বক্তা সাতানব্বইটা প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেছেন। সওয়া পাঁচ হাজার রান রয়েছে। এক সময় বাংলা টিমের বিশ্বস্ত ওপেনার ছিলেন। ময়দান চেনে, ‘ডন’ নামে। সেই অরিন্দম দাস গত চার বছর ধরে অনূর্ধ্ব-১৬ বাংলার কোচিং করার পর এবার সিএবিতে ইন্টারভিউয়ের ডাক পর্যন্ত পাননি! যার পর মুখ খুললেন তিনি। সৌরাশিস লাহিড়ীর পর এবার অরিন্দম। ‘সংবাদ প্রতিদিন’-কে দেওয়া বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারে।
প্রশ্ন: মিডিয়ায় সৌরাশিস লাহিড়ীর বিস্ফোরণ দেখেছেন?
অরিন্দম: দেখেছি।
প্রশ্ন: কী বলবেন?
অরিন্দম: সৌরাশিসকে ফুল সাপোর্ট করছি। দেখুন, আন্ডার নাইন্টিন টিম সিলেকশনে কী হয়েছে, বলতে পারব না। কিন্তু প্রায় দশ বছর ধরে কোচিং করাচ্ছে সৌরাশিস। বোর্ডের সেন্টার অফ এক্সেলেন্সের হাই পারফরম্যান্স ক্যাম্পে কোচিং করাতে যাচ্ছে। তার পর সিএবি ওকে কোচ রাখল না। এ তো ইচ্ছে করে চেপে দেওয়া হল সৌরাশিসকে!
প্রশ্ন: ইচ্ছে করে?
অরিন্দম: নয়তো কী? এখানে কেউ ভালো করলে, তাকেই চেপে দেওয়া হচ্ছে। আমি নিজে বহুবার সিএবিকে বলেছি যে, সেভেন্টি পার্সেন্ট নিয়ে লেভেল টু কোচিং পাশ করেছি। জাতীয় ক্রিকেট অ্যাকাডেমি অন্তর্ভুক্ত কোথাও কি আমার নামটা ‘প্লেস’ করা যায় না? কত তো ক্যাম্প হয়। সিএবি কিছুই করেনি।
প্রশ্ন: সৌরাশিস অনূর্ধ্ব-১৯ বাংলার কোচিংয়ের দায়িত্ব হারালেন। আপনিও আর অনূর্ধ্ব-১৬ বাংলার কোচ আর থাকলেন না।
অরিন্দম: আরে, আমাকে ইন্টারভিউয়ে পর্যন্ত ডাকেনি!
প্রশ্ন: কী বলছেন!
অরিন্দম: না। ইন্টারভিউয়ে ডাকা হয়নি, আমি যে অনূর্ধ্ব-১৬ কোচ আর থাকছি না, সেটা ডেকে বলাও হয়নি। আমি তৈরি ছিলাম ইন্টারভিউয়ে গিয়ে নিজের বক্তব্য বলার জন্য। কিন্তু সুযোগটাই তো পেলাম না। পুরো ইন্টারভিউ প্রসেসটাই যদিও আইওয়াশ ছিল যদিও!
প্রশ্ন: আইওয়াশ?
অরিন্দম: আমার তাই মনে হয়। কোনও ক্রিকেট সংস্থার কোচ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিতে দেখেছেন, ‘প্রেফারেবলি’ শব্দটা লেখা থাকে? সিএবি কোচের যে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল, তাতে লেখা কোচের পদে আবেদনকারীর বয়স ‘প্রেফারেবলি’ ষাট হতে হবে। আবেদনকারীর লেভেল টু পাশ করা ‘ডিজায়েরেবল’। কোথাও দেখেছেন এ জিনিস? বোর্ডে হয়? মনে তো হবেই যে, সবই আগে থেকে ঠিক করে রাখা হয়েছে। কিছু লোককে যাতে চাকরি করে দেওয়া যায়, সেই মতো তুমি ক্রাইটেরিয়া সেট করছ! স্রেফ অসহ্য!
