shono
Advertisement
Prosenjit Chatterjee

'ডিভোর্সের আগে জন্মদিনে দেবশ্রীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম...', কোন 'অভিমান'-এর কথা বললেন প্রসেনজিৎ?

বাংলা ইন্ডাস্ট্রি, পদ্ম সম্মান, নতুন ছবিতে রকস্টার অবতার এবং নিঃস্বার্থ ভালোবাসা প্রসঙ্গে অকপট আড্ডায় প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়।
Published By: Sandipta BhanjaPosted: 08:30 PM Jun 05, 2026Updated: 08:30 PM Jun 05, 2026

পদ্মশ্রী সম্মান অর্জন দায়িত্ব অনেক বাড়িয়ে দিল...
- (স্মিত হেসে) দায়িত্ব বাড়িয়েছে মানে, দিল্লিতে পুরস্কারটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে বারান্দায় গিয়েই আমার ছেলেকে বলেছিলাম, ‘কাল থেকে আমার যে ছবিটা হবে, ওটা আমার জীবনের প্রথম ছবি।’ আমি এখনও পাগলের মতো খুঁজছি যদি আবার একটা ‘লালন’ করা যায় বা আন্তর্জাতিক মানের কোনও কাজ।

Advertisement

দেখলাম, বাড়ি ফিরে রকি আর র‌্যাম্বোকে (পোষ‌্য) চাই-ই-চাই।
- বাড়িতে এসে বাকি সকলের সঙ্গে ওদের দু’জনকে না দেখতে পেলে মন খারাপ হয়ে যায়। অনেক সময় ভোরবেলা যখন ফিরি ওরা ঘুমায়। বাইরে থাকলে আমি ভিডিও কল করে ওদের সঙ্গে দেখা করি।

যিনি মিস্টার ‘ইন্ডাস্ট্রি’ তাঁর চারপাশে ভিড়। বাড়িতেও অনেক সদস্য। তার পরেও কি একা লাগে বলে ওদের চাই?
- (একটু থেমে) কিছুটা তো বলা যেতেই পারে। ওদের মধ্যে কোনও জটিলতা নেই। যেমন বাচ্চাদের মধ্যে। মোহরের ছেলেকে নিয়ে আমি অনেকটা সময় কাটাই। রকি আর র‌্যাম্বোর তেমন চাহিদা কিছু নেই। একদম নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।

‘অভিমান’ শব্দটা শুনলে বুক কাঁপে?
- বুক কাঁপে বলব না। অভিমানের মধ্যে মিষ্টত্ব আছে। অভিমানের পরে যেটা হয়, একটা সেলফ ডেসট্রাকশনের জায়গা আসে। অভিমান এটার জন্যই করা যে, কবে, কখন, কীভাবে অভিমান ভাঙাবে। আমি যার প্রতি অভিমান করেছি সেটাও হতে পারে। আবার যে আমার প্রতি অভিমান করে আছে, তারও হতে পারে। অভিমান ভাঙানোর মুহূর্তটার জন্য অপেক্ষা থাকে। এর মধ্যে অসম্ভব সৌন্দর্য আছে।

"একটা ঘটনার কথা মনে পড়ছে, আমার ডিভোর্সের আগে দেবশ্রী রায়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম জন্মদিনের দিন। কিন্তু যে কোনও কারণেই হোক দেখা করা গেল না। সেটা বেশ..." 

ভালোবাসার উল্টোপিঠে অভিমান লেখা থাকে। নিজের অভিজ্ঞতা কী বলে?
- (হাসি) সেটাই তো স্বাভাবিক। এরকম অনেক অভিজ্ঞতা আছে, কোনও একটা বলা মুশকিল। আমার জীবনে অনেকগুলো চ্যাপটার।

