এই লেখা যখন মুদ্রণে, ততক্ষণে বিশ্বকাপ ট্রফি উঠে গিয়েছে বিজিত দলের হাতে। কিন্তু প্রতিটি বিশ্বকাপ আয়োজনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অর্থনীতির নানামুখী তরঙ্গের ওঠাপড়াও। বিশ্বকাপ থেকে হওয়া বিপুল আয় কি সত্যিই আয়োজক শহরগুলির ভাগ্যে জোটে? ’২৬ বিশ্বকাপের প্রবণতা: ‘কত খরচ হল’, এর চেয়েও নজর রাখা– ‘কত আয় হল’, আর ‘কত ও কীভাবে বণ্টন’ হল আয়ের টাকা? লিখছেন অতনু বিশ্বাস।
এতদিন রাত জেগে বিশ্বকাপ ফুটবল দেখছি আমরা– অগণিত দর্শক। কেউ মেসি, কেউ-বা এমবাপের সমর্থনে গলা ফাটাচ্ছি। ব্রাজিল, বা পর্তুগাল হারায় শোকে খাওয়ানাওয়াও ভুলছে কেউ কেউ। মানচিত্রে ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা, নরওয়ে বা কেপ ভার্দে-র ভৌগোলিক অবস্থান জানাটা এক্ষেত্রে বাহুল্য। গোল, গ্যালারির গর্জন, টিভির সামনে দুনিয়াজুড়ে প্রায় ছশো কোটি মানুষ, বিভিন্ন দেশের জাতীয় পতাকার ঢেউ, অশ্রু ও উল্লাস– প্রতি চার বছর অন্তর এই আবেগেই তো ভেসে যায় পৃথিবী!
তা সত্ত্বেও ভুললে কিন্তু চলবে না যে, একুশ শতকের এক-চতুর্থাংশ পেরিয়ে বিশ্বকাপ আর শুধুমাত্র ফুটবলের শীর্ষ প্রতিযোগিতা নয়। বরং এটি এখন বিশ্বের বৃহত্তম বাণিজ্যিক প্রকল্পগুলির একটি– যেখানে প্রতিটি ম্যাচ, প্রতিটি টিকিট, প্রতিটি সম্প্রচার-স্বত্ব এবং প্রতিটি বিজ্ঞাপন বহু বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক সমীকরণের অংশ।
মহাতারকা-সমৃদ্ধ ফুটবলের মহাকাব্যে ডুবে থেকে আমরা হয়তো খেয়ালই করছি না যে, ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ সেই পরিবর্তনের এক নতুন অধ্যায় লিখে চলেছে স্পষ্ট অক্ষরে। ফুটবল আর বাণিজ্যের মিশেলে এ এক নব-রূপায়ণ। এবারই প্রথমবারের মতো ফুটবল বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলছে ৪৮টি দেশ, হচ্ছে ১০৪টি ম্যাচ, এবং প্রতিযোগিতায় রয়েছে ৩টি আয়োজক দেশ– আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা আর মেক্সিকো। আকারের নিরিখে এটি অবশ্যই ইতিহাসের বৃহত্তম বিশ্বকাপ। কিন্তু বোধকরি তার চেয়েও বড় বিষয় হল: এর বদলে যাওয়া অর্থনৈতিক দর্শন। এই বিশ্বকাপের মূল আকর্ষণ তাই কেবল মাঠের লড়াইটুকুই নয়, বরং মাঠের বাইরের এক নতুন ব্যবসায়িক মডেল, যা কিন্তু অনায়াসে বদলে দিতে পারে ভবিষ্যতের অন্যান্য আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতারও রূপরেখা।
৪ বছর পর আমেরিকা দেখাল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ‘মডেল’। সেখানে অধিকাংশ স্টেডিয়াম আগে থেকেই প্রস্তুত, সেখানে যে আমেরিকান ফুটবলের জনপ্রিয় প্রতিযোগিতা ‘এনএফএল’-এর খেলা হয়ে আসছে নিয়মিত।
অনেক ক্রীড়া-অর্থনীতিবিদ মনে করছেন, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ আসলে যেন অর্থনীতির একটি ল্যাবরেটরি– যেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হচ্ছে কীভাবে একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা থেকে আদায় করা যায় সর্বাধিক রাজস্ব, কীভাবে বিশ্বব্যাপী সম্প্রচার, ডিজিটাল প্রযুক্তি, কর্পোরেট স্পনসরশিপ এবং পরিবর্তনশীল টিকিটমূল্যের মাধ্যমে এক অতি-জনপ্রিয় খেলাকে রূপান্তরিত করা যায় আরও বড় বাণিজ্যে। মূল প্রশ্নটা কিন্তু আরও বড়: এই টুর্নামেন্ট থেকে সংগৃহীত বিপুল অর্থের ফলে প্রকৃত লাভ হচ্ছে কার? আয়োজক দেশগুলির? স্থানীয় মানুষের? না কি ফিফার?
