shono
Advertisement
Lionel Messi

বিদায় 'জাদুকর' মেসি, তবু অবশিষ্ট কিছু কি এখনও!

শেষে কি ‘ট্র্যাজিক নায়ক’ হয়ে গেলেন বিশ্বশ্রেষ্ঠ ফুটবলার? এমন মহানায়কের বিদায় হবে ‘সন্ন‌্যাসী রাজা’-র মতো– যিনি সবকিছু হেলায় ফেলে দিয়ে নিজের সিংহাসন ছেড়ে এগিয়ে যেতে পারেন নতুন এক শান্তির পথে। হাজার অনুনয়ে তিনি ফিরবেন না। মুখের হাসি সূর্যকিরণে আরও উজ্জ্বল হবে।
Published By: Kishore GhoshPosted: 03:26 PM Sep 02, 2026Updated: 03:29 PM Sep 02, 2026

প্রিয় লিও,
তোমার সিদ্ধান্তে একমত হতে পারলাম না। তোমার কোটি কোটি ফ‌্যান কী মনে করে আমার জানা নেই, জানতেও চাই না। তবে আমার সাফ কথা, ‘এখনই বিদায় বলো না’। এখনও দেওয়ার মতো অবশিষ্ট কিছু আছে।

Advertisement

যদি তোমাকে চিঠি লিখতে পারতাম, তাহলে এ-কথাই লিখতাম। সঙ্গে জুড়ে দিতাম এই লেখাটা। হয়তো অনেকেই বলবেন, ঠিকই তো করেছে। এটাই তো অবসরের সময়। বরং অতিরিক্ত সময় খেলছেন। সবাই পারে না। তিনি ভাগ‌্যবান।

সত্যিই ঈশ্বরের বরপুত্র। ৩৯ বছর বয়স। আর কত! এখনও খেলবেন? নিজের কথা ছাড়ুন, তরুণদের জায়গা ছেড়ে দেবেন তাহলে কবে! নিকো পাজ-সহ একঝাঁক নবীন ছটফট করছেন। আরও একজন মেসি হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখছেন। কী তাঁদের ঝলক! সামনে যদি ‘মেসি’ নামের এক আদর্শ থাকে, তাহলে তো তাঁরা অনেক এগিয়ে শুরু করেছেন। তাঁদের এবার সুযোগ দিতেই হবে।

মেসি ‘এআই’-সৃষ্ট যন্ত্রমানব নন। তিনি অন‌্য গ্রহ থেকে আসেননি।

এমন তো নয়, বিদায়বেলায় বিকায় হেলায় সহিয়া নীরব ব‌্যথা। ভাঁড়ার পূর্ণ করে বিদায় নিচ্ছেন মেসি। সাফল্যের চূড়ায় বসে। ধারাবাহিকভাবে তিনি পেয়েছেন। পেরেছেন। দেশের হয়ে সাফল‌্য ঈর্ষণীয়। কিংবদন্তি মারাদোনাও দেশকে এত দিতে পারেননি। ৬টি বিশ্বকাপ খেলে ৩টিতে দেশকে ফাইনালে তুলেছেন। একটি বিশ্বজয়। অলিম্পিকে সোনা। অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপও পকেটে। ২টো কোপা আমেরিকা জয়। একটি ফিনালিসিমা কাপ চ‌্যাম্পিয়ন। দেশের হয়ে ২০৭ ম‌্যাচে ১২৫টি গোল।

১০টি হ‌্যাটট্রিক। সহায়তা ৬৮। বিশ্বকাপে টানা ৯ ম‌্যাচে গোল করে বিশ্বরেকর্ড। ২টো বিশ্বকাপে ‘গোল্ডেন বল’। ৮ বার বিশ্বসেরা খেলোয়াড়ের তকমা। তালিকা আরও দীর্ঘ। একটা জীবনে একজন মানুষের আর কী চায়? পাওয়ারও তো একটা সীমা আছে। এরপর নীল-সাদা জার্সি তুলে রাখার সিদ্ধান্ত নিতেই পারেন মেসি। সিদ্ধান্তটা সঠিক।

একই সঙ্গে এ কথা মানতেই হয় যে এই বয়সে আর যা-ই খেলা হোক, পারফেক্ট ফুটবলটা হয় না! চিরদিন ৯০ মিনিট মাঠে থাকা সম্ভব নয়। তাহলে তো ঘড়ির কাঁটাও উলটোদিকে চলত। ডিসেম্বরে গ্রীষ্ম আসত। নেপালে হড়পা বানের বিপর্যয় ভুলে নদীতে চিরবসন্ত বিরাজ করত।
সময়ের গুরুত্ব মানতেই হবে। মেসি ‘এআই’-সৃষ্ট যন্ত্রমানব নন। তিনি অন‌্য গ্রহ থেকে আসেননি।

যেদিন মারাদোনা অবসর নিয়েছিলেন, সেদিন কি কেউ জানত অপেক্ষা করছেন আর এক জাদুকর?