কোনও একটা বলা যায়?
- ঋতুর (ঋতুপর্ণ ঘোষ) সঙ্গে আমার অভিমান তো জীবনের চলমান অংশ। একটা ঘটনার কথা মনে পড়ছে, আমার ডিভোর্সের আগে দেবশ্রী রায়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম জন্মদিনের দিন। কিন্তু যে কোনও কারণেই হোক দেখা করা গেল না। সেটা বেশ লম্বা অভিমান ছিল। তখন বয়সটাও খুব কাঁচা। তখন অভিমানের মাত্রাগুলো অন্যরকম ছিল।

বাবার সঙ্গে একসময় আপনার অভিমানের জায়গা ছিল...
- সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবটাই ঠিক হয়ে যায়। বাপির সঙ্গেও আমার অনেকদিন ধরেই সব ঠিক চলছে। প্রত্যেকটা পুজোয় আমি যাই, মিশুক যায়। বম্বে গেলে আমি দেখা করি। একটা সময় অভিমান ছিল ঠিকই। ছবির সংলাপেও আছে– আসলে বয়সের সঙ্গে, সময়ের সঙ্গে, পরিস্থিতির সঙ্গে আমাদের ভুল বোঝাবুঝি, জীবনটাকে দেখা পালটায়। বাপির সঙ্গে অনেক বছর ধরেই ঠিকঠাক। কারণ, ওঁর যা বয়স এখন, আমারও বয়স বাড়ছে, মিশুক বড় হয়ে গেল (হাসি)।

প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। ছবি- ফেসবুক

এই ছবিতে আপনি রকস্টারের ভূমিকায়। রকস্টারের চরিত্র হয়ে ওঠা কতটা শক্ত ছিল?
- এমন সংগীত শিল্পী হয়ে ওঠা যেমন শক্ত ছিল, তেমন চরিত্রে আরও একটা দিক আছে সেটাও শক্ত। রকস্টার দু’ধরনের হতে পারে। যেমন আমারই দুটো দিক। একদিকে যেমন আমি পপুলার সিনেমার নায়ক। অন্যদিকে আমি ‘দোসর’ বা ‘ক্লার্ক’-এর মতো ছবির অভিনেতা। ঠিক তেমন পপুলার রকস্টার আমি নই ‘অভিমান’-এ। চরিত্রের গভীরতা অনেক বেশি। নিজের জীবন থেকে ভাষা খোঁজে। ভাষা হারিয়েও যায়। তখন লোকে তাকে অপছন্দ করে। কারণ সে নিজের শিল্পকে বিক্রি করছে না। আর মেশিনের মতো সে গান বার করে না। একটু রগচটা। আমার কেরিয়ারে এই প্রথম আমি একজন অ্যারোগ‌্যান্ট রকস্টারের ভূমিকায় কাজ করলাম, খুব পছন্দের চরিত্র।

পরিচালক ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্তর সঙ্গে আলোচনা করেছেন, না কি রূপমের পরামর্শ নিয়েছেন?
- আইডির উপর বেশি নির্ভর করেছি। রূপমের সঙ্গে আলোচনা করেছি। আমি ওর ফ্যান। শরীরী ভাষা আর এনার্জিটা আনার জন্য ওর প্রচুর ভিডিও দেখেছি। আর এই রকস্টার কিন্তু আজকের নয়। বেশ কয়েক বছর আগের। খানিকটা অঞ্জনদার (দত্ত) ধরনের বলা যায়।

"সব থেকে বড় কথা, ৩৬০ ডিগ্রি রেঞ্জের অভিনেতা যিশু। আর সৌরভ খুব মিষ্টি। ওদের কম্বোটা দারুণ। দু’জনকেই ভালোবাসি।..." 

