নতুন বছরে এপারে আপনার প্রথম রিলিজ ‘ওসিডি’। শেষ দুটো ছবি (‘ডিয়ার মা’, ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’) এখানে বেশ সফল। ‘ওসিডি’-র বিষয়টা বেশ সিরিয়াস। কতটা আশাবাদী ছবি নিয়ে?
- আশাবাদী এইজন্য যে, এই বিষয়টা নিয়ে বাংলাতে কোনও ছবি হয়নি। ওসিডি নিয়ে হয়নি, পিডোফিলিয়া নিয়েও হয়নি। এই দুটো বিষয়ে ভোকাল হওয়া, বিশেষ করে পিডোফিলিয়ার কথা বলব, খুব প্রয়োজন। ছবির মাধ্যমে আমরা এগুলো বলতে চাই। আমি এদেশের দর্শককে খুবই সংবেদনশীল মনে করি। এই জন্য আশাবাদী আর ছবিটা খুবই ভালো হয়েছে।
সৌকর্য ঘোষালের সঙ্গে আপনার তিনটি কাজ হয়ে গেল। দ্বিতীয়টা মুক্তি পাচ্ছে। সৌকর্যের সঙ্গে পর পর ছবি করার কারণ কী?
- পছন্দের পরিচালক। সৌকর্যের সঙ্গে কাজ করতে দারুণ লাগে। ও অনেক নতুন ধরনের কাজ নিয়ে আমার কাছে আসে। ‘ভূতপরী’-তে একেবারে অন্যরকমের চরিত্র ছিল। আমাকে দর্শক ওইরকম দেখেনি। তারপর ‘ওসিডি’। এটার মধ্যে দেখবে অভিনয়ের চারটে স্তর আছে। সৌকর্য যে আমাকে ভরসা করে এমন একটা চরিত্র দিয়েছে, এটা বিশাল প্রাপ্তি। আমার আর সৌকর্যের কাজের কম্বিনেশন দুর্দান্ত। আমি মন দিয়ে কাজটা করার চেষ্টা করেছি। আর একঝাঁক গুণী অভিনেতা-অভিনেত্রী আছেন।
শিশুদের মাধ্যমে যৌন আনন্দ খোঁজার চেষ্টা মানসিক ব্যাধি। ‘মিটু’ নিয়ে কথা বলা হলেও এই বিষয়টা নিয়ে কথা হয় না প্রায়। ছবিতে সেই জায়গাটা ধরা হয়েছে।
ট্রেলার দেখে বুঝেছি, আপনি একজন চিকিৎসকের চরিত্রে। আপনার ছোটবেলার চরিত্রে আর্শিয়া (ভুতু)। এই মেয়েটির শৈশবের এমন কোনও ট্রমা রয়েছে, যেটা পরে বোঝা যায়, তাই তো?
- আমি একজন ডার্মাটোলজিস্টের চরিত্রে। ছবির টাইটেলে দেখবে 'ওসিডি'র পর প্রশ্ন চিহ্ন আছে। অর্থাৎ একটা জিজ্ঞাসা আছে। আমার চরিত্রের অভিনয়ের চারটে ধারা রয়েছে। আর থ্রিল এলিমেন্ট তো অবশ্যই আছে, তার সঙ্গে সম্পর্কেরও গল্প। একইসঙ্গে শিশু নির্যাতন প্রসঙ্গে সচেতনতার কথাও বলা হয়েছে। শিশুদের মাধ্যমে যৌন আনন্দ খোঁজার চেষ্টা মানসিক ব্যাধি। ‘মিটু’ নিয়ে কথা বলা হলেও এই বিষয়টা নিয়ে কথা হয় না প্রায়। ছবিতে সেই জায়গাটা ধরা হয়েছে। আর শিশুরাও এখন সচেতন। তাদের গুড টাচ, ব্যাড টাচ শেখানো হয়।
জয়া আহসান, ছবি- সুখময় সেন
মানুষের শৈশব তার বাকি জীবনের গতিপথ নির্দেশ করে, প্রভাব ফেলে। আপনার জীবনে এমন কোনও ঘটনা আছে, যেটা প্রভাব বিস্তার করেছে?