ফুটবল বিশ্বকাপ, অর্থনৈতিক বিবর্তন
বিশ্বকাপের অন্তর্নিহিত অর্থনৈতিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে তাকাতে হবে গত কয়েক দশকে এর ইতিহাসের দিকে। ভেবে দেখলে বোঝা যাবে, ১৯৯০-তে ইতালি বিশ্বকাপে বিশ্বকাপের অর্থনীতির আধুনিক যুগের সূচনা হয়। এর আগে বিশ্বকাপ ছিল মূলত একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। ইতালিতে তা পরিণত হল এক পূর্ণাঙ্গ ‘মেগা স্পোর্টিং ইভেন্ট’-এ। নতুন স্টেডিয়াম তৈরি, পুরনো স্টেডিয়ামের আধুনিকীকরণ, টেলিভিশন সম্প্রচার, অফিশিয়াল পণ্য, ভিডিও গেম, কর্পোরেট বিপণন– সব মিলিয়ে প্রথমবারের মতো ইতালিতেই বিশ্বকাপ রূপ নেয় এক বিশাল বৈশ্বিক ব্র্যান্ডে।
এজন্য কিন্তু দেশটাকে দাম দিতে হয়েছে অনেক। প্রাথমিক বাজেটের তুলনায় অনেক বেশি খরচ করে ফেলে ইতালি। ফলে, বাড়ে সরকারি ঋণের বোঝা। পরে গবেষণায় দেখা গিয়েছে, প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফলের বড় অংশই কিন্তু বাস্তবে পাওয়া যায়নি। তাই এই বিশ্বকাপ থেকেই শুরু হয় একটি দীর্ঘকালীন বিতর্ক– মেগা ক্রীড়া প্রতিযোগিতা কি সত্যিই অর্থনৈতিক উন্নয়নের কার্যকর পথ?