এই প্রথমবার আপনি, শুভশ্রী এবং যিশু একসঙ্গে।
- বিষয়টা ভালো লেগেছে বলেই রাজি হয়েছি। আর আইডির কাজ কম হলেও প্রত্যেকটা কাজ আমি দেখেছি। ওর নিজের একটা সিগনেচার আছে। বেশ সংবেদনশীল। যে ধারার ছবিগুলো আমরা বলছি ফিরিয়ে আনতে চাই, ব্যবসা করতে চাই, যে ছবিগুলো দেখে বাঙালি উত্তেজিত হত সেখান থেকে আমরা অনেকটা সরে গিয়েছি বলে আমার মনে হয়। সেটা যে কোনও কারণেই হোক। ওই ধারাটাকেই নিয়ে আমরা কালচার করছি কিন্তু ধারাটার কাছাকাছি নেই। আইডি নিজের মতো করে বাঙালির সেনসিবিলিটি ছুঁয়ে ছবি করে। ওর আগের কাজগুলো তাই আমাকে নাড়া দিয়েছে। ‘অভিমান’-এর গল্পটা যখন শোনায়, তখনই বলেছিল, ‘তুমি না করলে আমরা করতে পারব না।’ তারপর গল্পের সঙ্গে যে চরিত্রগুলো আমার পাশে এল– যেমন যিশুর সঙ্গে আমার আসাধারণ কেমিস্ট্রি। শুভশ্রীর সঙ্গে আমার প্রথম কাজ এটা। অভিনেত্রী হিসাবে শুভশ্রীর পরিবর্তনটা চোখের সামনে দেখলাম। সব মিলিয়ে মনে হয়েছে ছবিটা সেরিব্রাল বাঙালিরা পছন্দ করবেন। কিন্তু গল্পটা সকলের।

যিশু-সৌরভের প্রযোজনা কি ‘অভিমান’ করতে বাড়তি কিক দিয়েছিল?
- ওদের অনেস্টি, ভালোবাসা, আমার প্রতি বিশ্বাস, সম্মান আমাকে এই ছবিটা করতে বলে। যিশুকে কত ছোট থেকে দেখছি! ও কিছু বললে, না করতে পারি না। যিশু মানুষ হিসাবে খুব ভালো, ইমোশনাল। আর সব থেকে বড় কথা, ৩৬০ ডিগ্রি রেঞ্জের অভিনেতা যিশু। আর সৌরভ খুব মিষ্টি। ওদের কম্বোটা দারুণ। দু’জনকেই ভালোবাসি। আর একটা বিষয় হল এই যে, প্রযোজক মানেই শুধু যারা টাকা দেবে তা নয়। ক্রিয়েটিভ মানুষরাও একটু একটু করে প্রযোজনায় এলে আখেরে বাংলা ছবির লাভ। যেটা সময়ের অভাবে আমরা করতে পারিনি। যিশু, অঙ্কুশ প্রযোজনায় এসেছে। দেব-জিৎ তো ছিলই। এটা খুব ভালো লক্ষণ।

'অভিমান'-এ প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়।

এর মধ্যেই বাংলা ছবি সুনাম হারাচ্ছে এই ধারণাটা ক্রমশ দৃঢ় হচ্ছে। কতটা আশাবাদী?
- কয়েকটা ছবি ভালো চলেছে। সাম্প্রতিক কালে আমার ‘কাকাবাবু’ দারুণ চলেছে। ‘সোনাদা’ চলেছে। একটা জিনিস বিশ্বাস করি, সিনেমা ভালো হলে লোকে হল-এ গিয়ে দেখবে। বাংলা সিনেমা নিয়ে অনেকেই আলোচনা করেন। আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি, তঁারা সারা ভারতের সিনেমা হল-এর যে অবস্থা সেটা বোধহয় জানেন না। তাদের অবস্থা আরও খারাপ। যদি জানুয়ারি থেকে দেখি এখনও পর্যন্ত চার-পাঁচটা ছবি খুব ভালো চলেছে। দু’-একটা ছবি খুব ব্যবসা না করলেও আলোচিত হয়েছে। তার মধ্যে অনেক নতুন পরিচালকও রয়েছে। যেমন, আমি ‘অদম্য’র কথা বলব। তার আগে ‘দোস্তজি’ রয়েছে। আমার ‘অংক কি কঠিন’ দারুণ লেগেছিল বলেই সেই পরিচালক সৌরভ পালোধিকে নিয়ে কাজ করলাম। সারা ভারতে যাঁরা মেনস্ট্রিম ছবি বানান তাঁরা কিন্তু কিছু নতুন পরিচালক, অফবিট কাজের পাশেও এসে দাঁড়ান। এই বিষয়টা যেন এখানে বেশ কমে গিয়েছে। অথচ কিছুদিন আগেও ছিল।

