স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে, বিশেষ করে বাঙালির ইতিহাসে, ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় যেন ক্রমশই হয়ে গেলেন এক উপেক্ষিত ধূসর পাণ্ডুলিপি। তাঁর মৃত্যুও মিশে রইল এক রহস্যময় আবরণে। ১৯৪৭ থেকে ২০২৬, দীর্ঘ ৭৯ বছরের অবজ্ঞা, অবহেলা, অনাদর, অস্বীকার এ বড় কম কথা নয়। তাই ভাবনার এই প্রেক্ষিত স্বাভাবিকভাবে তৈরি হয়েছে বাঙালির মনে, যেন নিঃশব্দ অথচ সুগঠিত ব্যবস্থাপনায় বাঙালির মনন ও চেতনা থেকে ড. শ্যামাপ্রসাদকে নির্বাসিত করা হয়েছে। বাঙালির স্বাধীনতা, অস্তিত্ব ও সংস্কৃতির ইতিহাস যে সমাদর ও আপ্যায়ন তাঁর প্রাপ্য ছিল, তা থেকে তিনি নির্মমভাবে বঞ্চিত।
বাংলার বিজেপি সরকারের আয়োজন ও উদ্যোগে ৬ জুলাই, গত সোমবার, ড. শ্যামাপ্রসাদের ১২৫ তম জন্মদিন পালন ঘুরিয়ে দিল ইতিহাসের অভিমুখ এবং শ্যামাপ্রসাদ দাঁড়ালেন নববীক্ষণের আলোয়। এই প্রথম তাঁর জন্মদিন সরকার-ঘোষিত ছুটির দিন বলেও চিহ্নিত হল।
কলকাতার মিলনমেলায় শ্যামাপ্রসাদ-স্মরণে পশ্চিমবঙ্গ সরকার আয়োজিত এক বৈকালিক অনুষ্ঠানে ওই দিনই দেশের প্রধানমন্ত্রী মনে করিয়ে দিলেন ক্রমে আমাদের জাতীয় স্মৃতিতে আবছা হয়ে আসা এই ঐতিহাসিক সত্য যে শ্যামাপ্রসাদ স্বপ্ন দেখেছিলেন এক অখণ্ড ভারতের। পশ্চিমবঙ্গ, জম্মু ও কাশ্মীর এখনও যে ভারতের অঙ্গ তার প্রেক্ষাপটে শ্যামাপ্রসাদের অনস্বীকার্য ভূমিকা যেন আমরা ভুলে না যাই। মোদি তাঁর ভাষণে বলেন, ১৯৪৭-এ বাংলাকে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করে তাকে পূর্ব পাকিস্তানের অঙ্গ করে দেওয়ার প্রচেষ্টা রুখে দিয়ে শ্যামাপ্রসাদ হুঙ্কার দিয়ে বলেন, কংগ্রেস দেশভাগ করেছে, আমি পাকিস্তান ভাগ করেছি।
উক্ত সভাতেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেন, শ্যামাপ্রসাদের জীবন উৎসর্গীত ছিল, ভারতের অখণ্ডতা রক্ষায়। যখন তিনি বুঝলেন, দেশভাগ অবধারিত, সেই বিপর্যস্ত সময়েও তিনি আগলে রাখেন পশ্চিমবঙ্গকে, পাকিস্তান হতে দেননি। এই কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার আগে অমিত শাহ যান ভবানীপুরে শ্যামাপ্রসাদের বাসভবনে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ জানাতে। এরপর যান ইকো পার্কে শ্যামাপ্রসাদের ১২৫ ফুট মূর্তির ভূমিপুজোয় উপস্থিত থাকতে।
বাঙালির জাতীয় সংস্কৃতির ক্ষেত্রে শ্যামাপ্রসাদের ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের এক নতুন পরত আমরা দেখতে পেলাম ভবানীপুর মিত্র ইনস্টিটিউশন-এ, যে-বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছিলেন তিনি। সেই বিদ্যালয়ের এক অনুষ্ঠানে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বলেন, পাঠ্যবইয়ে অবশ্যই শ্যামাপ্রসাদের অবদানের কথা থাকা উচিত। তিনি ঘোষণা করেন, আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে পশ্চিমবাংলার পাঠ্যপুস্তকে শ্যামাপ্রসাদের পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টি, রাষ্ট্রপ্রেম এবং অখণ্ড ভারতের ভাবনা, এইসব বিষয় যেন চর্চিত হয়, সেই প্রসঙ্গে লক্ষ্য রাখা হবে।
শ্যামাপ্রসাদের ফিরে আসা, উপেক্ষার অন্ধকার থেকে স্বীকৃতির সন্দীপনে তাঁর এই প্রত্যাবর্তন, বহন করে এক ঐতিহাসিক বার্তা যিনি স্বীকৃতির যোগ্য, ইতিহাস তাঁকে একদিন না একদিন বসাবেই মর্যাদার সিংহাসনে, অভিনন্দনের আলোয়।
