ধে। সাত বছর পর সেই বিদ্যাসাগরেরই প্রতিকৃতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে (Narendra Modi) উপহার দিল বঙ্গবিজেপি।
রবিবার দুপুরে হুগলির সিঙ্গুরে (Singur) একটি প্রশাসনিক এবং একটি রাজনৈতিক জনসভা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। প্রশাসনিক সভা শেষ করার পর অদূরে রাজনৈতিক সভার মঞ্চে যান তিনি। সেই মঞ্চেই প্রধানমন্ত্রীর হাতে বিদ্যাসাগরের প্রতিকৃতি তুলে দেন রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। বিজেপিকে 'বাংলার সংস্কৃতির বিরোধী' বলে দাগিয়ে দিয়ে, 'বাঙালি অস্মিতা' রক্ষার কথা বলেই বরাবর নিজেদের রাজনৈতিক অস্ত্রে শান দিয়ে এসেছে তৃণমূল। তাদের এই অস্ত্র ভোঁতা করতেই প্রায় প্রত্যেক সভায় বাঙালি মনীষীদের শ্রদ্ধা জানিয়ে থাকেন মোদি। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে মোদিকে বিদ্যাসাগরের প্রতিকৃতি উপহার অস্বাভাবিক কিছু নয়।
কিন্তু এই দৃশ্যের অন্য তাৎপর্য রয়েছে। কারণ, ২০১৯ সালের মে মাসে লোকসভা ভোটের প্রচার-পর্বে বিজেপির সমর্থকদের বিরুদ্ধেই বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার অভিযোগ উঠেছিল। ঘটনার দিন বিধান সরণিতে বিজেপির তৎকালীন সর্বভারতীয় সভাপতি শাহের রোড শো ছিল। অভিযোগ ওঠে, সেই রোড শোয়ে থেকে একদল বিজেপি সমর্থক পাঁচিল টপকে বিদ্যাসাগর কলেজে ঢুকে তাণ্ডব চালান। শুধু দরজা, জিনিসপত্র ভাঙচুর নয়, অফিসঘরে বসানো বিদ্যাসাগর-মূর্তিও আছাড় মেরে ভেঙে ফেলা হয়। সেই ঘটনা গোটা রাজ্য-রাজনীতিতেই শোরগোল ফেলে দিয়েছিল। তোলপাড় হয়েছিল বাঙালি মনন। ঘটনাচক্রে, তখন থেকেই বিজেপিকে 'বাংলাবিরোধী' তকমা দিতে শুরু করে তৃণমূল।
বিজেপি অবশ্য সেই সময় দাবি করেছিল, শাহের রোড শোয়ে ইট ছুড়ে তৃণমূলই প্রথম গোলমাল বাধিয়েছে। এমনকি রোড শোয়ের আগে পোস্টার-ফেস্টুন খুলে দিয়েও প্ররোচনা সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়েছে তারা। শাসকদল সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ঘটনাস্থলে গিয়ে সেই সময় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, "বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা হয়েছে। আগুন জ্বালানো হয়েছে। এটা ওঁর ২০০ বছর। কোনও রাজনৈতিক দলের এ-রকম হাঙ্গামা কখনও দেখিনি। বিহার-রাজস্থান থেকে গুন্ডা এনে এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে। নিন্দার ভাষা নেই। আমি লজ্জিত এবং ক্ষমাপ্রার্থী। বাংলার মানুষ হয়ে আমরা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে সম্মান দিতে পারি না বিজেপির গুন্ডাদের জন্য।"
বিদ্যাসাগরের আবক্ষমূর্তি ভাঙার ঘটনার পর বিজেপির বিরুদ্ধে 'বাঙালি সংস্কৃতি ধ্বংসের' চেষ্টা করার যে অভিযোগ তোলা শুরু করে তৃণমূল, তা আজও শাসকদলের কাছে প্রাসঙ্গিক। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোট এবং ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে এই ভাষ্যকেই হাতিয়ান ভোট-বৈতরণী পার করেছে তৃণমূল। ২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটেও বিজেপির বিরুদ্ধে এই ভাষ্যই যে তাঁদের অস্ত্র, তা-ও স্পষ্ট করে দিয়েছে তারা। সম্প্রতি সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'বন্দে মাতরম' নিয়ে লোকসভায় আলোচনায় মোদির 'বঙ্কিমদা' বলে সম্বোধনে তৃণমূলের এই হাতিয়ার আরও ধারালো হয়েছে। বঙ্গরাজনীতিতে এখন আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছেন বঙ্কিমচন্দ্র। এ বার বিদ্যাসাগরও ফিরে এলেন!
