shono
Advertisement
Great Nicobar project

তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম! পুঁজির আস্ফালনে অসহায় নিকোবর, উদ্বিগ্ন পরিবেশপ্রেমীরা

বছর বছর ঘটা করে আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলন হচ্ছে, বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে দক্ষিণ গোলার্ধের অনুন্নত, স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো সেখানে নিজেদের উদ্বেগের ডালি উজাড় করে দিচ্ছে, অথচ কাজের কাজ হচ্ছে সামান্যই।
Published By: Amit Kumar DasPosted: 02:24 PM Jul 08, 2026Updated: 02:24 PM Jul 08, 2026

শাসক দলের ইচ্ছা যখন দেশের ইচ্ছায় পরিণত হয়, সরকার ও দেশ যখন সমার্থক হয়ে পড়ে, সরকার বিরোধিতার অর্থ যেখানে দেশ বিরোধিতা, উন্নয়নের নামে বৃহৎ পুঁজি সৃষ্টি যেখানে মুখ্য, সেখানে প্রকৃতি ও পরিবেশরক্ষার তাগিদ গৌণ হতে বাধ্য। ‘গ্রেট নিকোবর প্রকল্প’ সেই প্রবণতারই অংশ। লিখছেন, সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

Advertisement

বছর বছর ঘটা করে আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলন হচ্ছে, বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে দক্ষিণ গোলার্ধের অনুন্নত, স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো সেখানে নিজেদের উদ্বেগের ডালি উজাড় করে দিচ্ছে, অথচ কাজের কাজ হচ্ছে সামান্যই। রাষ্ট্রসংঘের উদ্যোগে আয়োজিত এই বার্ষিক সম্মেলনে বার বার দেখা যাচ্ছে, খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি। গত বছর ব্রাজিলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেশের আচরণ বুঝিয়ে দিয়েছে ক্ষমতাধরদের নদীর ঘাটে আনা গেলেও তাদের জলপানে বাধ্য করানো যাবে না। রাষ্ট্রসংঘ দিন দিন দুর্বল হচ্ছে। যত দিন যাচ্ছে প্রমাণিত হচ্ছে, সবলের কাছে তারা নিছকই কাগুজে বাঘ। আমেরিকা বা চিন কিংবা রাশিয়ার জেদের মুখে তারা লজ্জাবতী লতার মতো গুটিয়ে থাকে– তা সে ইউক্রেন বা গাজার যুদ্ধ বন্ধ অথবা জলবায়ু সম্মেলন, সমস্যা যা-ই হোক না কেন। নির্দ্বিধায় তাই বলা যায়, রাষ্ট্রসংঘের উদ্যোগে এই বার্ষিক সম্মেলন, যার পোশাকি নাম ‘কনফারেন্স অফ দ্য পার্টিজ’ বা সংক্ষেপে ‘কপ’, এই বছরের নভেম্বরে যার ৩১তম আসর বসতে চলেছে ভূমধ্যসাগর তীরবর্তী তুরস্কের ছবির মতো শহর আন্তালিয়ায়, বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের পরিবেশ রক্ষার নামে সেখানেও মণ-মণ তেল হয়তো পুড়বে, কিন্তু রাধা নাচবে না।

নিবন্ধের শুরুতে এই গৌরচন্দ্রিকার কারণ আমাদের দেশের ‘গ্রেট নিকোবর প্রকল্প’ বিতর্ক। যে-দেশ গ্লোবাল সাউথের নেতৃত্ব দিচ্ছে, পরিবেশ রক্ষায় ফি-বছর ‘কপ’ সম্মেলনে গিয়ে যে-দেশ উত্তর গোলার্ধের প্রতিনিধিদের আরও বেশি করে উপুড়হস্ত হওয়ার জোরালো দাবি জানায়, এই প্রকল্প বাস্তবায়নে সেই দেশের সরকারের তাগিদ বিস্ময়কর। আরও বিস্ময়ের এই যে, রাজনৈতিক দল হিসাবে কংগ্রেস এবং পরিবেশ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি ও সংগঠন ছাড়া আর কাউকে এই সম্ভাব্য বিপর্যয় নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে দেখা যাচ্ছে না! নিরাপত্তা ও উন্নয়নের দোহাই দিয়ে সর্বনাশ কী ভয়ংকর হতে পারে তা দেখতে এপ্রিল মাসের শেষ সপ্তাহে রাহুল গান্ধী আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে গিয়েছিলেন। গ্রেট নিকোবর, যেখানে ১৬ হাজার ৬১০ হেক্টর (১ হেক্টর মানে প্রায় সাড়ে ৭ বিঘা) জমির উপর বিপুল এই উন্নয়ন যজ্ঞ হওয়ার কথা, সেই এলাকা তিনি ঘুরেছেন। স্থানীয় মানুষজনের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁদের উদ্বেগ শুনেছেন এবং দিল্লি ফিরে প্রকল্পের বিরোধিতা করেছেন। কিন্তু ওই যে বললাম, আর কোনও বিরোধী দলকে সে নিয়ে এখনও উচ্চকিত হতে দেখা গেল না!

বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের পরিবেশ রক্ষার নামে সেখানেও মণ-মণ তেল হয়তো পুড়বে, কিন্তু রাধা নাচবে না।

রাহুল গান্ধী ও তাঁর দল কংগ্রেস এই প্রকল্পের বিরোধিতাই শুধু করেনি, লোকসভার বিরোধী নেতা একেবারে সরাসরি বলেছেন, এই মেগা প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য দেশের প্রতিরক্ষা বা স্ট্র‍্যাটেজিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা নয়, বিজেপি সরকার এটা করতে চাইছে শিল্পপতি গৌতম আদানির বাণিজ্যিক স্বার্থে। ৫ জুন, বিশ্ব পরিবেশ দিবসের দিন এই অভিযোগ করার পাশাপাশি রাহুল এক অনলাইন আবেদনে সবাইকে সই করতে অনুরোধ করেছেন। আবেদনের শিরোনাম, ‘লোভ বা মুনাফা নয়, আসুন আমরা সবুজের পক্ষে দাঁড়াই।’

গ্রেট নিকোবর প্রকল্পের জনক ভারতের নীতি আয়োগ। তাদের প্রস্তাব, নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের শেষাংশ, যার পোশাকি নাম ‘ইন্দিরা পয়েন্ট’, সেই তল্লাট ঘিরে একটা সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ হাতে নেওয়া দরকার। এই প্রকল্প তাদের কথায় এক ‘হোলিস্টিক ডেভেলপমেন্ট’, যার মাধ্যমে অনেক ধরনের প্রয়োজন মিটবে। যেমন, সেখানে গড়ে তোলা হবে এক বিশাল ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর, যেখানে থাকবে আন্তর্জাতিক কন্টেনার ট্রান্সশিপমেন্ট টার্মিনাল। তৈরি হবে এক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। গড়ে তোলা হবে সাড়ে ৬ লাখ মানুষের থাকার উপযোগী নতুন এক শহর, যা দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আকর্ষণ করবে। তৈরি হবে প্রতিরক্ষা পরিকাঠামো, দূষণমুক্ত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, এই উন্নয়ন হবে টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।

সরকারের দাবি, এই প্রকল্প রূপায়ণের একটা বড় তাগিদ হল দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করা। বলা হচ্ছে, এর ফলে বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরে ভারতীয় নৌবাহিনীর উপস্থিতি ও নজরদারি বেড়ে যাবে। মালাক্কা প্রণালীর কাছে অবস্থানের ফলে ওই প্রকল্প হয়ে উঠবে এক প্রধান মেরিটাইম হাব, যেখানে ভারতীয় নৌবাহিনী অনেক সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারবে। বহিরাগত শক্তির মোকাবিলা করা সহজতর হবে। গ্রেট নিকোবর দ্বীপ থেকে মালাক্কা প্রণালীর দূরত্ব মাত্র ৯০ কিলোমিটার। ফলে মালাক্কা দিয়ে চলাচলকারী সব বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজের উপর নজরদারি রাখা যাবে। বিমানবন্দরটি তৈরি করা হবে সামরিক ও বেসামরিক দুই ধরনের প্রয়োজন মাথায় রেখে।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা, ধ্বংস হবে ১ থেকে ১.৫ কোটি গাছ। এর ফলে শেষ হয়ে যাবে ট্রপিকাল রেনফরেস্ট যা কার্বন শোষণ করে, বৃষ্টির চক্র নিয়ন্ত্রণ করে ও ঝড়-ঝঞ্ঝার হাত থেকে দ্বীপপুঞ্জকে রক্ষা করে।

মোদ্দা কথা, চিন ও পাকিস্তানের মোকাবিলা করা যাবে আরও ভালভাবে। সমুদ্র পথ সুরক্ষিত করা যাবে। কিন্তু এসবের জন্য অনেক দামও দিতে হবে পরিবেশকে ও ওই তল্লাটে বসবাসকারী মানুষজনদের। গ্রেট নিকোবর শুধু এক দ্বীপ নয়, সেটা এক অতি সংবেদনশীল জীববৈচিত্রের ভাণ্ডার। সেখানে রয়েছে বিশ্বের প্রাচীনতম ট্রপিকাল রেনফরেস্ট যা বিপন্ন প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল, লেদারব্যাক কচ্ছপের আশ্রয়স্থল ও প্রবাল প্রাচীর। প্রকৃতি সেখানে সুনামির প্রবণতা ঠেকিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে ‘শম্পেন’ ও ‘নিকোবরিজ’ জনজাতিদের। এই দ্বীপ ‘ইউনেস্কো বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ’ হিসাবে স্বীকৃত।

