রবিবাসরীয় আহমেদাবাদ। বিশ্বকাপ ফাইনালে ঝোড়ো হাফসেঞ্চুরির পর ডাগআউটের দিকে একটা ফ্লাইং কিস ছুঁড়লেন অভিষেক শর্মা। প্রথমে মনে হয়েছিল হয়তো পরিবারের কারও উদ্দেশ্য চুমুটা ছিল। কিন্তু সেটা আদতে ছিল অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদবের জন্য। বিশ্বকাপের শুরু থেকে ব্যর্থতা। টানা রান না পাওয়া। বিশ্বের এক নম্বর টি-টোয়েন্টি ব্যাটারকে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় গণ সমালোচনা শুরু হয়ে যাওয়া। অভিষেক নিজেও বেশ চাপে ছিলেন। কিন্তু আহমেদাবাদ ফাইনালের পর সব কিছুর মুক্তি। নিজে রান করেছেন। টিম ফাইনালে জিতেছে। ম্যাচের আবেগে প্রায় কেঁদে ফেলেন তিনি।
ফাইনালের আগে পুরো পরিবার আহমেদাবাদ উড়ে আসেছিল। বাবা রাজকুমার শর্মা আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন, যাতে অভিষেককে ফাইনালের আগে চাপমুক্ত রাখা যায়। মাঠে গিয়ে অভিষেকের সঙ্গে দেখা করেন। ছেলেকে বোঝান। তবে তাঁর বিশ্বাস ছিল, ছেলে ঠিক ফাইনালে রান করবে। ফাইনাল জেতার পর তাই অভিষেক নিজে বড্ড আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন। বাবাকে জড়িয়ে প্রায় কেঁদে ফেলেছিলেন। বলতে থাকেন, "টিমের জন্য ফাইনালে রান করতে পেরেছি। দল জিতেছে এর থেকে ভালো আর কিছু হতে পারে না। স্বপ্নপূরণের রাত এটা।" যে রাতের গোটাটাই উৎসব করে কাটিয়েছেন অভিষেক এবং তাঁর সতীর্থরা।
ছেলের মতো রাজকুমার শর্মা নিজেও প্রচণ্ড আবেগতাড়িত হয়ে যান। সোমবার বিকেলে যখন অভিষেকের বাবার সঙ্গে কথা হচ্ছিল, তখনও তাঁরা আহমেদাবাদে। মঙ্গলবার অমৃতসরে ফিরবেন। রাজকুমার বলছিলেন, "পুরো দেশের কাছে উৎসবের দিন। গর্বের দিন। ভারত বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। পরপর দু'বার এর আগে কেউ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জেতেনি। ঘরের মাঠে জেতেনি। এই টিম সেটাই করে দেখিয়েছে। অভিষেকও রান পেয়েছে। আমাদের পুরো বিশ্বাস ছিল, ও ফাইনালে ঠিক রান করবে। টিমের বিশ্বাস ছিল। গৌতম গম্ভীরের মতো একজন কোচ রয়েছেন। সূর্যকুমার যাদবের মতো অধিনায়ক রয়েছে। যাঁরা টিমে অভিষেকের অভিভাবকও। ওরা কখনও অভিষেকের উপর থেকে আস্থা হারায়নি। বরং সবসময় মোটিভেট করে গিয়েছে। ও কয়েকটা ম্যাচে রান পায়নি। অভিষেকের উপর চাপটা বুঝতে পারছিলাম। বিশ্বাস করুন ভারতীয় টিম কখনও সেই চাপটা ওকে বুঝতে দেয়নি। এটাই তো একটা ভালো টিমের সবচেয়ে বড় গুণ। যারা খারাপ সময়েও প্লেয়ারদের আগলে রাখে।"
অভিষেকের ক্রিকেটীয় উত্থানের পিছনে যুবরাজ সিংয়ের বড় ভূমিকা রয়েছে। খেলা না থাকলেই তাঁকে ডেকে নেন যুবরাজ। তারপর ট্রেনিং চলে। বিদেশে থাকলেও একই জিনিস হয়। অনেক সময় ইংল্যান্ডে গিয়েও যুবরাজের কাছে কোচিং নিয়ে এসেছেন তিনি। বিশ্বকাপের সময়ও অভিষেকের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল নিয়মিত প্রাক্তন ভারতীয় অলরাউন্ডারের। যখন রান আসছিল না, যুবরাজ ফোন করতেন তাঁকে। কী সমস্যা হচ্ছে, সেটা জানার চেষ্টা করতেন। আর উৎসাহ জুগিয়ে যেতেন। না হলে ফাইনালের মতো মহা চাপের ম্যাচে ওরকম ঝোড়ো ব্যাটিং করতে পারতেন কি অভিষেক?
ফাইনাল জিতে হোটেলে ফেরার পর আরও এক দফা উৎসব চলেছে। তা সোমবার সকাল পর্যন্ত চলে। ক্রিকেটাররা দেদার আড্ডা দিয়েছেন। টিম ডিনার রাখা হয়েছিল। অভিষেক প্রচণ্ড তৃপ্ত। বিশ্বকাপে ব্যর্থতার ব্যাগেজ নিয়ে আর বয়ে বেড়াতে হবে না। ফাইনালের অন্যতম নায়ক তিনি। ম্যাচের পর রাতেই মিক্সড জোনে এসেছিলেন ঈশান কিষানকে সঙ্গে নিয়ে। মিডিয়া দু'জনের জন্যই একটা প্রশ্ন করে। জিজ্ঞেস করা হয়, দু'জনেই খারাপ সময়ের মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন। এই প্রজন্ম সেই চাপটা কীভাবে সামলায়? প্রশ্নটা পুরো শেষ হল না। অভিষেক বলে উঠলেন, "আমার মনে হয় এই উত্তরটা আমি বেশি ভালো দিতে পারব।" পাশেই দাঁড়িয়ে ঈশান। অভিষেককে থামিয়ে, "আরে তোর তো এক মাস না হয় খারাপ গিয়েছে। আমি দু'বছর এই সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি।"
পাল্টা অভিষেকের, "আমার এই এক মাস দু'বছরের সমান।" সঙ্গে যোগ করলেন, "আমার মনে হয়, আপনার চারপাশে কারা রয়েছে, সেটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। আমার যখন খারাপ সময় যাচ্ছিল, রান করতে পারছিলাম না। টিমের জন্য কনট্রিবিউট করতে পারছিলাম, তখন টিমের সবাই আমার কথা ভেবেছে। প্রত্যেক মুহূর্ত উৎসাহ জুগিয়েছে। ওরা শুধু একটা কথাই বলত-ঠিক পারবি। চিন্তা করার কোনও দরকার নেই। কোচ, অধিনায়ক, ক্রিকেটার, টিমের সাপোর্ট স্টাফ কারও চোখে-মুখে কোনও চিন্তার ছাপ দেখিনি। সেটাই আমার বিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। সেটাই আমাকে আরও মোটিভেট করে।"