শুধু তো মানুষটার বয়স ৩৯ হয়নি, তাঁর ফুসফুসের বয়সও ৩৯, হৃদ্‌যন্ত্রের ৩৯, থাইয়ের পেশির বয়স ৩৯, বিখ‌্যাত বাঁ পায়ের সৃষ্টির পরও ৩৯ বছর কেটে গিয়েছে। এমনকী, তাঁর মুখাবয়বেও ১০০ শতাংশ ৩৯-এর ছাপ। সবকিছুর তো একটা বিজ্ঞান আছে। তাই সময়ের সরণি বেয়ে মারাদোনাকেও একদিন ফুটবল ছাড়তে হয়েছিল। ‘স্যর’ ডন ব্র‌্যাডম‌্যানকেও ক্রিকেট ব‌্যাট তুলে রাখতে হয়েছিল।

রজার ফেডেরার বিদায় জানিয়েছিলেন টেনিস কোর্টকে। কার্ল লুইস ছেড়েছিলেন শত মিটারের ট্র‌্যাক, ৩২ বার নিজের বিশ্বরেকর্ড ভাঙা সের্গেই বুবকাকে পোল ভল্টকে বিদায় জানাতে হয়েছিল একদিন। বক্সিং গ্লাভ্‌স তুলে রাখতে হয়েছিল অতিমানব মাইক টাইসনকেও। কালের নিয়মে বয়সের ভারে সবাইকেই থামতে হয়েছিল কোনও না কোনও সময়। অথচ এঁরা প্রত্যেকে ছিলেন বিশ্বজয়ী। বিশ্বত্রাস। নিজের সময় অপরাজেয়। একবার নয়, বারবার। সময়
তাঁদের থামতে নির্দেশ দিয়েছিল। মাথা উঁচু করে বিদায় নিয়েছেন। ফিরতে চাননি। কারণ চাইলেও ফেরা হত না। ফিরলেও সিংহাসনে বসা হত অনিশ্চিত। মেসিকেও তাই থামতে হত এক সময়। তিনি আর কত খেলবেন! আর কত দেবেন!

২০০৬ থেকে বিশ্বকাপ খেলছেন। ক্লাব ফুটবল ধরলে আরও অনেক সময়। তাঁর ক্ষেত্রে বিজ্ঞান আলাদা হয়ে যেতে পারে না। তিনি খেললেই আর্জেন্টিনা বিশ্বজয়ী হবে এ-কথা কি হলফ করে বলা যায়? তাহলে ‘নতুন’ জেনারেশন উঠবে কীভাবে! যেদিন মারাদোনা অবসর নিয়েছিলেন, সেদিন কি কেউ জানত অপেক্ষা করছেন আর এক জাদুকর? যিনি ছাপিয়ে যাবেন দিয়েগোকেও। তাই সময়কে মর্যাদা দিয়ে মেসি থামলেন। যত দিন দিতে পারলেন সব দিয়ে ছাড়লেন। ৩৯ বছর বয়সেও দলকে বিশ্বকাপ ফাইনালে তুলে ছাড়লেন।

সমালোচনার হাত থেকে রেহাই পেতে দেশের হয়ে খেলা ত‌্যাগ করলেন?

নক আউট থেকে পরপর চারটি ম‌্যাচ কঠিন সময়ে জিতিয়ে ছাড়লেন। তবে তিনি বুঝিয়েছেন দেশের হয়ে না খেললেও ক্লাব ফুটবল থেকে এখনও বিদায় নিচ্ছেন না। মিয়ামির হয়ে খেলা চালিয়ে যাবেন। চুক্তি আছে আরও দু’-বছর। বিশ্বকাপ যেখানে শেষ করেছিলেন সেখান থেকেই ক্লাব ফুটবল শুরু করেছেন। গোল করছেন, করাচ্ছেন।

