সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলন জেন জি প্রজন্ম সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে সকলকে। টানা ২৭ দিনের বেশি ঘটনাক্রম খবর হয়েছে প্রতি মুহূর্তে। সোশাল মিডিয়া যৌবনের প্রতিবাদের রিলস, মিম-এ ছেয়ে গিয়েছিল। সেই সময় দিল্লির যুবক যশ চন্দ্রর পোস্ট করা একটি ইনস্টাগ্রাম রিল তুমুল জনপ্রিয় হয়, তিনি জানতে চেয়েছিলেন যন্তর মন্তরে কেউ তাঁকে 'প্রোটেস্ট ডেট'-এ জয়েন করতে চান কি না। তারপর আরও অনেকে পোস্ট করেন। ব্যস, অসংখ্য বার্তার ঢেউ-লেট'স গো। অধিকার অর্জনের লড়াইয়ের সঙ্গে জুড়ে গেল হাঁটতে হাঁটতে সম্পর্ক তৈরির বার্তা। প্রতিবাদে অংশ নিতে গিয়ে জেন জি-র সমমনস্ক মানুষের সঙ্গে ডেট করার প্রবণতাকেই বলা হচ্ছে 'প্রোটেস্ট ডেট'।
বিষয়টা অনেকে আন্দোলনের অজুহাতে আলাপ করার প্রবণতা হিসাবে হালকা ভাবে দেখেছেন। কেউ আবার এই প্রজন্মের প্রশংসা করেছেন আন্দোলনের মধ্যে স্যাটায়ার এলিমেন্ট নিয়ে আসার জন্য। কেউ সতর্ক করেছেন স্বার্থ সন্ধানীদের ফাঁদে পড়ে আন্দোলনের অভিমুখ যেন ঘুরে না যায়। এর মধ্যেই প্রশ্ন, সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কমপ্যাটিবিলিটি কতটা জরুরি?
প্রশ্নটা রাখলাম টলিউডের জেন জি প্রজন্মের শিল্পীদের কাছে। সদ্য 'কাতুকুতু বুড়ো' ছবিতে অভিনয় করেছেন রাপূর্ণা ভট্টাচার্য, তিনি প্রধানত গায়িকা।
রাপূর্ণা
বলছেন, "আমার মনে হয় রাজনৈতিক কমপ্যাটিবিলিটি আমরা প্রতিটা ক্ষেত্রে খুঁজি, সেটা মুখে বললেও, না বললেও। সে বন্ধুত্বে হোক, প্রেমে হোক, যে কোনও ক্ষেত্রে। কিন্তু দুজন মানুষের রজনৈতিক বিশ্বাস স্বাধীনভাবেও সহাবস্থান করতে পারে। এই জেনারেশনের কথা যদি বিশেষ করে বলি, যেহেতু সচেতনতা অনেক বেশি এই প্রজন্মের, তাই পরস্পরের রাজনৈতিক মতাদর্শ কখনওই একে অপরের ওপর আমরা চাপিয়ে দিই না। সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে বলব, যদি কোনওভাবে মতামত মিলে যায় তো সোনায় সোহাগা। কিন্তু যদি নাও মেলে তা হলেও অসুবিধা নেই। আবার আমরা কমপ্যাটিবিলিটি খুঁজেও থাকি, ইট'স আ ডাইকোটমি।"
ভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্বাসের মানুষের সম্পর্ক কি হতে পারে না। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে সুধীর মিশ্রর 'হাজারো খোয়াইশে অ্যায়সি' ছবির কথা। সাতের দশকের প্রেক্ষিত। তিন বন্ধুর রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে তাদের পথ আলাদা হয়ে যায়। চিত্রাঙ্গদা সিং, সাইনি আহুজা, কে কে মেনন অভিনীত সেই ছবিতে নকশাল আন্দোলন ও শিক্ষাক্ষেত্রে ছাত্রদের আন্দোলন নিয়ে চিত্রনাট্য। বিশ্বাস ও মতাদর্শের জন্য কী কী হয়, বারবার দেখার এই ছবিতে।
ঋতব্রত মুখোপাধ্যায়
অভিনেতা ঋতব্রত মুখোপাধ্যায় বলছেন, "কীসের জন্য রাস্তায় নামছি, এটা একটা দর্শন থেকে আসে। এক-একজনের কাছে এক একরকমের আবেগ। আর জি কর-এর ঘটনার সময় আমি মায়ের সঙ্গে পথে নেমেছিলাম, মায়ের সেটাই প্রথম মিছিলে হাঁটা। মায়ের সঙ্গে হেঁটেছিলাম বলে খুব স্পেশাল ওটা আমার কাছে। যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি, অ্যাডমিশন টেস্ট তুলে দেওয়া হবে এমন কথা হচ্ছিল, তখন ছাত্রছাত্রীরা যাতে পরীক্ষা দিয়ে যোগ্যতা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেন, সেটাতেও আমরা যোগ দিয়েছিলাম। তখন আমরা সবে সেকেন্ড ইয়ারে উঠব। সেই স্মৃতিগুলো