তালসারিতে মর্মান্তিক ঘটনার ৭২ ঘণ্টায় পেরলেও 'চুপ' প্রযোজনা সংস্থা ম্যাজিক মোমেন্ট মোশন পিকচার্স! একাধিক বিভ্রান্তিকর বিবৃতি, প্রোডাকশন ইউনিটের সদস্যদের বয়ানে অসঙ্গতির মাঝেই রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর (Rahul Banerjee Death) দায় তাঁর উপরই চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। আউটডোরে শুটিং করাকালীন একজন খ্যাতনামা অভিনেতার বেঘোরে প্রাণ চলে যাওয়ার এই দায় কার? দিন তিনেক ধরেই এমন প্রশ্নে সরগরম টালিগঞ্জ স্টুডিওপাড়া। শোক সামলে এবার রাহুলের মৃত্যুর বিচার চেয়ে বিস্ফোরক অরিন্দম শীল।
"দুদিন হয়ে গেল, প্রযোজনা সংস্থার মুখে কুলুপ কেন। কেন এত রকমের বিভ্রান্তিকর বিবৃতি? কি সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছিল সমুদ্রে নেমে শুটিং করার আগে? না নেওয়া থাকলে এই প্রযোজনা সংস্থার বিরুদ্ধে এখনও অবধি কেন কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না? কোথাও কোনও স্বচ্ছতা নেই। দু'দিন হয়ে গেল। শিল্পীদের ফোরাম কী বলছেন? পুলিশ কী করছেন? দায়িত্ব পুরোপুরি প্রযোজনা সংস্থার উপর বর্তায়। তাদের এই চুপ করে থাকা, পরিষ্কার করে সামনে এসে দায়িত্ব নিয়ে বিবৃতি না দেওয়া - সবটাই মেনে নেওয়া যায় না। ঠিক যেভাবে রাহুলের এই চলে যাওয়া মেনে নেওয়া যাচ্ছে না।"
রাহুলের মৃত্যুর বিচারের দাবিতে সরব অরিন্দম শীল, ছবি- ফেসবুক
খবর, বুধবার বেলা তিনটে নাগাদ গলফগ্রিন থানায় প্রযোজনা সংস্থা ম্যাজিক মোমেন্টস-এর বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করার কথা প্রিয়াঙ্কা সরকারের। অন্যদিকে নোটিস পাঠানোর পাশাপাশি আইনি পদক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আর্টিস্ট ফোরামও। এমতাবস্থায় বাংলা সিনেইন্ডাস্ট্রির ৩৭ বছরের সদস্য হিসেবে বিচার চেয়ে গর্জে উঠলেন অরিন্দম শীল। এদিন সোশাল মিডিয়ায় বেশ কিছু 'ইস্যু' উত্থাপন করেছেন পরিচালক। যেখানে উল্লেখ, "রাহুলের এই মৃত্যুর কারণের অনেকটাই তাঁর উপর চাপিয়ে দেওয়ার যে চেষ্টা চলছে তার তীব্র প্রতিবাদ করছি। আমাদের বাবিন এর মৃত্যুর বিচার চাই।" অরিন্দম প্রশ্ন তুলেছেন, "সত্যি কোনও অনুমতি ছাড়া অন্য রাজ্যে গিয়ে শুটিং হচ্ছিল? কী করে প্রোডাকশন ম্যানেজার শুটিং করতে গেল বিনা অনুমতিতে? কার প্ররোচনায়? ফেডারেশন কি অবগত ছিল? জোয়ারের সময় কী করে শুট করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল? এই সিদ্ধান্ত কখনও কোনও অভিনেতার হতে পারে না। কে নিল এই সিদ্ধান্ত? প্রতিদিন যেখানে ২০-২২ মিনিটের ফুটেজ তুলতে হয় সিরিয়ালের ক্ষেত্রে, সেখানে কোনও অভিনেতার কথায় দৃশ্য বাড়ানো যায় না।" এখানেই শেষ নয়! অরিন্দম মনে করিয়ে দিলেন, "দুদিন হয়ে গেল, প্রযোজনা সংস্থার মুখে কুলুপ কেন। কেন এত রকমের বিভ্রান্তিকর বিবৃতি? কি সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছিল সমুদ্রে নেমে শুটিং করার আগে? না নেওয়া থাকলে এই প্রযোজনা সংস্থার বিরুদ্ধে এখনও অবধি কেন কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না? কোথাও কোনও স্বচ্ছতা নেই। দু'দিন হয়ে গেল। শিল্পীদের ফোরাম কী বলছেন? পুলিশ কী করছেন? দায়িত্ব পুরোপুরি প্রযোজনা সংস্থার উপর বর্তায়। তাদের এই চুপ করে থাকা, পরিষ্কার করে সামনে এসে দায়িত্ব নিয়ে বিবৃতি না দেওয়া - সবটাই মেনে নেওয়া যায় না। ঠিক যেভাবে রাহুলের এই চলে যাওয়া মেনে নেওয়া যাচ্ছে না।"