- মানুষের ভিতটা ছোটবেলাতেই তৈরি হয়। তবে এই হেনস্তা, পিডোফিলিয়ার বিষয়টা, কিছু পুরুষের শিশুদের দিকে নোংরাভাবে দেখা, অশালীনভাবে দেখা– এটা কমবেশি সব সমাজে রয়েছে। এটা আমার জীবনে না হলেও, কাছের মানুষের ক্ষেত্রে এমনটা দেখেছি। আমরা সবাই কোনও না কোনওভাবে বিষয়টা দেখেছি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পরিবারের মধ্যে, কাছের মানুষের দ্বারাই আক্রান্ত হয় শিশুরা। অচেনা লোকের মাধ্যমে একটু হলেও কম হয়। গ্রাম-শহর সব জায়গাতেই ছবিটা ভয়াবহ। একটা মানুষের মানসিক গঠন তৈরিতে শৈশব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শৈশবের স্মৃতি, দর্শন যত শক্তিশালী হবে মানুষ ঠিকভাবে বেড়ে উঠবে, সেই শৈশবে যদি টারময়েল থাকে, ট্রমা থাকে, মানুষের ভিতরটা ঘুণধরা হবে। সেই অভিজ্ঞতা কমবেশি আমাদের সকলেরই আছে। এটা নিয়ে আমরা নোটিস করেও ডিনায়েলে থাকি বা পারিবারিক বিষয় বলে চুপ করে থাকি। এইখানে আমাদের অভিভাবকরা কেউ আধুনিক হয়নি।
গুটিকয়েক মানুষ সমাজমাধ্যমকে ভর করে বিদ্বেষ ছড়ায়। আমার তো সোশাল মিডিয়াটাকে ডাস্টবিন মনে হয়।
কৌশিক সেন, শ্রেয়া ভট্টাচার্য, ফজলুর রহমান বাবু, কনীনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, অনসূয়া মজুমদার, ছোট্ট আর্শিয়া– আরও অনেকে রয়েছেন। বাচ্চাটির চোখ দিয়ে কি ছবিটা দেখানো হচ্ছে? কোনটা সবচেয়ে টেনেছিল?
- গল্পটার সঞ্চালক শ্বেতা। মানে আমার যে চরিত্রটা তার চোখ দিয়েই দেখি আমরা। ছবির বিষয়টা সবচেয়ে আকর্ষণ করেছিল আমাকে। ‘ওসিডি’ আর ‘পিডোফিলিয়া’ খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমার মনে হয়েছিল, আমার ফিল্মোগ্রাফিতে এমন একটা ছবি থাকবে, যেটা নিয়ে বাংলায় কেউ কাজ করেনি।
আপনার ওসিডি (অবসেসিভ কমপালসিভ ডিজ অর্ডার) আছে?
- পরিচ্ছন্নতার ওসিডি যাকে বলে নেই আমার। ফিল্মি ওসিডি আছে। অভিনয় নিয়ে ওসিডি আছে। মানে বার বার করে দেখতে চাই আরেকটু ভালো হয় কি না। তখন পরিচালক বলে, আর কোরো না নষ্ট হয়ে যাবে। (হাসি)
পরিচালক সৌকর্য ঘোষালের সঙ্গে জয়া আহসান
এপার বাংলার কাজ কি একটু কম করছেন?
- না তো। কথা চলছে তবে এক্ষুনি ঘোষণা করার মতো হয়নি।
বর্তমানে ভারত-বাংলাদেশ দু’দেশের মধ্যে সম্পর্কে চাপানউতোর চলছে। সিনেমা কি দু-দেশের এই দূরত্ব মুছে ফেলতে সক্ষম হবে?
- শিল্পীর জোর অন্যরকম। একজন শিল্পী যখন তার শিল্প নিয়ে শক্তিশালী বা নিশ্চিত থাকে, তাকে কোনও রাজনৈতিক দল করতে হয় না। তাকে অন্য কোনও কিছু নিয়ে টেনশন করতে হয় না। আমি সবসময় বলি, যে বাংলা সিনেমার জন্য কাজ করি। শুধুমাত্র বাংলাদেশের বাঙালিদের জন্য নয়, বা শুধু পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের জন্য নয়। সারা পৃথিবীতে যেখানে যত বাঙালি ছড়িয়ে আছে তাদের সবার কাছে পৌঁছতে চাই আমি, একজন বাঙালি শিল্পী হয়ে। ইউএই কিংবা পাকিস্তানেও যে বাঙালি আছে, তার কাছেও পৌঁছতে চাই। তারাও আমাদের দর্শক। সারা পৃথিবীতে বাংলার দর্শক আছে। এটা একমাত্র আর্টিস্টই করতে পারে।
দু-দেশেরই একাংশের মানুষের মধ্যে পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ তৈরি হয়েছে। সেটা কাটানোর উপায় কী মনে হয়?
- এটা একেবারে সাময়িক মনে হয়। সমাজমাধ্যমে যতটা দেখো, বা এটাকে বাড়িয়ে দেখানো হয়, বাংলাদেশে সেরকম কিন্তু মোটেই নয়। আমি দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি। এবং এপারেও আমি একই জিনিস দেখেছি। গুটিকয়েক মানুষ সমাজমাধ্যমকে ভর করে বিদ্বেষ ছড়ায়। আমার তো সোশাল মিডিয়াটাকে ডাস্টবিন মনে হয়। কিন্তু এপারে এসে আমি যে ভালোবাসা পাচ্ছি, আমার ছবি রিলিজ করছে, কমেন্টে কত ভালোবাসা পাচ্ছি, সেগুলো সত্যি। ওই বিদ্বেষ তো পাই না। কাজেই যারা এগুলো করে তারা কিন্তু গুটিকয়েক মানুষ। তারা এপারে আছে, ওপারেও আছে, তারাই বাকযুদ্ধটা করে। এক-একটা ইস্যু বানায়, সেটা কখনও সিনেমা, কখনও ক্রিকেট। কিন্তু আমরা এসবের বাইরে, সারা পৃথিবীর বাঙালিদের জন্য কাজ করে যেতে চাই। আমার মনে হয় না ওইসব কখনও অ্যাফেক্ট করে।