প্রশ্ন: খুব রেগে রয়েছেন আপনি।
অরিন্দম: খারাপ লাগবে না? ক্রিকেটার হিসেবে, কোচ হিসেবে, বাংলার জন্য প্রাণপাত করেছি আমি। শুনুন, কোচিংয়ের দ্বিতীয় বছরে মাঠে মাঠে ঘুরে খেলা দেখতাম। কারণ, প্রথম বছর প্রসেসের মাঝপথে ঢুকেছিলাম। প্রথমবার আমার একটা ধারণা তৈরি হয়ে যায় মোটামুটি যে, বিজয় মার্চেন্ট ট্রফিটা কীভাবে খেলতে হয়? দ্বিতীয় বছর, পুরো মাঠে-মাঠে ঘুরলাম। জেলায়-জেলায় গেলাম। কলকাতায় সেকেন্ড ডিভিশনের ম্যাচ দেখলাম। মনে হত, সমস্ত ঘুরে না দেখলে কোনও প্রতিভা মিস হয়ে যাবে না তো? মাঠে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে খেলা দেখতাম। যাতে আমার উপস্থিতিতে প্লেয়ারের খেলা না বদলে যায়।
প্রশ্ন: তাই?
অরিন্দম: হ্যাঁ। সেই বছর আমি বেস্ট প্লেয়ার পুল-টা পাই। অঙ্কিত চট্টোপাধ্যায়। আশুতোষ কুমার। শিবম ভারতী। শচীন যাদব। যাদের অনেকে পরে অনূর্ধ্ব-১৯ খেলে। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, ভালো খেলেও আমরা অল্পের জন্য কোয়ার্টার ফাইনালে হেরে যাই। কিন্তু টিমের খেলা প্রবল প্রশংসিত হয়েছিল। মজা কী জানেন? এত কিছুর পর আমাকে কথা শুনতে হয়েছিল!
প্রশ্ন: মানে?
অরিন্দম: ইয়েস। সিএবি-র এক কর্তা বলেছিলেন, মাঠে ঘোরা কি কোচের কাজ? সেটা তো নির্বাচকদের কাজ। অথচ মাঠে-মাঠে ঘুরছি বলে বাড়তি একটা পয়সা নিইনি কারও থেকে। গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, আমার কোচিংয়ে জেলার অনেক গরিব ছেলে খেলে গিয়েছে। যেমন শিলিগুড়ির আকাশ তরফদার। যার বাবা ভ্যান চালান। কে জানে, হয়তো কলকাতার বড়লোক ক্যাম্পের ছেলেরা তেমন সুযোগ পায়নি বলে ওদের হয়তো আমার উপর রাগ! আমাকে তো এক প্রভাবশালী কর্তা এও শুনিয়ে বলেছিলেন, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের লাস্ট বয় গরিব স্কুলের ফার্স্ট বয়ের চেয়ে বেটার হয়!
প্রশ্ন: ভাবাই যাচ্ছে না, যা বলছেন। তখন কিছু বলেননি?
অরিন্দম: কী করে বলব? সিএবি-তে চাকরি করি তখন। মাথা নিচু করে সরে এসেছি।
প্রশ্ন: কিন্তু এটাও তো ঠিক, অনূর্ধ্ব-১৬ থেকে ট্রফি আসেনি।
অরিন্দম: কবে বিজয় মার্চেন্ট ট্রফি জিতেছে বাংলা? কখনও না। এত দিন ধরে, এত সমস্ত কোচ এসেছেন। কেউ পারেননি। তা হলে সবার কোচিং ভুল? নাকি সিস্টেম কোথাও রেস্ট্রিক্ট করছে কোচকে কোচিং করা থেকে? আমি তো গত বার ট্রায়াল করতে চেয়েও ব্যর্থ হয়েছি।
প্রশ্ন: কেন?
অরিন্দম: দেয়নি ওরা। ষাট-সত্তরটা ছেলের বেশি পাইনি। আমি ম্যাক্সিমাম ট্রায়াল নিয়েছি মেরেকেটে একশোটা বাচ্চার। অথচ আমরা যখন অনূর্ধ্ব-১৬ খেলেছি, তিন বার ট্রায়াল হত। আর এখন কী হয়? ঠান্ডা ঘরে বসে নানাদিক থেকে কিছু নাম জোগাড় করে টিম করে ফেলা হয়! নাম করে বলতে পারি। জুনিয়র নির্বাচকদের মধ্যে একমাত্র প্রবীর আচার্য ছাড়া বিজয় মার্চেন্ট ট্রফির কেউ খেলাই দেখেন না! কত শুনি ট্যালেন্ট রিসার্চ, অমুক-তমুক। যাদের পয়সা-টয়সা দিয়ে জামাইআদর করে রেখেছে সিএবি। কেউ একদিনও গিয়ে খেলা দেখে? নট আ সিঙ্গল ম্যাচ!
আমি পার্টিকুলার কারও উপর দোষ চাপাতে চাইছি না। কিন্তু দিন শেষে তো আমার উপর জবাবদিহির দায় চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তা হলে কেন আমাকে দু’শোটা ছেলে দেখার সুযোগ করে দেওয়া হবে না? আমার তো মনে হয় না, সিএবি-র নাম ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল আর আছে বলে। পুরোপুরি ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ কলকাতা হয়ে গিয়েছে! কোথায় মালদা, জলপাইগুড়ি, দিনাজপুর, মুর্শিদাবাদের ছেলে?
ভাবতে পারেন, আমাদের কোনও রিভিউ মিটিং হয়নি। ডাকেইনি সিএবি! জানেন, গত বছর অনূর্ধ্ব-১৬ বাংলা টিম তৈরি করার আগে ভিশনের অনূর্ধ্ব-১৬ টিম হয়ে গেল! কোনও প্রপার ট্রায়াল ছাড়াই! আমরা তখন বিপিএলে কোচিং করছি। ভিশনে পঁচিশটা ছেলেকে ঢুকিয়ে দিতে পারলে তাদের তো তুমি আর বাদ দিতে পারবে না। কারণ, কাগজে-কলমে তারাই সেরা। কোথায় কে পঞ্চাশ করেছে, কে একশো করছে, কে তিরিশ করেছে– তাই দেখে ভিশনের টিম হয়ে গেল! কতটা ট্যাক্টফুলি সমস্ত হয়েছে, একবার ভাবুন।
প্রশ্ন: অনূর্ধ্ব ১৬ টিমকে হেরে যাওয়ার পর তো আবার বাসে করে টিমকে ফেরানো হল।
অরিন্দম: কী বলব আর? সিএবি অফিস থেকে আমাদের ইনস্ট্রাকশন দেওয়া হয়েছিল, বাসে করে ফিরতে হবে! কেন, কেউ বলেনি। সেই বাস আবার মাঝরাস্তায় খারাপ হয়ে গেল। হাস্যকর!
প্রশ্ন: সৌরাশিস অভিযোগ করেছেন, তাঁর কাছে নির্দিষ্ট প্লেয়ার খেলানোর অনুরোধ গিয়েছিল। আপনার সঙ্গে সে সব কিছু হয়েছে?
অরিন্দম: সরাসরি বলত না। তবে দেখতাম, কয়েকজন প্লেয়ারকে নিয়ে অনেকে আগ্রহী। বারবার জানতে চাইত, তারা কেমন করছে! কিন্তু জেলার প্লেয়ারের ক্ষেত্রে সেটা হত না। কেউ জিজ্ঞাসাই করত না!
প্রশ্ন: ইন্টারভিউটা শেষ করি। সৌরাশিস মনে করেন, তিনি কম্প্রোমাইজ করেননি বলে আর বাংলা কোচ থাকতে পারলেন না। অরিন্দম দাসের কী মনে হয়? তিনি কেন ইন্টারভিউয়ে পর্যন্ত ডাক পেলেন না?
অরিন্দম: আমার তো মনে হয়, পারমুটেশন-কম্বিনেশনে ফিট করিনি বলে ডাকা হল না। ডাকবে কেন? অরিন্দম দাসের তো ভোট নেই! অরিন্দম দাসকে বাদ দিলে সিএবি-র কিছু যাবে-আসবে না। গদিতে চাপ পড়বে না। অরিন্দম নরম ডাল, কেটে দাও! আমাদের ভোট নেই তো, তাই পারফরম্যান্স দেখা হয়। ভোট থাকলে, দেখা হয় না। মনে রাখবেন, অনূর্ধ্ব-১৬-র মতো বাংলার অনূর্ধ্ব-২৩ টিমও কিন্তু নকআউটে কোয়ালিফাই করেনি। সিএবি কিন্তু তার কোচকে ঠিকই বহাল রেখেছে!