৪ বছর পর আমেরিকা দেখাল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ‘মডেল’। সেখানে অধিকাংশ স্টেডিয়াম আগে থেকেই প্রস্তুত, সেখানে যে আমেরিকান ফুটবলের জনপ্রিয় প্রতিযোগিতা ‘এনএফএল’-এর খেলা হয়ে আসছে নিয়মিত। নতুন নির্মাণের পরিবর্তে আমেরিকায় তাই জোর দেওয়া হয় দক্ষ ব্যবস্থাপনা, বিপণন এবং দর্শকসংখ্যা বাড়ানোর উপর। এবং বিশ্বকাপ-পরবর্তী সময়ে সে-দেশে প্রতিষ্ঠা হয় ‘মেজর লিগ সকার’-এর। সেটা এই বিশ্বকাপের এক গুরুত্বপূর্ণ লেগাসি। ‘সকার’ বা ফুটবল আমেরিকার প্রধান খেলা না হলেও, এই বিশ্বকাপ সে-দেশে তৈরি করে দিল পেশাদার ফুটবলের স্থায়ী ভিত্তি। পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা যায় পর্যটন, হোটেল, রেস্তোরঁা ও খুচরো ব্যবসায়। এই বিশ্বকাপ দেখিয়ে দিল, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকলে বিশাল অবকাঠামো নির্মাণ না করেও অর্থনৈতিকভাবে সফল হতে পারে বিশ্বকাপ।
১৯৯৮ সালে ফ্রান্স বিশ্বকাপ আয়োজন করল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কৌশলে। নতুন স্টেডিয়াম তৈরি হয় মাত্র একটি– স্তাদ দি ফ্রঁস। সংস্কার করা হয় বাকিগুলির। ফলে সরকারি ব্যয় সীমিত থাকল। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বিশ্বকাপের প্রস্তুতি পর্যায়ে নির্মাণ ও পরিষেবা খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেলেও প্রত্যাশিত পর্যটন-বিস্ফোরণ কিন্তু ঘটেনি। বরং কিছু সাধারণ পর্যটক ফ্রান্সে আসেনি ভিড়ের আশঙ্কায়। খুচরো ব্যবসায়ও তেমন উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটেনি। তবে বিশ্বকাপের একটি নতুন বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠল এবারই। টিকিট বিক্রির তুলনায় টেলিভিশন সম্প্রচার এবং বৈশ্বিক স্পনসরশিপ দ্রুত পরিণত হল় প্রধান আয়ের উৎসে। অর্থাৎ বিশ্বকাপের অর্থনীতি ধীরে ধীরে মাঠের দর্শকদের থেকে সরে কোটি কোটি টেলিভিশন দর্শক এবং বহুজাতিক কর্পোরেশনের দিকে ঝুঁকতে শুরু করল।
বিশ্বকাপের অর্থনৈতিক ইতিহাসে ‘জার্মানি ২০০৬’-ও একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। পর্যটন বৃদ্ধি, খুচরো বিক্রি, হোটেল শিল্প, রেস্তোরঁা ব্যবসা এবং সামগ্রিক ভোক্তা ব্যয়– সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব দেখা যায়। এর পাশাপাশি সামনে আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়– ‘ফিল-গুড ফ্যাক্টর’ বা ইতিবাচক সামাজিক মনোভাব। বিশ্বকাপ চলাকালীন বৃদ্ধি পায় নাগরিকদের আত্মবিশ্বাস, জাতীয় গর্ব এবং ভোক্তাদের ব্যয় করার প্রবণতা। অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, সরাসরি পরিসংখ্যানে মাপা না গেলেও এই মানসিক প্রভাবের অর্থনৈতিক মূল্য বাস্তবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বকাপের পর উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় জার্মান বুন্দেসলিগার আন্তর্জাতিক জনপ্রিয়তাও।
ফলে দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হয় সে দেশের ফুটবল শিল্পও। কিন্তু একই সময়ে আর-একটি পরিবর্তনও স্পষ্ট হয়ে ওঠে ফুটবল বিশ্বে। বিশ্বকাপ যত বড় হতে থাকে, ফিফার আর্থিক ক্ষমতাও বাড়তে থাকে ততটাই। ফিফার হাতে ক্রমশ কেন্দ্রীভূত হতে শুরু করে সম্প্রচার-স্বত্ব, স্পনসরশিপ এবং বিপণন থেকে আয়ের সিংহভাগ। অর্থাৎ, বিশ্বকাপ আর কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হয়ে থাকল না, এটি ধীরে ধীরে পরিণত হল অন্যতম বৃহৎ বৈশ্বিক ব্যবসায়িক প্ল্যাটফর্মে।
২০১০ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের আয়োজক হয় আফ্রিকা। দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে এ কেবল এক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ছিল না– বরং ছিল বিশ্বের সামনে নিজেদের সক্ষমতা তুলে ধরার সুযোগ।
জার্মানি ২০০৬ সালের সাফল্যের পর বিশ্বকাপ আয়োজনকে জাতীয় উন্নয়নের এক কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে দেখতে শুরু করে অনেক দেশ। আন্তর্জাতিক পরিচিতি, পর্যটন, বিদেশি বিনিয়োগ এবং আধুনিক অবকাঠামোর প্রতিশ্রুতি– সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ যেন একটা উন্নয়নের শর্টকাট– যেন একটি আশ্চর্য প্রদীপ। কিন্তু পরবর্তী চারটি বিশ্বকাপ দেখাল, বিষয়টা এতটাও সহজ নয়। দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল, রাশিয়া, কাতারে এই পরিবর্তনের নাটকীয় ওঠাপড়ার রূপ বুঝিয়ে দিল, আকাশছোঁয়া ব্যয়ের সঙ্গে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি, রাজনৈতিক বিতর্ক এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার মিশেলে এ বড় কঠিন পরীক্ষার সময়কাল! আর, সেই অভিজ্ঞতার ওপর দাঁড়িয়েই নির্মিত ২০২৬ সালের সম্পূর্ণ নতুন বিশ্বকাপ মডেল।
সেখানে জন্ম হয়েছে নতুন অর্থনৈতিক দর্শনের।
২০১০ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের আয়োজক হয় আফ্রিকা। দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে এ কেবল এক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ছিল না– বরং ছিল বিশ্বের সামনে নিজেদের সক্ষমতা তুলে ধরার সুযোগ। নতুন স্টেডিয়াম, বিমানবন্দর, সড়ক এবং গণপরিবহন ব্যবস্থায় করা হয় বিপুল বিনিয়োগ। সরকার আশা করেছিল, বিশ্বকাপের মাধ্যমে পর্যটন বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং আকৃষ্ট হবে বিদেশি বিনিয়োগ। কিন্তু টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার পরের ছবিটি অনেকখানি মিশ্র প্রকৃতির। কিছু অবকাঠামো দীর্ঘমেয়াদে কাজে লাগলেও কয়েকটি স্টেডিয়াম নিয়মিত ব্যবহার না হওয়ায় সেগুলির রক্ষণাবেক্ষণই হয়ে দঁাড়ায় মস্ত বোঝা।
যেমন: কেপ টাউনের গ্রিন পয়েন্ট স্টেডিয়াম। অর্থনীতিবিদরা একে বলেন ‘হোয়াইট এলিফ্যান্ট’– অর্থাৎ এমন ব্যয়বহুল সম্পদ, যার নির্মাণ-ব্যয় বিপুল, রক্ষণাবেক্ষণের খরচ অনেক, কিন্তু পরবর্তী সময়ে ব্যবহার সীমিত। তবে দীর্ঘ দিনের বর্ণবিদ্বেষ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার ইতিহাস পেরিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা যে বিশ্বের অন্যতম বড় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা সফলভাবে আয়োজন করতে পেরেছিল, সেই ইতিবাচক ভাবমূর্তি অর্থমূল্যে মাপা না-গেলেও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তার গুরুত্ব বড় কম নয়। একে মূল্য দিতে হবে বইকি।