মাত্র একদিন আগে মিয়ামির হয়ে হ‌্যাটট্রিক-সহ ৪ গোল করা মেসি সোমবার সহসা জানালেন তিনি আর দেশের হয়ে খেলবেন না। সিদ্ধান্ত নেওয়ার পিছনে তিনি মূলত বাবার মৃত্যুর পর তাঁর জীবনে নেমে আসা হতাশাকে সামনে এনেছেন। বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের কষ্ট স্বীকার করেছেন। কীভাবে বয়সের সঙ্গে যুদ্ধ করে প্রতিটি ম‌্যাচ খেলেছেন গোল করেছেন, করিয়েছেন, তা আবিশ্ব দেখেছে। তাই তিনি লিখেছেন, ‘দেশের হয়ে সব দিয়ে দিয়েছি। আর অবশিষ্ট কিছু নেই।’ চিঠিটা পড়ে চোখে জল আসছিল। মনটা ব‌্যথায় ভরে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল, শেষে কি ‘ট্র‌্যাজিক নায়ক’ হয়ে গেলেন বিশ্বশ্রেষ্ঠ ফুটবলার? এমন মহানায়কের বিদায় হবে ‘সন্ন‌্যাসী রাজা’-র মতো– যিনি সবকিছু হেলায় ফেলে দিয়ে নিজের সিংহাসন ছেড়ে এগিয়ে যেতে পারেন নতুন এক শান্তির পথে। হাজার অনুনয়ে তিনি ফিরবেন না। তাঁর চোখে জল থাকবে না। মুখের হাসি সূর্যকিরণে আরও উজ্জ্বল হবে। তাই চিঠিটি পড়ে মনটা খচখচ করে উঠল।

মেসি কি সত্যিই মন থেকে দেশের হয়ে খেলা ছাড়তে চাইলেন? না কি কোনও অজানা হতাশা থেকে বিদায় নিলেন? সমালোচনার হাত থেকে রেহাই পেতে দেশের হয়ে খেলা ত‌্যাগ করলেন? নতুনদের জায়গা করে দিতেই নিজের ইচ্ছার মৃত্যু ঘটালেন? দিবারাত্র রাজনীতির ‘খবর’ লেখা এই সাংবাদিকের মন বিচলিত। তাঁর অন্ধ ফ‌্যান হয়ে চিন্তিত। জানতে ইচ্ছা করছে, এটা তো রাজার মতো হল না। কেন বিদায় নেওয়ার আগে এত বিরাগ, এত বিলাপ? কেন নেই হাসির ফোয়ারা? কেন নেই অনেক কিছু? রাজকীয় অবসর নিয়ে সেলিব্রেশন পাওয়ার ইচ্ছা নেই কেন?

সিদ্ধান্ত সঠিক। কিন্তু ফিরে আসার পথ খোলা রেখেই বিদায় নিও।

এইখানেই অঙ্ক। এইখানেই হাজার প্রশ্ন। আমার মন বলছে, এই বিদায় মন থেকে নয়। মেসি আরও খেলতে চাইছেন। আর একটি বিশ্বকাপ। কিন্তু পারিপার্শ্বিক পরিবেশ তাঁকে টেনে ধরছে। তিনি ভাবছেন, ৪ বছর অপেক্ষা করতে হবে। অনেক দূর। ৪৩ বছর বয়স হবে। তত দিন কি নিজেকে ধরে রাখতে পারবেন? দলের ‘বোঝা’ হয়ে উঠবেন না তো! তাই সিদ্ধান্ত নিয়ে চাপমুক্ত হলেন।

তিনি যা-ই চান, মন বলে, মেসি আরও খেলুক। তিনি পারবেন। আরও একটা বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে নেতৃত্ব দিন। এটা হয়তো কোটি কোটি ফ‌্যানের মনের কথা। আসলে মেসি হলেন সেই বাগানের প্রজাপতি, যাঁর ফুটবল পাখায় পাখায় রং ঝরায়... যাঁর ফুটবল সাতটি রঙের রামধনু হয়ে রয়। তিনি খেলবেন না, তা হলে ফুটবলের রং মুছে যাবে, বিশ্বকাপটা জোলো হয়ে যাবে। সব জৌলুস চলে যাবে। ফুটবল এক আশ্চর্য উৎসবের আসর। সারা বিশ্ব তাতে শামিল হয়। অনেক নটনটী। কিন্তু কখনও কখনও মেসির মতো মহানায়করা আসেন। মহাকাব্যের ঘোড়া-র মতো ছুটতে থাকেন। তখন প্রত্যেকে পিছনে চলে যায়। মেসি শুধু ফুটবলার হিসাবে মনে নেই। তিনি একটি বর্ণময় চরিত্র হয়ে উঠেছেন। তাঁকে বাদ দিয়ে ফুটবল ভাবাই যায় না!

ঠিক এই জায়গায় দাঁড়িয়ে আবারও লিখতে চাই–
প্রিয় লিও,
সিদ্ধান্ত সঠিক। কিন্তু ফিরে আসার পথ খোলা রেখেই বিদায় নিও। ‘তুই হাততালি দিয়ে উঠলেই সূর্য লজ্জা পায়।’– এই সত‌্য তোমার জন‌্য সত্যিই হোক। আগামী বছর বিশ্বকাপ শুরু তোমার দেশ থেকে। সময় গড়িয়ে যাক, অবশিষ্ট যেটুকু থাক তা দিয়ে হোক ইতিহাস।

kingshukpratidin@gmail.com

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement