পঁচিশ সালে ফেডারেশনের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে একাধিকবার চর্চার শিরোনামে থেকেছেন পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় (Parambrata Chatterjee)। বিতর্কের আগুন যখন প্রায় নিভু নিভু, সেসময়ে কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মঞ্চে দেখা মেলে অভিনেতা-পরিচালকের। সেসময়েই এক ভিডিও বার্তায় ক্ষমা চেয়ে তিনি জানিয়েছিলেন, ফেডারেশনের বিরুদ্ধে আইনি পথে হাঁটা হঠকারী সিদ্ধান্ত ছিল। শুধু তাই নয়, 'ফেডারেশন অফ সিনে টেকনিশিয়ান্স অ্যান্ড ওয়ার্কার্স অফ ইস্টার্ন ইন্ডিয়া'র সঙ্গে আর কোনওরকম আইনি জটিলতায় যেতে চান না বলেও জানিয়েছিলেন তিনি। এবার বুধ সন্ধ্যায় রুদ্রনীল ঘোষের ডাকা বৈঠকে টেকনিশিয়ানস স্টুডিওতে হাজির হয়ে বিস্ফোরক কথা বললেন পরমব্রত। 'বিশ্বাস ব্রাদার্স'-এর জমানায় কোন চাপে পড়ে ক্ষমা চেয়েছিলেন? সেকথা ভাগ করতে গিয়েই কার্যত বোমা ফাটালেন।
"আমি কারও বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত বিষোদগারের জন্য এখানে আসিনি। আমি কারও বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত রাগও পেশ করতে চাই না। কিন্তু আপনাদের যেহেতু বাড়ির লোক ভাবি, সেইজন্য...।"
পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের মন্তব্য, "সেদিন আমার সদ্যজাত সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে, দাঁতে দাঁত চেপে ক্ষমা চেয়েছিলাম। আর কোনও উপায় ছিল না তাই। আমি কারও বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত বিষোদগারের জন্য এখানে আসিনি। আমি কারও বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত রাগও পেশ করতে চাই না। কিন্তু আপনাদের যেহেতু বাড়ির লোক ভাবি, সেইজন্য ব্যক্তিগত অপমানের কথাটা ভাগ করে নিলাম। ভবিষ্যতে যেন এরকম পরিস্থিতি তৈরি না হয়।" কথাগুলো বলার সময়ে অভিনেতা-পরিচালকের চোখের কোণে অশ্রু চিকচিক করে ওঠে! এরপরই বন্ধু রুদ্রনীল ঘোষের উদ্দেশে পরিচালক-অভিনেতার মন্তব্য, "আমি যে অধিকারে এখানে বসে কথা বলছি, তার প্রাথমিক কারণ রুদ্র আর আমার ২৫ বছরের বন্ধুত্ব। রুদ্র এবং আমার বন্ধুত্বের মধ্যে যতটা বেশি বন্ধুত্ব, তার থেকেও বেশি মতপার্থক্য রয়েছে। সেই মতপার্থক্য কখনও ব্যক্তিগত, কখনও রাজনৈতিকও। কিন্তু আমরা এই বন্ধুত্বের মধ্যে কখনও রাজনীতি আসতে দিইনি। আমার মনে হয়, আমাদের এই ইন্ডাস্ট্রিতে সবার আগে এটাই হওয়া দরকার।" পরমব্রত চান এবার প্রাক ২০১১ সালের মতো বাম জমানার ইন্ডাস্ট্রি ফেরত আসুক। মন্তব্য ছড়িয়ে পড়তেই পরমব্রতকে পালটা একুশের বিধানসভা ভোটের রেজাল্ট বেরনোর পর 'রগড়ানি দিবস ঘোষিত হোক' বলে উল্লাসের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন নেটভুবনের একাংশ।
পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়।
টেকনিশিয়ানদের মনে এতদিনের যে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত ছিল, রুদ্রনীলকে সামনে পেয়ে স্বরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে সেসব ক্ষোভই উগরে দেন অনেকে। বিভিন্ন টেকনিশিয়ান উপস্থিত হয়ে তাঁদের উপর হওয়া অত্যাচারের বর্ণনা শোনান রুদ্রনীলকে। কাউকে খুনের হুমকি দেওয়া হয়েছিল, কারওর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীয়ের উপর অত্যাচার করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ।