২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপ দেখাল, ফুটবলপ্রেম অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে ঢাকতে পারে না। এই বিশ্বকাপে ব্যয় করা হয় প্রায় ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। নতুন স্টেডিয়াম, বিমানবন্দর, সড়ক এবং নগর উন্নয়ন প্রকল্পে খরচ হয় বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ। সমস্যা শুরু হয় যখন সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তুলতে থাকে যে, বিশ্বকাপের পরিকাঠামো নির্মাণের পরিবর্তে এই অর্থ স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জনকল্যাণে ব্যয় করা উচিত ছিল কি না। বিশ্বকাপ শুরুর আগেই রাস্তায় নেমে আসে হাজার হাজার মানুষ। তাদের স্লোগান ছিল, ‘স্টেডিয়াম নয়, হাসপাতাল চাই; ফুটবল নয়, শিক্ষা চাই।’ বিশ্বজুড়ে আলোচিত হয় এই আন্দোলন।
বিশ্বকাপ সফলভাবে অনুষ্ঠিত হওয়ার পরেও পরে দেখা যায় সাদা হাতির সেই পরিচিত ছবি–
কিছু স্টেডিয়াম নিয়মিত ব্যবহার হচ্ছে না এখানেও। বিশেষ করে আমাজন অরণ্যের মাঝখানে নির্মিত মানাউস স্টেডিয়াম দীর্ঘদিন অযৌক্তিক ব্যয়ের প্রতীক হয়ে থাকে অর্থনীতিবিদদের কাছে।
ব্রাজিলের অভিজ্ঞতার পর রাশিয়া তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত ব্যয়ের পথ নেয়। এই বিশ্বকাপের মোট ব্যয় ছিল ব্রাজিলের তুলনায় কম। এবং আধুনিক স্টেডিয়াম, পরিবহণ ব্যবস্থা আর নগর উন্নয়নের পাশাপাশি বিশ্বকাপকে ব্যবহার করা হয় রাশিয়ার আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উন্নত করার হাতিয়ার রূপেও। কিন্তু টুর্নামেন্ট চলাকালীন পর্যটন বৃদ্ধি, হোটেল শিল্পের সম্প্রসারণ এবং ভোক্তা ব্যয়ের ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেলেও এই বিশ্বকাপ আয়োজনের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক লাভ নিয়ে গবেষকদের মতভেদ থেকেই যায়। কারণ, পরবর্তীতে ইউক্রেন যুদ্ধ এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা আমূল বদলে দেয় রাশিয়ার অর্থনীতির গতিপথ– কঠিন হয়ে পড়ে বিশ্বকাপের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের আলাদা মূল্যায়ন।
বিশ্বকাপের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে কয়েক দশকের গবেষণায় একটি বিষয় কিন্তু স্পষ্ট যে, সব বিশ্বকাপ একরকম নয়। প্রত্যেকের রয়েছে নিজস্ব চরিত্র।
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ ব্যয়ের দিক থেকে গড়ে নতুন ইতিহাস। অবকাঠামো, পরিবহণ, নতুন শহর, মেট্রো, হোটেল এবং অন্যান্য প্রকল্প মিলিয়ে খরচ হয় ২০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। অবশ্য এই ব্যয়ের বড় অংশ ছিল কাতারের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনারও অংশ। তবু, বিশ্বকাপ ইতিহাসে এত বড় বিনিয়োগ হয়নি আর কখনও। ‘ফিফা’-র দৃষ্টিকোণ থেকেও কাতার বিশ্বকাপ ছিল অত্যন্ত লাভজনক। সম্প্রচার-স্বত্ব, বিপণন, স্পনসরশিপ এবং টিকিট বিক্রি থেকে আয় হয় রেকর্ড পরিমাণে। কিন্তু সমালোচকরা মনে করিয়ে দেয়, এত বিপুল রাজস্বের বড় অংশ আয়োজক দেশের পরিবর্তে কেন্দ্রীভূত হয় ফিফার হাতেই।
