এম.জে. আকবর: এক শতাব্দী আগে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় আরবরা– অটোমান খেলাফত পরিত্যাগ করে মিত্রশক্তির সঙ্গে যোগ দিয়ে অটোমান সাম্রাজ্যের পরাজয়ে অংশ নেয়। সে-সময় মুস্তাফা কামালের নেতৃত্ব ও তুরস্কের জনগণের বীরত্ব না থাকলে তুরস্কও হয়তো খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যেত।
১৯১৮ সালের অতীতকে যতই বিস্মৃতির আড়ালে সরিয়ে রাখা হোক না কেন, ২০১৮ সালের অক্টোবরের স্মৃতি রিয়াদের ‘অ্যামনেশিয়া বিন’ থেকে এত সহজে হারিয়ে যাওয়ার নয়। ২০১৮ সালে রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান এমন এক প্রচারণার নেতৃত্ব দেন, যার নেপথ্যে ছিল আমেরিকার সমর্থন; সেই প্রচারণার ‘লক্ষ্য’ ছিল তরুণ সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সলমন ওরফে ‘এমবিএস’-কে আঙ্কারায় অবস্থিত সৌদি দূতাবাসে সাংবাদিক জামাল খাশোগির হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে দেওয়া।
২০২৬ সালে ‘এমবিএস’ হয়তো হাসি মুখে থাকতে পারেন, কিন্তু তিনি কি বিস্মৃত? আর-একটি রহস্যময় প্রশ্নের উত্তর এখনও বাকি: মক্কার পবিত্র স্বাক্ষরের এই আচার থেকে সংযুক্ত সংযুক্ত আরব আমিরশাহিকে বাদ দেওয়া হল কেন?
উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলি মোটামুটি তিনভাগে বিভক্ত– নিষ্ক্রিয় রাষ্ট্র কুয়েত ও বাহারিন; স্বাধীন পথ অনুসরণকারী মিশর ও কাতার; এবং সক্রিয় সৌদি আরব ও আবু ধাবি। শেষের দুই পক্ষ বিদেশনীতি ও নিরাপত্তানীতিতে কার্যত অবিচ্ছেদ্য– অবিরাম অস্থিরতার মধ্যেও তারা ঠান্ডা মাথায়, সতর্ক সমন্বয়ের মাধ্যমে একের পর এক সংকট সামলেছে। এই আপাত বিচ্যুতির একমাত্র যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা– ‘মক্কা চুক্তি’-কে একমাত্রিক প্রকল্প হিসাবে দেখা।
পাকিস্তান এখানে কার্যত একটি ভাড়াটে বাহিনী হিসাবে কার্যকর– যদিও সর্বাত্মক যুদ্ধে তাদের সক্ষমতা এখনও পরীক্ষিত হয়নি। কিন্তু বৃহত্তর ভূকৌশলগত স্বস্তির জন্য ভারতের সঙ্গে একটি অর্থনৈতিক সেতু অপরিহার্য। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের দায়িত্ব তাই আবুধাবির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে; আর নিরাপত্তার ভার নিয়েছে সৌদি আরব।
ট্রাম্প আমলে আমেরিকার নীতিতে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন সম্ভবত ভারতকে– ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার কাঠামো থেকে– তথা পশ্চিম এশিয়া থেকে মালাক্কা প্রণালী পর্যন্ত– ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার প্রচেষ্টা। ট্রাম্প ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ থেকে ‘ইন্দো’ শব্দটিই বাদ দিয়েছেন। ভারতে নিযুক্ত তাঁর রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর অবশ্য একটি দুর্বল, অপ্রাসঙ্গিক যুক্তি দিয়ে বিষয়টি হালকা করার চেষ্টা করেছিলেন। বাংলাদেশের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রতি আমেরিকার গোপন সমর্থন এবং দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতকে ঘিরে রাখার ধারাবাহিক প্রচেষ্টারও হয়তো এর সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে ভারতের সামরিক ঘঁাটি আরও শক্তিশালী হয়েছে এবং দেশটি ২০০টি যুদ্ধজাহাজের নৌবহরের দিকে এগিয়ে চলেছে। ভারত এখন ভারত মহাসাগরের এক গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এই বাস্তবই বর্তমানে হোয়াইট হাউসে গ্রহণযোগ্যতার বদলে অস্বস্তি তৈরি করেছে। নিজেদের পররাষ্ট্রনীতির স্বাধীনতা রক্ষায় ভারতের দৃঢ়তা ট্রাম্পকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। কারণ, তিনি আনুগত্যের প্রতি বিশেষভাবে আকর্ষিত।
