স্বামী রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Rahul Arunoday Banerjee Death) আকস্মিক প্রয়াণের শোক এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেননি, তবুও এই কঠিন সময়ে পেশাদারিত্বের পথে হেঁটে নতুন উদাহরণ তৈরি করেছেন প্রিয়াঙ্কা সরকার (Priyanka Sarkar)। গত শুক্রবার বিক্রম চট্টোপাধ্যায় প্রযোজিত 'তারকাটা' সিরিজের শুটিংয়ে যোগ দেন অভিনেত্রী। এমতাবস্থায় নেটপাড়ার নীতিপুলিশদের একাংশ প্রিয়াঙ্কার শোকযাপন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সেসব নিন্দুকদের মুখে ছাই দিয়েই এবার 'সহজের মা'য়ের হয়ে সরব হলেন অপরাজিতা আঢ্য (Aparajita Adhya)।
"এরা মানুষ হতে পারে না। কারণ একজন মানুষ কখনও অসুস্থ মায়ের ছবি দেখে লিখতে পারে না- 'কী কুৎসিত দেখতে!' কখনও একজন স্বামীহারা নারী কাজে ফিরলে বলতে পারে না যে- 'শ্রাদ্ধ হয়নি, এখনই কাজে ফিরল?' এগুলো মতামত নয়। এগুলো মানসিক নির্যাতন। মানসিক হিংসা। আমি একে একটাই নাম দিই- মানসিক ধর্ষণ বা মানসিক নির্যাতন।..."
শমীক রায়চৌধুরী পরিচালিত 'তারকাটা'য় গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করছেন প্রিয়াঙ্কা। গত ২৯ মার্চ এই সিরিজের শুটিং চলাকালীনই রাহুলের মর্মান্তিক পরিণতির খবর পেয়ে ছুটে গিয়েছিলেন। কিন্তু মাঝপথে কাজ থেমে যাওয়ায় বেশ কিছু অসম্পূর্ণ দৃশ্যের শট দেওয়ার জন্যেই এদিন শুটিংয়ে যোগ দেন অভিনেত্রী। যদিও চলতি সপ্তাহেই প্রিয়াঙ্কার শুটে যোগ দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শুক্রবার বেশ কিছু সিকোয়েন্সের শুটিংয়ের জন্য তাঁকে কাজে যেতে হয়। খবর প্রকাশ্যে আসার পর অনুরাগীদের অনেকেই যেমন অভিনেত্রীর মানসিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন, তেমন একাংশ আবার এমন প্রশ্নও তুলেছেন যে, 'স্বামীর শ্রাদ্ধ হয়নি, এখনই কাজে ফিরল?' ভ্রাতৃসম রাহুলের মৃত্যুর পর প্রিয়াঙ্কার উদ্দেশে নিন্দুকদের এহেন লাগাতার কটাক্ষ নজর এড়ায়নি অপরাজিতা আঢ্যর। এবার সেই প্রেক্ষিতেই সোশাল পাড়ার বেনামি সমালোচকদের আইনি পাঠ দিলেন অভিনেত্রী।
সোশাল পাড়ার খুল্লমখুল্লা বিষোদগারে বর্তমান প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন অপরাজিতা আঢ্য। ছবি- ফেসবুক
অপরাজিতার মন্তব্য, "অনেকদিন ধরে দেখছি, সমাজ মাধ্যমে একটা ভয়ঙ্কর অসুখ ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষ যা খুশি তাই বলছে, বিশেষ করে কমেন্ট সেকশনে। এতটাই নোংরা, এতটাই নির্মম, যে আমি নিজের কমেন্ট সেকশন বন্ধ করে রাখতে বাধ্য হয়েছি। আমি সত্যিই জানি না, এরা কারা? কিন্তু একটা কথা বলতে বাধ্য হচ্ছি- এরা মানুষ হতে পারে না। কারণ একজন মানুষ কখনও অসুস্থ মায়ের ছবি দেখে লিখতে পারে না- 'কী কুৎসিত দেখতে!' কখনও একজন স্বামীহারা নারী কাজে ফিরলে বলতে পারে না যে- 'শ্রাদ্ধ হয়নি, এখনই কাজে ফিরল?' এগুলো মতামত নয়। এগুলো মানসিক নির্যাতন। মানসিক হিংসা। আমি একে একটাই নাম দিই- মানসিক ধর্ষণ বা মানসিক নির্যাতন। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার এই মানুষগুলোর সংখ্যা খুবই বেশি। এদের মধ্যে অনেকেই নারী, যারা নিজেরা সংসার করেন, সন্তান মানুষ করেন, কিন্তু ভাবেন না, তাদের এই নোংরা মানসিকতা তাদের সন্তানদের কী শেখাচ্ছে? আমার স্পষ্ট বিশ্বাস, যারা এইভাবে মানুষকে অপমান করে, তারা নিজের জীবনে কোনওদিন সম্মান পায়নি। আর তাই অন্যকে অসম্মান করাটাই এদের কাছে সহজ। তবে এটা কিন্তু আর অগ্রাহ্য করার মতো বিষয় নয়। এই ধরনের মন্তব্য একজন মানুষকে অবসাদের দিকে ঠেলে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে আত্মহত্যার দিকেও ঠেলে দেয়। এটা সমাজকে ভিতর থেকে নষ্ট করছে।" এখানেই অবশ্য থামেননি অভিনেত্রী। সোশাল পাড়ায় অনামি প্রোফাইল থেকে উড়ো মন্তব্য করলে যে আইনি জটিলতায় মুখে পড়তে হয়, সেই সতর্কবাণীও দিয়েছেন তিনি।
"মহিলাকে অপমান করলে ৫০৯ ধারা অনুযায়ী ৩ বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে। অশ্লীল বা যৌনগন্ধী মন্তব্য করলে ৩৫৪ এ ধারা অনুযায়ী সেটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ২০০০ সালের তথ্য প্রযুক্তি আইন অনুযায়ী অশ্লীল বা আপত্তিকর কন্টেন্ট পোস্ট করলে ৩–৫ বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে। অর্থাৎ মন্তব্য বাক্সে যা খুশি বলার স্বাধীনতা নেই।..."
শুটিংয়ে যোগ প্রিয়াঙ্কা সরকারের। ছবি- সংগৃহীত
অপরাজিতার সংযোজন, "ভারতের আইনে এইসব কাজ কিন্তু অপরাধ। ভারতীয় ন্যায় সংহিতা অনুযায়ী— মানহানি করলে জেল ও জরিমানা হতে পারে। মহিলাকে অপমান করলে ৫০৯ ধারা অনুযায়ী ৩ বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে। অশ্লীল বা যৌনগন্ধী মন্তব্য করলে ৩৫৪ এ ধারা অনুযায়ী সেটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ২০০০ সালের তথ্য প্রযুক্তি আইন অনুযায়ী অশ্লীল বা আপত্তিকর কন্টেন্ট পোস্ট করলে ৩–৫ বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে। অর্থাৎ মন্তব্য বাক্সে যা খুশি বলার স্বাধীনতা নেই। তার জন্য আইনগত জবাবদিহি আছে। তাই যারা নিয়মিত এই ধরনের নোংরা, অপমানজনক, আক্রমণাত্মক মন্তব্য করে তাদের অ্যাকাউন্ট চিরতরে নিষিদ্ধ করা হোক। যারা লাগাতার এহেন কর্মকাণ্ড করেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হোক। কারণ বিশ্বাসযোগ্যতা না থাকলে সমাজ ভেঙে পড়ে। সোশাল মিডিয়া আমাদের একটা শক্তিশালী জায়গা দিয়েছে- ভালোবাসা ছড়ানোর, শেখার, নিজেকে প্রকাশ করার। কিন্তু এই জায়গা যদি ব্যবহার হয় কাউকে ভাঙার জন্য তাহলে সেটা পুরো প্রজন্মকে নষ্ট করে দেয়।" অতীতেও নেটপাড়ার হেনস্তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিনেত্রী সরব হয়েছেন। তবে এবার আইনি ধারা উল্লেখ করে মোক্ষম পাঠ অপরাজিতা আঢ্যর।