ফুটবল, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ
বিশ্বকাপের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে কয়েক দশকের গবেষণায় একটি বিষয় কিন্তু স্পষ্ট যে, সব বিশ্বকাপ একরকম নয়। প্রত্যেকের রয়েছে নিজস্ব চরিত্র। দেশ ভেদে, আগে থেকে বর্তমান অবকাঠামো অনুসারে, পরিকল্পনা আর ‘লক্ষ্য’ অনুযায়ী বিশ্বকাপের অর্থনৈতিক মডেল আর চরিত্রও বদলায়। অর্থনীতিবিদ বেন্নো টর্গলার দেখিয়েছেন, বড় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা স্বল্পমেয়াদে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে পারে, কিন্তু তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অনেকাংশে নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো, পরিকল্পনা এবং অবকাঠামোর কার্যকর ব্যবহারের উপর। জার্মান গবেষক স্বোয়ানৎজ অলমার্স এবং ভল্ফগাং ম্যানিং মেনিংয়ের বিশ্লেষণও পৌঁছেছে একই ধরনের সিদ্ধান্তে। তবে সব মিলিয়ে কিন্তু বলাই যায় যে, আয়োজক দেশের ক্ষেত্রে বিশ্বকাপের প্রত্যক্ষ অর্থনৈতিক লাভ প্রায়ই সীমিত। তা সত্ত্বেও পুরোপুরি অস্বীকার করা যায় না আন্তর্জাতিক পরিচিতি, পর্যটনের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা, নাগরিকদের আত্মবিশ্বাস, দেশের ব্র্যান্ড ইমেজ: এসব অদৃশ্য লাভগুলিকে।
অন্যদিকে স্টেফান শিমানস্কি, ভিক্টর ম্যাথেসন ও রবার্ট বাড বারংবার সতর্ক করেছেন যে, বিশ্বকাপকে ঘিরে প্রকাশিত বিভিন্ন সরকারি অর্থনৈতিক পূর্বাভাসের বড় অংশই অতিরঞ্জিত। বাস্তবে যে পরিমাণ অতিরিক্ত আয় হয়, তা অনেক সময়ই সরকারি ব্যয় এবং সুযোগ-ব্যয়ের তুলনায় কম।
এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকেই ফিফা এবং আয়োজক দেশগুলি একেবারে ভিন্ন পথ বেছেছে এবারের বিশ্বকাপে। আগে যেখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল: কত টাকা খরচ হবে, সেখানে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে: কত টাকা আয় করা যাবে, এবং সেই আয় শেষ পর্যন্ত কার হাতে যাবে? এসব প্রশ্নের উত্তরই বিশ্বকাপের অর্থনীতিকে নিয়ে এসেছে এক নতুন পরিবর্তন-বিন্দুতে। আর সেই নতুন মডেলই হয়ে উঠেছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
বিশ্বকাপ থেকে হওয়া বিপুল আয় কি সত্যিই আয়োজক শহরগুলির ভাগ্যে জোটে? ১৯৯৪ সালের আমেরিকা বিশ্বকাপে আয়োজক কমিটি লাভবান হয়েছিল টিকিট বিক্রির একটি বড় অংশ থেকে। কিন্তু এবার অধিকাংশ টিকিট থেকে আয়, আতিথেয়তা, কর্পোরেট বক্স, পুনর্বিক্রয় এবং ডিজিটাল সংগ্রহযোগ্য জিনিস থেকে প্রাপ্ত অর্থ সরাসরি যাচ্ছে ফিফার হাতে। ওদিকে, শহরগুলিকে কিন্তু বহন করতে হচ্ছে নিরাপত্তা, পরিবহণ, জনপরিষেবা ও অবকাঠামো পরিচালনার বিশাল ব্যয়– অথচ আয়ের মূল উৎস তাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। এ কারণেই শিকাগোর মতো কিছু বড় শহর আয়োজক হওয়ার সুযোগ থেকেও সরে দঁাড়িয়েছে। শহর প্রশাসনের যুক্তি ছিল– যেখানে ব্যয়ের দায় তাদের, অথচ টিকিট আয়ের অধিকাংশ যাবে অন্যের হাতে, সে পরিস্থিতিতে নিশ্চিত নয় অর্থনৈতিক লাভ।