বুধবার বিকেলে টেকনিশিয়ান্স স্টুডিওতে বৈঠক ডেকেছিলেন শিবপুরের বিধায়ক তথা অভিনেতা রুদ্রনীল ঘোষ। নবর্নিবাচিত তারকা বিধায়কের ডাকে এদিন বৈঠকে হাজির হয়েছিলেন পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, সৃজিত মুখোপাধ্যায়, ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত, অশোক ধানুকা, সৌরভ দাস, জয়দীপ মুখোপাধ্যায়, শ্রীজিৎ রায়-সহ আরও অনেকে। মূলত টলিউডের অন্দরের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে এদিন খোলাখুলি আলোচনা হয়। বৈঠকে বিভিন্ন টেকনিশিয়ান্স গিল্ডের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। টেকনিশিয়ানদের মনে এতদিনের যে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত ছিল, রুদ্রনীলকে সামনে পেয়ে স্বরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে সেসব ক্ষোভই উগরে দেন অনেকে। বিভিন্ন টেকনিশিয়ান উপস্থিত হয়ে তাঁদের উপর হওয়া অত্যাচারের বর্ণনা শোনান রুদ্রনীলকে। কাউকে খুনের হুমকি দেওয়া হয়েছিল, কারওর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীয়ের উপর অত্যাচার করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন।
রুদ্রনীলের কথায়, "মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আমাদের চারজনকে দায়িত্ব দিয়েছেন। আমাদের কাজ, টলিউড থেকে বিভিন্ন সমস্যা কালেক্ট করে তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরে জানানো।..."
রুদ্রনীল ঘোষ।
ফেডারেশনের সঙ্গে মতবিরোধের জেরে পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, অনির্বাণ ভট্টাচার্য, জয়দীপ মুখোপাধ্যায়, শ্রীজিৎ রায়ের মতো পরিচালকরা ব্যান ছিলেন। ধীরে ধীরে অনেক পরিচালক নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করেন। এমনকী, প্রাক্তন শাসক দলের অনুষ্ঠানেও দেখা গিয়েছিল পরমব্রতকে। কিন্তু এই বৈঠকে হাজির হয়ে কয়েক মাস বাদে ক্ষমা চাওয়ার নেপথ্যে সত্যিটা প্রকাশ্যে আনলেন অভিনেতা-পরিচালক। পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের মন্তব্য, "ফেডারেশন দ্রুত গঠন করা হোক। মউ-চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, সেগুলোর বিষয়েও নজর দেওয়া হোক। প্রযোজক, পরিচালক, টেকনিশিয়ানরা সবাই একসঙ্গে বসে আলোচনা করে সমস্যার সমাধান করতে হবে।” প্রযোজক ফিরদৌসুল হাসান বলেন, "সারা ভারতে প্রযোজকদের গিল্ড থাকলেও বাংলায় কোনও সক্রিয় প্রযোজক গিল্ড নেই। বাংলায় এই গিল্ড হওয়া প্রয়োজন।" পাশাপাশি ইমপাকেও কটাক্ষ করতে ছাড়েননি তিনি। বৈঠকে সকলের অভিযোগ, মতামত, পরামর্শ শোনেন রুদ্রনীল। রুদ্রনীলের কথায়, "মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আমাদের চারজনকে যে দায়িত্ব দিয়েছেন, সেই দায়িত্ব আমরা পালন করছি। আমাদের কাজ, টলিউড থেকে বিভিন্ন সমস্যা কালেক্ট করে তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরে জানানো। যাতে সকলের ভালো হয়।" 'গুপী শুটিং'-এর বিলুপ্তি ঘটাতে হবে বলেও জানান তিনি। ফেডারেশনের রাশ কার হাতে থাকবে? সেই নিয়ে জোর জল্পনা চলছে টলিউডে।
