চব্বিশ ঘণ্টা আগে ‘সংবাদ প্রতিদিন’ সাক্ষাৎকারে সিএবি কোষাধ্যক্ষ সঞ্জয় দাস বলেছিলেন যে, ‘কুলিং অফ’ শুরু হয়ে যাওয়ার পরেও দশ-এগারো মাস পদে থেকে গিয়েছিলেন সংস্থার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট অভিষেক ডালমিয়া। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে তার পাল্টা দিলেন অভিষেক। প্রাক্তন সিএবি প্রেসিডেন্ট বলে দিলেন যে, সিএবি পদাধিকারীরা পদে থেকেও সংস্থার গঠনতন্ত্র জানেন না, তা অতীব দুর্ভাগ্যজনক!
শুক্রবার ‘সংবাদ প্রতিদিন’কে অভিযোগের জবাবে অভিষেক বলেন, ‘‘আইপিএল গভর্নিং কাউন্সিল সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে আমি সিএবি প্রেসিডেন্টের পদ ছেড়ে দিয়েছিলাম। কারণ, সিএবি-র গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, দু’টো পদে একই সময়ে থাকা যায় না। এবং আমিও ঠিক সেই কারণেই ছেড়েছিলাম। আমার এখনও মনে আছে, সেই সময় তৎকালীন সিএবি ভাইস প্রেসিডেন্ট নরেশ ওঝা বার্ষিক সভা চেয়ার করেছিলেন। বৈঠক শেষে যখন সাংবাদিক সম্মেলন করা হয়, মিডিয়া চেয়েছিল আমি সেখানে বসি। সাংবাদিক সম্মেলনে যোগ দিই। কিন্তু আমি বসিওনি। কথাও বলিনি। ইন ফ্যাক্ট সে দিন থেকে আজ পর্যন্ত সিএবি নিয়ে একটা কথাও বলিনি। কী ভাবে সিএবি চলছে, বঙ্গ ক্রিকেট সংস্থার জ্বলন্ত ইস্যুও বা কী কী, সে সব নিয়েও আমি মুখ খুলিনি। কিন্তু আজ যখন জোর করে আমার প্রসঙ্গ টেনে আনা হল, তাই বাধ্য হচ্ছি মুখ খুলতে।’’
এক্ষেত্রে লিখে রাখা যাক, লোধা নির্দেশিকা ‘অমান্য’ করে কেন বর্তমান সিএবি যুগ্ম-সচিব মদন ঘোষ নিজের পদে বসে রয়েছেন, সেই প্রশ্নের উত্তরে অভিষেকের প্রসঙ্গ টেনে এনেছিলেন সিএবি কোষাধ্যক্ষ সঞ্জয়। ‘সংবাদ প্রতিদিন’-কে সাক্ষাৎকারে সঞ্জয় বলে দেন যে, সত্তর বছর হয়ে যাওয়ার পর মদন চেয়ারে বসে রয়েছেন, ন’দশ দিন হল। কোনও কোনও পূর্বতন সিএবি প্রেসিডেন্ট অতীতে প্রয়োজনে বাড়তি দশ-এগারো মাস কাটিয়ে গিয়েছেন। কুলিং অফ শুরু হয়ে যাওয়ার পরেও। এরপরই তিনি অভিষেক ডালমিয়ার নাম করেন। সঞ্জয়ের বক্তব্য ছিল, ‘‘দোষারোপ করছি না। কারণ, যাঁরা পদে থাকেন, অনেক ভেবেচিন্তে তাঁদের সিদ্ধান্ত নিতে হয়। অভিষেক ডালমিয়া কিন্তু সিএবি প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন বাড়তি দশ-এগারো মাস ছিলেন পদে। আবারও বলছি, অবশ্যই উনি জবরদখল করে বসে ছিলেন না। কিন্তু নিশ্চয়ই কোনও প্রত্যাশা বা নিয়মের কারণে তিনি অপেক্ষা করছিলেন।’’
যে ‘অভিযোগ’ পত্রপাঠ খারিজ করে দিচ্ছেন অভিষেক। প্রাক্তন সিএবি প্রেসিডেন্টের চাঁচাছোলা বক্তব্য হল, লোধা আইনে বর্ণিত ‘ডিসকোয়ালিফিকেশন’ আর ‘কুলিং অফ’– এই দুইয়ের তফাত বর্তমান সিএবি কর্তাদের বোধগম্য হয়নি। সংস্থার গঠনতন্ত্র সম্পর্কে সম্যক ধারণা না রেখেই কথা বলা হচ্ছে। ‘‘সিএবি গঠনতন্ত্র সুপ্রিম কোর্ট অনুমোদিত। যা মানতে প্রত্যেকে বাধ্য। আমি কী চাইলাম আর না চাইলাম, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমি দেশের আইন মেনে চলা একজন নাগরিক। কোনও দিন সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ বা রায়কে অসম্মান করিনি। কখনও করার কথা ভাবতেও পারি না। আমার যখন তিন বছরের কুলিং অফ পর্ব শুরু হয়, তখন কোনও কমিটির সদস্য থাকিনি। এটাও মনে করিয়ে দিই, সিএবির তরফে সেই সময় আমাকে ওয়ার্ল্ড কাপ (২০২৩ বিশ্বকাপ) কমিটিতে থাকার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমি স্পষ্ট জানিয়ে দিই যে, আমার পক্ষে কমিটিতে থাকা সম্ভব নয়। কারণ সিএবি গঠনতন্ত্রকে মর্যাদা দিতে হবে। এবং সুপ্রিম কোর্টের রায়কেও মর্যাদা দিতে হবে আমাকে,’’ বলতে থাকেন অভিষেক। সঙ্গে যোগ করেন, ‘‘আমার মনে হয়, মিডিয়ায় কিছু বলার আগে, সব সময় হোমওয়ার্ক করে নেওয়া উচিত। বিশেষ করে সংস্থার প্রাক্তন প্রেসিডেন্টের নাম করে যদি কেউ মন্তব্য করেন। আমি নিশ্চিত, যদি উনি ভালো করে সব খতিয়ে দেখেন, তা হলে বুঝবেন যে, ডিসকোয়ালিফিকেশন আর কুলিং অফ, সম্পূর্ণ দু’টো আলাদা বিষয়। আর সেটাকে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। সিএবি গঠনতন্ত্র পড়ে ওঁর বুঝতে অসুবিধে হতেই পারে। কারণ, উনি তো আর লিগ্যাল ব্যাকগ্রাউন্ডের নন। তা, উনি সাহায্য নিতে পারেন তো সিএবির লিগ্যাল কাউন্সেল সম্রাটবাবুর (সম্রাট সেন) কাছ থেকে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সম্রাটবাবু ওঁকে সিএবি-র গঠনতন্ত্র সংক্রান্ত বিষয়ে ভালো করে গাইড করে দেবেন।’’
আমার মনে হয়, মিডিয়ায় কিছু বলার আগে, সব সময় হোমওয়ার্ক করে নেওয়া উচিত। বিশেষ করে সংস্থার প্রাক্তন প্রেসিডেন্টের নাম করে যদি কেউ মন্তব্য করেন। সিএবি গঠনতন্ত্র পড়ে ওঁর বুঝতে অসুবিধে হতেই পারে। কারণ, উনি তো আর লিগ্যাল ব্যাকগ্রাউন্ডের নন।
ওয়াকিবহাল মহলের মতে, বোর্ড এবং তার অনুমোদিত সংস্থা সিএবির যে লোধা নির্দেশিত গঠনতন্ত্র রয়েছে, তাতে পদাধিকারীদের ক্ষেত্রে দু’রকম ‘ইনএলিজিবিলিটি’-র কথা বলা রয়েছে। প্রথম ক্ষেত্রে একগুচ্ছ নির্দেশিকা দেওয়া রয়েছে। যেমন ভারতীয় না হলে ক্রিকেট সংস্থার পদাধিকারী হওয়া যাবে না, যেমন সত্তর বছর হয়ে গেলে পদাধিকারী হওয়া যাবে না–প্রভৃতি। দ্বিতীয় ‘ইনএলিজিবিলিটি’-র যে শর্ত রয়েছে তাতে লেখা, কোনও পদাধিকারী যদি পরপর দু’টো টার্ম সম্পন্ন করে ফেলেন, তা হলে তিন বছরের ‘কুলিং অফ’ শেষ না করা পর্যন্ত তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। বলা হচ্ছে, অভিষেক নির্বাচনটা লড়লেন কোথায়? আর তিনি নির্বাচন না লড়লে, কত দিন বাড়তি থাকলেন, তা নিয়েও বা সমস্যা কোথায়? যুগ্ম-সচিব মদন ঘোষের বিষয়টা ‘ডিসকোয়ালিফেকশন’। মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও তাঁর পদে থেকে যাওয়া। সেটা আর অভিষেকের বিষয়টা– কখনওই এক নয়। ‘‘২০২০ সালের ২ অগাস্টে সম্রাটবাবুর একটা মতামত দেওয়া রয়েছে ভারতীয় বোর্ডকে। তার মধ্যে এই তুলনার ব্যাপারে বিশদে বলা রয়েছে। কোনটা সম্ভব, আর কোনটা সম্ভব নয়, তা বিস্তারিত ভাবে বলে দেওয়া রয়েছে। উনি (নাম না করলেও নিশানা সঞ্জয়) যদি পুরোটা পড়েন, তা হলে বুঝবেন যে আমি কোনও ভাবেই নিয়ম ভাঙিনি। সিএবির রেকর্ড ঘাঁটলেই উনি দেখতে পাবেন যে, আমার কুলিং অফ যে দিন থেকে শুরু হয়েছে, সে দিন থেকে সংস্থার কোনও কমিটিতে থাকিনি। কোনও পদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করিনি। তাই গঠনতন্ত্র ভাঙার কোনও প্রশ্নই নেই,’’ তীক্ষ্ণ যুক্তি দেন অভিষেক।
সিএবি এবার কী জবাব দেয়, দেখার।