ফিফা অবশ্য দাবি করে, বিশ্বকাপ থেকে অর্জিত উদ্বৃত্ত অর্থ বিশ্বের ২১১টি সদস্য ফুটবল সংস্থার উন্নয়ন প্রকল্পে বণ্টন করা হয়। এমনকী, কেপ ভার্দের মতো দেশের বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জনের পিছনেও ফিফার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন তহবিলের অবদান ছিল বলে সংস্থাটির দাবি।
স্টেফান জিমানস্কি ও সাইমন কুপার দেখিয়েছেন, বিশ্বকাপের আসল ‘মূল্য’ অনেক সময় সরাসরি অর্থনৈতিক নয়– বরং তা নিহিত থাকে আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি, জাতীয় আত্মবিশ্বাস, কূটনৈতিক অবস্থান এবং ‘সফ্ট পাওয়ার’ বৃদ্ধির মধ্যে।
দেখাই যাচ্ছে, প্রশ্ন তাই কেবল ‘কারা আয় করছে’ নয়, বরং প্রশ্ন হচ্ছে ‘আয়ের বণ্টন হচ্ছে কীভাবে’। কিন্তু এখানেও রয়েছে বিতর্ক। বিশ্বকাপের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে দীর্ঘ দিন গবেষণা করেছেন জার্মান ক্রীড়া অর্থনীতিবিদ ভল্ফগ্যাং ম্যানিং এবং স্বোয়ানৎজ অলমার্স। তঁাদের গবেষণায় দেখা গিয়েছে– বিশ্বকাপ ঘিরে সাধারণত যে বিপুল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দাবি করা হয়, তার অধিকাংশই অতিরঞ্জিত। বিশ্বকাপের সময় পর্যটন সাময়িকভাবে বাড়লেও, কিছু পর্যটন তো এমনিতেও হত। অনেক ক্ষেত্রেই নিয়মিত পর্যটকেরা কিন্তু সেই সময় ভিড় এড়িয়ে চলে যান অন্যত্র। আবার নতুন কর্মসংস্থানকে যতই ফুলিয়েফাঁপিয়ে দেখানো হোক না কেন, এই কর্মসংস্থানের বড় অংশই অস্থায়ী। দীর্ঘমেয়াদে জিডিপি বা কর্মসংস্থানের উপর এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত।
একইভাবে অর্থনীতিবিদ ভিক্টর ম্যাথেসন এবং রবার্ট বাড দেখিয়েছেন, মেগা ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নিয়ে যেসব অর্থনৈতিক পূর্বাভাস দেওয়া হয়, সেগুলি প্রায়ই পূরণ হয় না বাস্তবে। কারণ সরকারি ব্যয়, বিকল্প সুযোগের ক্ষতি, এবং স্থানীয় অর্থনীতির স্থানচ্যুতি থেকে যায় হিসাবের বাইরে। তাঁদের মতে, ‘নতুন অর্থ’ যতটা আসে, তার চেয়ে অনেক সময়ই বেশি ঘটে বিদ্যমান ব্যয়ের পুনর্বিন্যাস।
অন্যদিকে, স্টেফান জিমানস্কি ও সাইমন কুপার দেখিয়েছেন, বিশ্বকাপের আসল ‘মূল্য’ অনেক সময় সরাসরি অর্থনৈতিক নয়– বরং তা নিহিত থাকে আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি, জাতীয় আত্মবিশ্বাস, কূটনৈতিক অবস্থান এবং ‘সফ্ট পাওয়ার’ বৃদ্ধির মধ্যে। অর্থাৎ, বিশ্বকাপের সাফল্য কেবল হিসাবের খাতায় মাপা যায় না– কারণ, তার একটি বড় অংশ অদৃশ্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদ। যা ঠিকমত পরিমাপযোগ্য নয়।
এই বিতর্কের মাঝেই ২০২৬ বিশ্বকাপ কিন্তু লিখছে একটি নতুন অধ্যায়। কারণ এবার স্টেডিয়াম নির্মাণে বিপুল সরকারি বিনিয়োগের পরিবর্তে জোর দেওয়া হয়েছে বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার এবং আয় বাড়ানোর উপর। ঝুঁকির ধরনটাও তাই বদলে গিয়েছে–
ব্যয় কমেছে, কিন্তু বেড়েছে বাণিজ্যিকীকরণ।
প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
