আইপিএল শেষ হয়ে গিয়েছে, প্রায় দু’মাস হতে চলল। ইডেন গার্ডেন্স যে শ্রেষ্ঠ মাঠের পুরস্কার হিসেবে পঞ্চাশ লক্ষ টাকা পেয়েছিল, সেটাও সর্বজনবিদিত। কিন্তু সেই অর্থের ‘ভাগ-বাঁটোয়ারা’ নিয়ে যে বঙ্গ ক্রিকেট সংস্থায় এমন ধুন্ধুমার বেঁধে যাবে, কে জানত! এক পক্ষ সেই পুরস্কার অর্থের ভাগ পেয়েছেন। সিএবির অফিস কর্মীরা। কিন্তু দ্বিতীয় পক্ষ, অর্থাৎ মাঠকর্মীরা কোনও অর্থ এখনও পাননি! যাঁরা কি না ইডেনে দিন-রাত পড়ে থেকে, ঝড়-জল-রোদ উপেক্ষা করে মাঠ তৈরি করেছিলেন আইপিএলের জন্য! কিন্তু কেন এ হেন ‘বৈষম্য’? কেন মাঠকর্মীরা এখনও আইপিএলের পুরস্কার অর্থ থেকে প্রাপ্য অংশ পেলেন না?
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ইডেনের মাঠকর্মীদের এখনও পর্যন্ত পুরস্কার-অর্থ না পাওয়ার নেপথ্যে কর্তা-কিউরেটর ‘মতবিরোধ’। ইডেন কিউরেটর সুজন মুখোপাধ্যায়ের মত হল, আইপিএলের সময় সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করেছে ইডেনের গ্রাউন্ডসম্যানরা। সকাল সাতটা থেকে রাত্তির দু’টো পর্যন্ত কখনও কখনও ইডেনে পড়ে থেকে তাঁরা মাঠ তৈরি করেছেন। তাই বোর্ড প্রদত্ত পুরস্কার-অর্থের সিংহভাগ ইডেনের মাঠকর্মীদের পাওয়া উচিত। অন্যান্য মাঠের গ্রাউন্ডসম্যানরাও অবশ্যই অর্থ পাবেন। কিন্তু সেটা ইডেনের মাঠকর্মীদের মতো সমান কখনও হতে পারে না। বলা হচ্ছে, ইডেন অতীতেও দু’বার শ্রেষ্ঠ মাঠের পুরস্কার পেয়েছে। সেই সময় ইডেনের গ্রাউন্ডসম্যানরাই পুরস্কার অর্থের সিংহভাগ পেয়ে এসেছেন। বাকিদের ‘টোকেন’ একটা অর্থ দেওয়া হয়েছে। এবার তা হলে কেন অন্যথা হবে?
সিএবি-র ওয়াকিবহাল মহলের অভিমত আবার ভিন্ন। বলা হচ্ছে, পুরস্কার অর্থ বন্টনে কোন যুক্তিতে ‘বৈষম্য’ থাকবে? যা হবে, সব সমান। পুরস্কার পঞ্চাশ লক্ষ টাকাকে ৬০-৪০ ‘রেশিও’-য় বিভক্ত করেছে সিএবি। অর্থাৎ, ষাট শতাংশ পাবেন মাঠকর্মীরা। চল্লিশ শতাংশ সিএবি স্টাফরা। দ্বিতীয় অংশ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। সবাই সমান অঙ্ক পেয়েছেন। পুরস্কার অর্থ বন্টনে কোনও বৈষম্য রাখা হয়নি। বলা হচ্ছে, মাঠকর্মীদের মধ্যে পুরস্কার অর্থ বন্টনে তাহলে কেন বৈষম্য রাখা হবে? ইডেনে আইপিএলের সময় অন্যান্য মাঠে তো স্থানীয় ক্রিকেটের খেলা চলেছে। তা হলে সে সমস্ত মাঠের কর্মীরা কি বাড়তি চাপ নেয়নি? সেক্ষেত্রে তাঁরা কেন সমান পুরস্কার অর্থ পাবেন না?
খুব সহজে–ঘোর মতবিরোধ! যা নিয়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভের স্ফুলিঙ্গও ছিটকে বেরোচ্ছে। সিএবি-র কেউ কেউ যেমন দাবি করলেন, ইডেন কিউরেটর সুজন মুখোপাধ্যায় পুরস্কার অর্থের মধ্যে থেকে নিজেই পাঁচ লক্ষ টাকা দাবি করেছেন! যে বক্তব্য আবার শোনামাত্র সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিলেন সুজন। সন্ধেয় ফোনে বললেন, ‘‘যিনি এটা বলেছেন, ভুল বলেছেন। আমি এ রকম কোনও অর্থ চাইনি।’’ ইডেন কিউরেটর এর চেয়ে বেশি কথা বাড়াতে চাইলেন না। ফোন রেখে দিলেন। কিন্তু সুজন-ঘনিষ্ঠ কেউ কেউ রাতের দিকে বললেন যে, সংশ্লিষ্ট এক সিএবি কর্তা নাকি নিজেই সুজনকে বলেন, তাঁর নিজের অংশে পাঁচ লক্ষ রেখে বাদবাকি মাঠকর্মীদের কাকে কত টাকা দেওয়া উচিত, তার একটা তালিকা দিতে! বলা হল, সুজন এমন মানুষই নন যে নিজের জন্য মোটা অঙ্ক আগে বাগিয়ে নেবেন। বরং তিনি মাঠকর্মীদের জন্য নিজের ‘শেয়ার’ ছেড়ে দিতেও দু’বার ভাবেন না।
অর্থাৎ, সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি। শোনা যাচ্ছে, এক-দু’দিনের মধ্যে পুরস্কার অর্থ ঘিরে এই ‘বিবাদ’ মেটাতে বৈঠকে বসছেন সিএবি প্রেসিডেন্ট সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। রফাসূত্র বার করতে। দুঃখ একটাই। রাজা-উজিরদের ‘দ্বৈরথে’ প্রাণ ওষ্ঠাগত ‘পেয়াদা’-দের। পুরস্কার অর্থ থেকে কিছু টাকা পেলে, যাঁদের দু’টো ভালো-মন্দ খাওয়া হয়। যাঁদের পরিবারে তখন হাসি ফোটে সাময়িক। সন্তানকে একটা-দু’টো পোশাক-আশাক কিনে দেওয়া যায়। অতি সাধারণ, ‘দিন আনি, দিন খাই’ গোত্রীয় নিতান্ত গোবেচারা মালিরা!