তালসারিতে শেষ শুটিংয়ে রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়। নিজস্ব চিত্র
"আউটডোর শুটিংয়ে একজন চিকিৎসক এবং প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র হাতের কাছে রাখা আবশ্যিক। যদি অত্যন্ত দুর্গম কোনও এলাকায় শুটিং করা হয়, তবে 'কল টাইম' থেকে শুরু করে 'প্যাক-আপ' পর্যন্ত পুরো সময়টায়, চিকিৎসক-সহ একটি 'ক্রিটিক্যাল কেয়ার অ্যাম্বুলেন্স' ঘটনাস্থলে রাখা বাধ্যতামূলক করা হোক। যদিও এই নিয়মগুলো টলিউডে সরকারিভাবে বাধ্যতামূলক নয়, তবুও আমার সিনেমা 'অভিযাত্রিক' এবং 'দেবী চৌধুরাণী'র শুটিংয়ের সময় আমি কড়াভাবে এই সমস্ত নিরাপত্তা বিধি মেনে চলেছিলাম।"
রাহুলের মৃত্যুর বিচারের দাবিতে সরব শুভ্রজিৎ মিত্র, ছবি- ফেসবুক
ভারাক্রান্ত হৃদয়ে 'কর্পূর' পরিচালক বলছেন, "এই ইন্ডাস্ট্রির ৩৭ বছরের একজন সদস্য হিসেবে আর চুপ করে থাকতে পারলাম না। মেরুদণ্ডগুলো সব কোথায় এখন?" অন্যদিকে রাহুলের মৃত্যুতে কাঠগড়ায় টলিপাড়ার শুটিং নিয়মবিধি এবং শিল্পী-কলাকুশলীদের নিরাপত্তাও। সেপ্রসঙ্গ উত্থাপন করেই বেশ কয়েকটি প্রস্তাব কার্যকর করার দাবি তুলেছেন পরিচালক শুভ্রজিৎ মিত্র। দেবী চৌধুরাণী' পরিচালকের মতে, "সমুদ্র, নদী-হ্রদ কিংবা পুকুরের খুব কাছাকাছি বা জলের সংস্পর্শে যদি কোনও শট দেওয়া হয় তাহলে প্রত্যেক অভিনেতার সঙ্গে একজন করে প্রশিক্ষিত পেশাদার উদ্ধারকারী থাকা আবশ্যক। শট নেওয়ার সময়ে ওই উদ্ধারকারীকে অবশ্যই অভিনেতার ৫ থেকে ১০ ফুটের মধ্যে থাকতে হবে। যদি তিনি ক্যামেরার ফ্রেমে চলেও আসেন, তাহলে পোস্ট-প্রোডাকশনের সময়ে ভিএফএক্স-এর মাধ্যমে ফ্রেম থেকে ওই ব্যক্তিকে সরানোর জন্য সংশ্লিষ্ট প্রযোজনা সংস্থাকে অবশ্যই সেরকম বাজেট বরাদ্দ রাখতে হবে। অভিনেতাদের যদি গভীর জলে নামতে হয় কিংবা নৌকায় চড়ে শট দিতে হয়, তাহলে লোকেশনে অন্তত দুটি স্পিডবোট রাখতে হবে, যাতে প্রয়োজনে ১০ সেকেন্ডের মধ্যেই সেগুলো ব্যবহার করা যায় প্রয়োজনে। আগুনের শট থাকলেও সেটে নিরাপত্তা অবলম্বন করতে হবে। প্রয়োজনে পেশাদার স্টান্টম্যান থাকবে। শট নেওয়ার সময়ে ঘটনাস্থলে পর্যাপ্ত পরিমাণে অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম এবং জল প্রস্তুত রাখতে হবে। অভিনেতাদের যদি ১০ ফুটের বেশি উচ্চতাসম্পন্ন কোনও মঞ্চ বা প্ল্যাটফর্মে অভিনয় করতে হয়, তবে সেই শটটি অবশ্যই প্রশিক্ষিত পেশাদারের তত্ত্বাবধানে এবং 'বডি হারনেস'--এর সাহায্যে সম্পন্ন করতে হবে। নিচে যেন উপযুক্ত 'কুশনিং প্যাড' থাকে। এধরনের ঝুঁকিপূর্ণ শুটিংয়ের সময়ে 'আর্টিস্ট ফোরাম' এবং 'টেকনিশিয়ান গিল্ড'-এর প্রতিনিধিদের সেটে উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক।"
শুভ্রজিতের সংযোজন, "আউটডোর শুটিংয়ে একজন চিকিৎসক এবং প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র হাতের কাছে রাখা আবশ্যিক। যদি অত্যন্ত দুর্গম কোনও এলাকায় শুটিং করা হয়, তবে 'কল টাইম' থেকে শুরু করে 'প্যাক-আপ' পর্যন্ত পুরো সময়টায়, চিকিৎসক-সহ একটি 'ক্রিটিক্যাল কেয়ার অ্যাম্বুলেন্স' ঘটনাস্থলে রাখা বাধ্যতামূলক করা হোক। যদিও এই নিয়মগুলো টলিউডে সরকারিভাবে বাধ্যতামূলক নয়, তবুও আমার সিনেমা 'অভিযাত্রিক' এবং 'দেবী চৌধুরাণী'র শুটিংয়ের সময় আমি কড়াভাবে এই সমস্ত নিরাপত্তা বিধি মেনে চলেছিলাম।"