২০২৬ বিশ্বকাপ দিচ্ছে ভবিষ্যতের আরও একটি ইঙ্গিত। শুরু হয়েছে ‘ডায়নামিক প্রাইসিং’। এই বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতার আলোতে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে যে– ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’, ‘বিগ ডেটা’ এবং ‘ব্যক্তিগত তথ্য’ বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে সম্ভব হতে পারে একই ম্যাচের জন্য বিভিন্ন দর্শকের কাছে ভিন্ন-ভিন্ন মূল্য চাওয়া। বিমান সংস্থা ও হোটেল শিল্পে ‘ডায়নামিক প্রাইসিং’-এর ব্যবহার তো বহু দিনের। এখন ক্রীড়াজগতেও বাড়ছে সেই প্রবণতা। ইংল্যান্ডের প্রিমিয়ার লিগের কয়েকটি ক্লাব ইতিমধ্যেই সীমিত পরিসরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে ‘ডায়নামিক প্রাইসিং’ নিয়ে। যদি ফিফার এই মডেল আর্থিকভাবে সফল হয়, তাহলে হয়তো ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলও ধীরে ধীরে হঁাটতে পারে একই পথে। ফুটবল তখন আরও বেশি হয়ে উঠবে কর্পোরেট ভোগ্যপণ্য– সাধারণ মানুষের সামাজিক উৎসব নয়। অন্যান্য বড় খেলার প্রতিযোগিতা– যেমন: আইপিএলেও হয়তো জাঁকিয়ে বসতে পারে এই ‘ডায়নামিক প্রাইসিং’ বা পরিবর্তনশীল টিকিট মূল্যের কালচার।
এই বিশ্বকাপ দেখিয়ে দিচ্ছে, একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক ক্রীড়া-অর্থনীতি আর কেবল স্টেডিয়াম, টিকিট বা সম্প্রচার অধিকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
বিশ্বকাপ কখনওই শুধুমাত্র একটি ফুটবল প্রতিযোগিতা ছিল না। তা ছিল জাতীয় গর্ব, আন্তর্জাতিক পরিচয়, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং বৈশ্বিক উৎসবের প্রতীক। কিন্তু ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ সেই পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করেছে আর-একটি নতুন মাত্রা: তা হয়ে উঠেছে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের পরীক্ষাগার।
এই বিশ্বকাপ দেখিয়ে দিচ্ছে, একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক ক্রীড়া-অর্থনীতি আর কেবল স্টেডিয়াম, টিকিট বা সম্প্রচার অধিকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে মূল্য নির্ধারণ করছে অ্যালগরিদম, বাজারকে পরিচালনা করছে ডেটা, নীতি-নির্ধারণে প্রভাব ফেলছে কর্পোরেট স্বার্থ। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থাগুলি অনেক ছোট রাষ্ট্রের বার্ষিক বাজেটের সমান অর্থ নিয়ন্ত্রণ করছে।
তবু শেষ পর্যন্ত একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খেতেই থাকবে। ফুটবল কি এখনও সবার উপভোগের খেলা থাকতে পারবে? না কি এটি ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে এমন এক বিনোদনে, যার দরজা উন্মুক্ত কেবল উচ্চ আয়ের মানুষের জন্য? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো খুঁজতে হবে আগামী বহু বছর ধরে। কারণ, এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার বোধকরি মাঠে নির্ধারিত হওয়া বিশ্বচ্যাম্পিয়ন বা অন্যান্য বেশ কিছু দলের, কিছু ম্যাজিশিয়ান খেলোয়াড়ের আশ্চর্য সাফল্য কিংবা অবাক-করা ব্যর্থতা নয়– বরং বিশ্ব ক্রীড়া অর্থনীতির ভবিষ্যৎ কোন পথে এগবে, এবারের বিশ্বকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতা যেন তারই একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশ।
(মতামত নিজস্ব)
লেখক আইএসআই,
কলকাতার অধ্যাপক
appubabale@gmail.com