বিল ক্লিনটনের পর থেকে আমেরিকার প্রেসিডেন্টরা ১৯৯০ সালে এক সময় অবরুদ্ধ ও অনিশ্চিত এক প্রশ্নচিহ্ন থেকে ধীরে ধীরে একটি বিশ্বাসযোগ্য গণতান্ত্রিক, অর্থনৈতিক ও পারমাণবিক শক্তিতে ভারতের উত্থানকে সম্মান করেছেন। ওসামা বিন লাদেনের পরিকল্পনায় সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলা ৯/১১-র অব্যবহিত পর আমেরিকার ভারতের প্রতি আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। ভারতকে নিজের কৌশলগত বলয়ে টেনে আনার জন্য আমেরিকা তখন সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ গ্রহণ করে।
দ্বিতীয় ‘ন্যাটো’ গঠনের ধারণাটিও নতুন নয়। ৯/১১-র পর আমেরিকা ভারতকে ‘ইস্টার্ন ন্যাটো’ নামে চিহ্নিত একটি প্রকল্পে নেতৃত্ব দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। ভারতপন্থী কূটনীতিক আর. নিকোলাস বার্নস এই প্রকাশ্য উদ্যোগটির নেতৃত্ব দেন। এটি ছিল দলমত-নির্বিশেষে আমেরিকার একটি প্রস্তাব– ওয়াশিংটন, পেন্টাগন ও ল্যাংলির সংজ্ঞায়িত ইসলামি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জোটে ভারতকে একটি ‘সামরিক মিত্র’ হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেওয়ার প্রস্তাব।
২০০৩ সালে সাদ্দাম হুসেনের বিরুদ্ধে আমেরিকা সেনা নামাতে ভারতকে রাজি করাতে চেয়েছিল। বড় মাপের মন্ত্রীরা– যেমন, যশবন্ত সিং– এতে আগ্রহীও ছিলেন। কিন্তু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী ভারতের পররাষ্ট্রনীতির তথাকথিত সীমার মধ্যেই থাকার সিদ্ধান্ত নেন। মনমোহন সিংয়ের সরকারের আমলেও আমেরিকার সদিচ্ছার সেই ধারা অব্যাহত ছিল, কিন্তু ভারত তখনও কোনও বহিরাগত সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল না। সেই সদিচ্ছার দৌড় এখন গতি হারিয়ে হঁাটার পর্যায়ে নেমে এসেছে– যদি আদৌ এখনও এগিয়ে থাকে।
জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ– গোরের সাম্প্রতিক এই বক্তব্য নিঃসন্দেহে স্বাগতযোগ্য। কিন্তু মূল ভোজ যখন অন্যত্র পরিবেশিত হচ্ছে, তখন এটি যেন ট্রাম্পের উচ্ছিষ্ট বিতরণের চেয়ে বেশি কিছু নয়। এমন একটি ঘোষণা ইসলামাবাদে বসে দিলে তার তাৎপর্য অনেক বৃদ্ধি পেত। ভারতীয়রা জানে, কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তা নতুন করে বোঝানোর প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন তা পাকিস্তানিদের মগজস্থ করার। মনে হতেই পারে, উপর-উপর তাৎক্ষণিক স্বস্তির আছে এই তো ভাল, কিন্তু বৃহত্তর কূটনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে এর গুরুত্ব এখনও প্রান্তিক।
কাশ্মীর– পাকিস্তানের একপ্রকার গোঁতে পরিণত। ভারতের বিরুদ্ধে নিরন্তর সংঘাতে তারা প্রতিটি মুসলিম দেশের সমর্থন পেতে উঠে-পড়ে লেগেছে। এরই মাঝে দক্ষিণ এশিয়ায় মক্কা চুক্তি ইতিমধ্যেই ভারত-বিরোধীদের হাতে একটি কার্যকর কৌশলে পরিণত। বিশেষ করে ঢাকায় তো বটেই– যেখানে একটি শক্তিশালী লবি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রস্তাবিত দিল্লি সফরে কার্যত বাগড়া দিয়েছিল। এই লবিই পাকিস্তানের সঙ্গে সহযোগিতা আরও জোরদার করার জন্য সক্রিয়ভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
চলতি বছরের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের ‘ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স’-এর ৬ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল পাকিস্তান সফর করে। দলের নেতৃত্বে ছিলেন কর্নেল মাফুজ-উল-বারি। সঙ্গে উইং কমান্ডর ইমরুল কায়েস, মোহিউদ্দিন আসিফ, মুরাদ হোসেন তুষার, খন্দকার আরিফুল ইসলাম ও স্কোয়াড্রন লিডার রায়হান মোহাম্মদ চৌধুরী।
(চলবে)
(মতামত নিজস্ব)
লেখক বিশিষ্ট সাংবাদিক
কৃতজ্ঞতা ওপেন