মাথায় আছে। এতগুলো মানুষের জন্য যখন পথে নামছি এটা বড় আবেগ। যখন কেউ আন্দোলনে নামে আবেগটা ভাগাভাগি হয়ে যায় অনেক ক্ষেত্রেই। একই জিনিসের জন্য তাঁরা যখন লড়ছেন, ভালোবাসা বা প্রেম হতে পারে। এই বিষয়টা ভাবতে আমার সুন্দর লাগে। একটা কিছুর জন্য লড়তে গিয়ে যদি দুটো মানুষ তাদের মধ্যে ভালোবাসা খুঁজে নেন, সেটা অদ্ভুত মুহূর্ত। একটা ছবির কথা মনে করিয়ে দেয়- সামনে শত শত বন্দুক সেখানে দুটো মানুষ তাঁদের মধ্যে ফুল বিতরণ করছেন। বা কবীর সুমনের গানের লাইন- 'ঠোঁটে ঠোঁট রেখে ব্যারিকেড করো প্রেমের পদ্যটাই, বিদ্রোহ আর চুমুর দিব্যি শুধু তোমাকেই চাই'। এটা বিশেষ করে বাংলা কবিতা-গানে বা ভারতীয় কবিতায় এবং সারা বিশ্বব্যাপী দেখেছি।"
আর 'প্রোটেস্ট ডেট' বিষয়ে ঋতব্রতর সংযোজন, "এখন আমরা হয়তো 'প্রোটেস্ট ডেট' নাম দিচ্ছি, বিষয়টা ছিলই। এটা খুব বড় আবেগের জায়গা, কারণ এমন মুহূর্তে দু'জন মানুষ ভালোবাসা খুঁজে নিচ্ছেন। আজকের ভারতে এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক ভাবে বা সামাজিক ভাবে কী মনে করি, সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিষয়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ। যে আমি কোন পক্ষ বেছে নিচ্ছি, তা রাজনৈতিক পক্ষ নয়। সামাজিক ভাবে একজন নাগরিক হিসাবে দেশ এবং সরকার এই দুটোকে আলাদা করে দেখতে পারি কি না। বন্ধুত্ব সম্পর্ক, পরিবার, সব দিক থেকে এই দেখাটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা বোঝায় মানুষ হিসেবে কোথায় দাঁড়িয়ে আছি।"
উজান গঙ্গোপাধ্যায়
সদ্য পরিচালক-অভিনেতা উজান গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কাতুকুতু বুড়ো' ছবি মুক্তি পেয়েছে। তিনি বলছেন, 'এই আন্দালনের পরিপ্রেক্ষিতে যদিও নাও বলি, সামাজিক মতাদর্শ যদি একদম আলাদা হয় পারস্পরিক বন্ধনের জায়গা নরম হয়ে যেতে পারে। দলীয় রাজনীতি নির্বিশেষেও বলব, জীবনযাত্রা, পোশাক-আশাক, সমাজের যা যা দিক আছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে বিশ্বাসের মিলটা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়। আর সম্পর্ক বা প্রেম যে কোনও পরিস্থিতিতে তৈরি হতে পারে। স্থান-কাল বা পাত্রের ভিত্তিতে কোনও সম্পর্কের উৎস প্রেডিক্ট করা যায় বলে আমার মনে হয় না। সে কলেরা হোক বা আন্দোলন- ভালোবাসা বা বন্ধুত্ব যে কোনও পরিস্থিতিতে হতে পারে।'
অনুষা বিশ্বনাথন
সাম্প্রতিক খবর যন্তর মন্তর চত্বরে আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে প্রেম থেকে চারহাত এক হয়েছে বিহারের এক যুবক ও যুবতীর। অভিনেত্রী অনুষা বিশ্বনাথন বলছেন, "আমার মনে হয় খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হলে সেফ স্পেস-এর জায়গা থাকে। যদি কারও আমূল পরিবর্তনবাদী রাজনৈতিক মূল্যবোধ হয়, যেগুলো ক্লাশ করে, তখন দুটো মানুষের সম্পর্কে অসুবিধা হতে পারে। প্রেমও না, একটা সম্পর্কের ক্ষেত্রেই। প্রেম তো একে অপরকে না চিনেও হতে পারে। পলিটিক্যাল কমপ্যাটিবিলিটি একটা সম্পর্কে ছাপ ফেলতে পারে। দু'জনের বিশ্বাস সম্পূর্ণ বিপরীত হলে চাপ হতে পারে, আমার মনে হয়। মিছিলে প্রেম তো যুগে যুগে হয়েছে। শুধু নতুন প্রজন্ম নয়, সব জেনারেশনের ক্ষেত্রেই বলব। এবারে যে সেন্স অফ হিউমার তারা দেখিয়েছে, এই আন্দোলনের মতো সিরিয়াস বিষয়েও এত 'মিম' শেয়ার হয়েছে, লোকজন জেন জি-র প্রেমেও পড়েছে"।