পরিচালনায় আসছেন বলেছিলেন?
- হ্যাঁ, এই বছরে না হলেও সামনের বছরের মধ্যে হবে তো বটেই।

"যদি আমরা সোশাল মিডিয়াতে কথা না বলে ঘরে কথা বলি তাহলে ভালো হয়। অনেক দিন ধরেই এটা বলছি। বিশ্বাস করি দর্শক আমাদের ভালোবাসেন। এত লোক খেলাধুলো করছে, ক’জন ওপেন ফোরামে নিজেদের মধ্যে ঝগড়ার কথা নিয়ে আসেন?..." 

তৃষাণজিৎ কবে সিনেমায় আসছে?
- ও লড়াই চালাচ্ছে। এখন মাত্র কুড়ি। আর এক-দু’বছর গেলে ম্যাচিওরিটি আসবে। এখন যদি ছবি করে, ওর মতন গল্প সারা ভারতে ক’টা হয়? কুড়ি বছর বয়স মাত্র, এখনও আদো আদো মুখটা। আর একটু মুখটা ভাঙলে পর পর ব্যাটিং করবে। কারণ আমি নিজে যা ফেস করেছি ‘দুটি পাতা’র পরে আমাকে কেউ কাস্ট করেনি অনেক বছর। তখন আমার ১৯ বছর। তার অনেক পরে আমি ‘অমর সঙ্গী’ করেছি।

প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। ছবি- ফেসবুক

ইদানীং কালে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির মানুষের প্রতি সাধারণ মানুষের ভালোবাসা কি একটু ফিকে দেখাচ্ছে?
- আমি জানি না কেন। আসলে যদি আমরা সোশাল মিডিয়াতে কথা না বলে ঘরে কথা বলি তাহলে ভালো হয়। অনেক দিন ধরেই এটা বলছি। বিশ্বাস করি দর্শক আমাদের ভালোবাসেন। এত লোক খেলাধুলো করছে, ক’জন ওপেন ফোরামে নিজেদের মধ্যে ঝগড়ার কথা নিয়ে আসেন? তাঁরা যদি পারেন, আমরা পারব না! আমরা চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর টিকে আছি কী করে? আগে কি আমাদের মধ্যে ঝগড়া-অভিমান হয়নি? সবটা ঘরের মধ্যে মেটাতাম। এই কথা বলে বলে আমি ক্লান্ত। সেই জন্য আমি কথা বলা বন্ধ করেছি।

রাজনৈতিক পালাবদলে কি ইন্ডাস্ট্রির ভালো হবে মনে করেন?
- পলিটিকাল কথা আমি বলব না বলেছিলাম, তবে এটা রাজনৈতিক নয়। যাঁরাই জিতেছেন, ভোট হয়তো কয়েক সেকেন্ডের একটা বোতাম টেপা– কিন্তু মানুষের প্রচুর আশা-স্বপ্ন ওই কয়েক সেকেন্ডে থাকে। আমার আজীবনের স্বপ্ন– সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটক, পরবর্তীকালে গৌতমদা (ঘোষ), ঋতু (ঋতুপর্ণ ঘোষ)– এঁরা যে আন্তর্জাতিক মানের ছবি করে গেছেন, বাণিজ্যিক সিনেমার সঙ্গে সঙ্গে এই আমাদের ঐতিহ্য। বিশ্বের দরবারে নতুন প্রজন্ম, বাংলা সিনেমার এই জায়গাটা যেন ফিরে পাওয়া যায়। আশা করব অন্য রাজ্যে এঁরা যেমন ভালো কাজ করছেন, আমরাও যেন সিনেমার ভালো কাজ করতে পারি, তাঁদের থেকে সাহায্য পাই।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement