প্রসঙ্গ ছিল বাংলার কোচিং গ্রুপ থেকে 'ব্রাত্য' হওয়া সৌরাশিস লাহিড়ীর বিস্ফোরক সব অভিযোগের জবাব দেওয়া। সেই মতো সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছিল সিএবি-র জুনিয়র নির্বাচক কমিটি। ছিলেন কমিটির প্রধান সুমিত্র মজুমদার এবং তিন সদস্য সত্যেন ভট্টাচার্য, শঙ্কর ভট্টাচার্য ও প্রবীর আচার্য। কিন্তু তাঁরা যা বললেন, তাতে উল্টে আরও বেকায়দায় পড়ল সিএবি। প্রকাশ্যে চলে এল বঙ্গ ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থার বিভিন্ন অনিয়ম। কোচ নিয়োগ থেকে দল নির্বাচন-একটার পর একটা বিষয়ে সিএবি-কে 'আত্মঘাতী' গোল খাওয়াল জুনিয়র নির্বাচক কমিটি। নিচে উল্লেখ করা হল তারমধ্যে প্রধান তিনটে ইস্যু।
১) কোচ নিয়োগে নির্বাচকদের মত
ভারতীয় ক্রিকেট বর্তমানে পরিচালিত হয় মূলত লোধা কমিটির করা বিভিন্ন নির্দেশিকার ভিত্তিতে। বিসিসিআই তো বটেই, বিভিন্ন রাজ্য সংস্থার কাজকর্মও নিয়ন্ত্রিত হয় সেসব নির্দেশিকা অনুযায়ী। যার মধ্যে রয়েছে সিএবিও। নির্দেশিকায় বলা রয়েছে, কোনও দলের কোচ নির্বাচনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হল সেই দলের নির্বাচক কমিটির মতামত। অর্থাৎ, কোচ নিয়োগের পদ্ধতিতে জড়িত থাকবেন নির্বাচকরাও। সিএবি-র জুনিয়র নির্বাচক কমিটি মূলত দু'টি দলের দায়িত্বে। অনুর্ধ্ব ১৬ এবং অনুর্ধ্ব ১৯। সম্প্রতি দুই দলের জন্যই নতুন হেড কোচ নিয়োগ করেছে সিএবি। অনূর্ধ্ব ১৬-তে অনুষ্টুপ মজুমদার এবং অনূর্ধ্ব ১৯-এ মনোজ তিওয়ারি। কোচ নির্বাচনের কাজটা করেছে সিএবি নিযুক্ত তিন সদস্যের কমিটি। যাতে ছিলেন অরুণ লাল, দেবাং গান্ধী এবং কল্যাণ চৌধুরি। তবে সেই কমিটি কথাই বলেনি সিএবি-র জুনিয়র নির্বাচকদের সঙ্গে। শুক্রবার ইডেনে বসে জুনিয়র নির্বাচক কমিটির চেয়ারম্যান সুমিত্র মজুমদার স্বীকার করে নিয়েছেন সেকথা। তিনি সরাসরি বলেছেন, "কোচ নিয়োগ নিয়ে কেউ আমাদের সঙ্গে কথা বলেনি।" অন্যদিকে, সিএবি-র কমিটিতে থাকা দেবাং গান্ধীও বলছেন, "আমরা কেউই জুনিয়র নির্বচক কমিটির সঙ্গে কথা বলিনি।" অর্থাৎ, ফের একবার লোধা-সুপারিশের পাশাপাশি এবার সুপ্রিম কোর্ট-সম্মত নিজেদের সংবিধানকেই 'বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ' দেখাল বঙ্গ ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থা। যার ফলে মনোজ-অনুষ্টুপদের নিয়োগের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।
২) অ্যাপেক্সের কাছে ইভ্যালুয়েশন রিপোর্ট পেশ
শুধু কোচ নিয়োগের ক্ষেত্রে সিএবি নিজের সংবিধান লঙ্ঘন করেছে, এমনটা নয়। আরও আছে। যেমন অ্যাপেক্স কাউন্সিলের কাছে ইভ্যালুয়েশন রিপোর্ট পেশ। সিএবি-র সংবিধান অনুযায়ী, প্রত্যেক তিনমাস অন্তর যে রিপোর্ট জমা পড়ার কথা। যেখানে অ্যাপেক্স কাউন্সিলের সঙ্গে বিভিন্ন দলের পারফরম্যান্স নিয়ে আলোচনায় বসবেন নির্বাচকরা। অথচ এমন কোনও বৈঠক হয় না সিএবি-তে। অন্তত সদ্য শেষ হওয়া ঘরোয়া ক্রিকেটের মরশুমে হয়নি। যে কথা স্বীকার করে নিয়েছেন জুনিয়র নির্বাচকরা। সুমিত্রদের সম্মিলিত বক্তব্য, "আমরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেছি। তবে সিএবি-র সঙ্গে নিয়মিতভাবে কোনও বৈঠক হয়নি। সিএবি থেকে কিছু জানতে চাওয়া হলে আমরা তার জবাব দিয়েছি।"
৩) ম্যাচ স্কোয়াডে বাড়তি প্লেয়ার
ভারতীয় বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী, ঘরোয়া ক্রিকেটে প্রতি ম্যাচের জন্য স্কোয়াডে রাখতে হয় ১৬ জন ক্রিকেটারকে। ম্যাচ প্রতি বিসিসিআই যে অর্থ বরাদ্দ করে রাজ্যগুলিকে, তা করা হয় ১৬ জন ক্রিকেটারের জন্যই। কিন্তু দেখা গিয়েছে, গত বছর নিয়মিতভাবে অতিরিক্ত ক্রিকেটার ছিল বাংলার অনুর্ধ্ব ১৯ দলের স্কোয়াডে। অধিকাংশ ম্যাচেই সেই সংখ্যাটা ১৮। কোনও ম্যাচে ১৭। যার কারণ হিসেবে প্রাথমিকভাবে নির্বাচকদের তরফে বলা হয়, তৎকালীন কোচ সৌরাশিস লাহিড়ীর কথামতো দল গড়া হয়েছে। যদিও পরবর্তীতে অবস্থান পরিবর্তন করেন তাঁরা। এবার বলা হয়, অনেক সময় বাড়তি নেট বোলার নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন কোচ। কিন্তু নেট বোলার হিসেবে গেলে সংশ্লিষ্ট ক্রিকেটারের নামের পাশে সেকথা লেখা নেই কেন? ১৬ জনের পরিবর্তে ১৮ জনের স্কোয়াড নিয়ে যাওয়ার ভাবনা কার মস্তিষ্কপ্রসূত? প্রশ্ন শুনে 'নির্বাক' নির্বাচকরা। বরং তাঁদের তরফে বার বার বলা হল, বৈঠকে থাকলেও আপত্তি জানাননি কোচ। যা শুনে সৌরাশিসের পাল্টা প্রশ্ন, "স্কোয়াডে কত জন থাকবে তা কি কোচ ঠিক করেন?"
এদিন সিএবি-র তরফে সৌরাশিসকে 'স্বৈরাচারী' প্রমাণ করতে নিয়ে আসা হয় অঞ্জুর চট্টোপাধ্যায় নামে এক স্ট্রেংথ অ্যান্ড কন্ডিশনিং কোচকে। যাঁর বক্তব্য, সৌরশিসের 'দুর্ব্যবহারে'র জেরে গত মরশুমের শুরুতে অনুর্ধ্ব ১৯ দল থেকে সরে যেতে হয়েছে তাঁকে। অবশ্য বাংলর অনূর্ধ্ব ১৬ দলে কর্মরত অন্তর অনূর্ধ্ব ১৯ দলে আসেন সৌরাশিস কোচ হওয়ার পরই। দু'টো প্রতিযোগিতা খেলে শহরে ফিরে দেওয়া 'পদত্যাগ পত্রে' কোচের দুর্ব্যহার নিয়ে একটা শব্দও লেখেননি তিনি। সর্বোপরি, তারপরও নিয়মিতভাবে সৌরাশিসের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে গিয়েছেন অন্তর। হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজে, ভয়েস কলে (প্রমাণ রয়েছে 'সংবাদ প্রতিদিন'-এর হাতে)। এটাও এক 'আত্মঘাতী' গোল নয় কি?
