ক্যাচ মিস তো ম্যাচ মিস। অথবা ক্যাচেস উইন ম্যাচেস। ক্রিকেটের দুই অতিপরিচিত প্রবাদ। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে দেখা গেল দুই ছবিই। একদিকে যখন সঞ্জু স্যামসনের লোপ্পা ক্যাচ মিসের হতাশা, অন্য শিবিরে তখন দু'টি দুর্ধর্ষ ক্যাচের সৌজন্যে ফাইনালে পৌঁছনোর আনন্দ। অক্ষরের একটি ক্যাচের সঙ্গে তো আবার কপিল দেব এবং সূর্যকুমার যাদবের ক্যাচের মিল পেয়েছেন নেটিজেনরা।
নিজের দ্বিতীয় ওভারেই সঞ্জুকে প্যাভিলিয়নে ফেরানোর দুর্দান্ত সুযোগ পেলেন আর্চার। কিন্তু মিড অনে ক্যাচ মিসে জীবন পেলেন ভারতীয় ওপেনার। পরের বলেই অবশ্য় ছক্কা হাঁকিয়ে দম বন্ধ পরিস্থিতি দূর করেন সঞ্জু। সেই তিনি করে গেলেন ৪২ বলে ৮৯ রান। হাঁকালেন মোট ৮টি চার ও ৭টি ছক্কা। অন্যদিকে, ইংল্যান্ড যখন বেধড়ক মারছে, সেই সময় বুমবুম বুমরাহর স্লোয়ারের সৌজন্যে প্রথম বলেই তুলে নিলেন অধিনায়ক হ্যারি ব্রুককে। পয়েন্ট থেকে ২০ গজ পিছনে দৌড়ে অনবদ্য ক্যাচ নিলেন অক্ষর প্যাটেল। তার পরেও অবশ্য চমক বাকি ছিল।
ম্যাচ যখন রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতিতে তখন সূর্যকুমারের ক্যাচ মিস ভারতকে ভোগালেও ফের দুর্দান্ত ক্যাচের দৌলতেই আবারও খেলায় ফিরল দল। অর্শদীপের ডেলিভারিতে বাউন্ডারি লাইনে ডাইভ দিয়ে ক্যাচ ধরে অক্ষর ছুড়ে দেন শিবম দুবেকে। আর তাতেই প্যাভিলিয়নের পথ দেখেন উইল জ্যাকস। এই ক্যাচও যেমন চর্চায়, তেমনই চর্চায় অক্ষরের প্রথম ক্যাচ। অনেকেই আবার ক্যাচটির সঙ্গে মিল পেয়েছেন কপিল ও সূর্যকুমারের।
’৮৩-র ২৫ জুন। দু’বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে ক্রিকেট বিশ্বকাপ জেতে কপিল দেবের ভারত। সেবারের ফাইনালে ক্যারিবিয়ান কিংবদন্তি ভিভ রিচার্ডসের অবিশ্বাস্য ক্যাচ নিয়েছিলেন কপিল দেব। মদনলালের বলটা তুলে মেরেছিলেন ভিভ। আকাশে উঠে যাওয়া বলটার দিকে তাকিয়ে দৌড় শুরু কপিলের। প্রায় ৩০ গজ দৌড়ের পর ক্যাচের সেই অত্যাশ্চর্য মুহূর্ত! ভিভ আউট হওয়ার ওয়েস্ট ইন্ডিজ মাত্র ১৯ রানে পরের তিনটি উইকেট হারায়। ম্যাচের চিত্রনাট্যও বদলে যায়। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় ভারত। লর্ডসের বারান্দায় ট্রফি হাতে তোলেন কপিল।
২০২৪ সালের ২৯ জুন। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনাল। বিশ্বজয় আর ভারতের মাঝে দাঁড়িয়ে ডেভিড মিলার। এক ওভারে মাত্র ১৬ রান পুঁজি। মিলারের মতো ব্যাটারের পক্ষে যা মোটেই অসম্ভব নয়। হার্দিক পাণ্ডিয়ার প্রথম বলই শূন্যে ভাসিয়ে দিলেন বাঁ-হাতি প্রোটিয়া ব্যাটার। বল ছুটল বাউন্ডারির দিকে। ছুটলেন আরেকজন সূর্যকুমার যাদব। লং অন থেকে বাউন্ডারির দিকে। বল লুফে নিলেন বটে, কিন্তু নিজের গতি নিয়ন্ত্রণ করবেন কীভাবে! এক চুল এদিক ওদিক হলেই তো উইকেটের বদলে স্কোরবোর্ডে লেখা হবে ছক্কা। সেই সঙ্গে সম্ভবত ট্রফিতেও লিখে ফেলা হবে দক্ষিণ আফ্রিকার নাম। কিন্তু সূর্য একচুলও এদিক-ওদিক হলেন না। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করলেন। বাউন্ডারির বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার আগে বল উড়িয়ে দিলেন। সীমানার ভিতরে প্রত্যাবর্তন করে ফের লুফে নিলেন সেই বল। মুহূর্ত যেন থেমে গেল। ওই মুহূর্তেই যেন ট্রফিতে লেখা হল ভারতের নাম।
৫ মার্চ, ২০২৬। ফাইনাল নয়, ম্যাচটা বিশ্বকাপের শেষ চারের যুদ্ধ। দু'টো ক্যাচের একটা গলে গেলেই চাপ বাড়তে পারত। সঞ্জু স্যামসনের ইনিংস, জশপ্রীত বুমরাহর বোলিংয়ের মতো অক্ষরের দু’টো ক্যাচও সেমিফাইনাল জয়ের প্রেক্ষিতে সমান গুরুত্বপূর্ণ, সমান মূল্যবান। দুই ক্যাচের মধ্যে সেরা কোনটা? বৃহস্পতিবার সেমিফাইনাল শেষে মিক্সড জোনে এসে অক্ষর একপ্রকার স্বীকার করে গেলেন, জ্যাকসেরটা নয়। ইংল্যান্ড অধিনায়কের ক্যাচটাই তাঁর কাছে ব্যক্তিগতভাবে সেরা। উল্লেখ্য, ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৭ রানে জিতে টানা দ্বিতীয় বার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে ভারত। রবিবার ফাইনালের সূর্যকুমারদের সামনে নিউজিল্যান্ড। সেই ম্যাচে জিতলে টানা দ্বিতীয়বার ফাইনাল জিতে নজির গড়বে ভারত। তাছাড়াও দেশের মাটিতেও বিশ্বকাপ জেতা প্রথম দল হিসাবে রেকর্ড বুকে নাম তুলবেন সূর্যকুমাররা। এখন বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখছে আসমুদ্রহিমাচল।