প্রতিরক্ষা ও উন্নয়নের স্বার্থে সরকারি হিসাবে সেখানে ১০ লাখ গাছ উৎপাটিত হবে। যদিও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা, ধ্বংস হবে ১ থেকে ১.৫ কোটি গাছ। এর ফলে শেষ হয়ে যাবে ট্রপিকাল রেনফরেস্ট যা কার্বন শোষণ করে, বৃষ্টির চক্র নিয়ন্ত্রণ করে ও ঝড়-ঝঞ্ঝার হাত থেকে দ্বীপপুঞ্জকে রক্ষা করে। ওই এলাকা লেদারব্যাক কচ্ছপের অভয়াশ্রম। উন্নয়নের ফলে তারা বিপন্ন হবে। ধ্বংস হবে প্রবাল প্রাচীর ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র। স্থানীয় জনজাতিরা দ্রুত এগিয়ে যাবে বিলুপ্তির পথে। প্রকল্পের খরচ ৭০ থেকে ৯২ হাজার কোটি টাকা। শেষ হতে হতে তা ১ লাখ কোটি ছাড়াবে। রাহুলের অভিযোগ, প্রকল্পটি করা হচ্ছে আদানিদের স্বার্থে। কারণ, বন্দর নির্মাণের জন্য আদানি গোষ্ঠী আগ্রহপত্র জমা দিয়েছে। তারা সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে আগ্রহী। বিমান বন্দর তৈরি ও পরিচালনায় তারা দক্ষ। ইদানীং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও তাদের আগ্রহ বেড়েছে। এক দশকের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, আদানি গোষ্ঠীর দৃষ্টি যেখানে পড়ে, তা কখনও অধরা থাকে না।

রাহুলকে ‘চিনের দালাল’ ও ‘মার্কিন ধনকুবের জর্জ সোরসের দাক্ষিণ্যভোগী’ সাজিয়ে বিজেপি বলছে, উনি সরব কারণ এতে চিনের সামরিক স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। রাহুলকে নিয়ে এই প্রচার অনেকদিনের প্যাটার্ন।

শাসক দল এক দশক ধরে যা করে চলেছে, এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটছে না। রাহুলকে ‘চিনের দালাল’ ও ‘মার্কিন ধনকুবের জর্জ সোরসের দাক্ষিণ্যভোগী’ সাজিয়ে বিজেপি বলছে, উনি সরব কারণ এতে চিনের সামরিক স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। রাহুলকে নিয়ে এই প্রচার অনেকদিনের প্যাটার্ন। উন্নয়ন প্রকল্পকে নিরাপত্তার সঙ্গে জুড়ে দাও। যার বিরোধিতা করবে তাদের ‘দেশদ্রোহী’ দাগিয়ে দাও। সরকারি ইচ্ছার কাছে বিরোধীরা যেখানে অসহায়, বিচার বিভাগ সেখানে ত্রাতা মধুসূদন হতে পারে। কিন্তু এক দশক ধরে সেখানেও বিচিত্র স্খলন! উন্নয়নের নামে আরাবল্লি পর্বতমালা সর্বনাশের শেষ প্রান্তে পৌঁছে যাওয়ার পর তার ভাগ্য এখন ঝুলে রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের উপর। চারধাম যাত্রা সুগম করতে হিমালয়ের বারোটা বাজিয়ে চার লেনের রাস্তা তৈরির অনুমতি কেন্দ্র আদায় করেছে ওই নিরাপত্তার যুক্তি খাড়া করেই। প্রকৃতি নিয়ম করে তার শোধ নিচ্ছে। গ্রেট নিকোবর নিয়ে যাবতীয় বিরোধিতাও সাগরের জলে ভেসে যাবে। সর্বনাশ কেউ ঠেকাতে পারবে না। এটাই ভবিতব্য।

শাসক দলের ইচ্ছা যখন দেশের ইচ্ছায় পরিণত হয়, সরকার ও দেশ যখন সমার্থক হয়ে পড়ে, সরকার বিরোধিতার অর্থ যেখানে দেশ বিরোধিতা, উন্নয়নের নামে বৃহৎ পুঁজি সৃষ্টি যেখানে মুখ্য, সেখানে প্রকৃতি ও পরিবেশরক্ষার তাগিদ গৌণ হতে বাধ্য। গ্রেট নিকোবর প্রকল্প সেই প্রবণতারই অংশ। এই সর্বনাশ ঠেকানোর ক্ষমতা কারও একার কম্ম নয়।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement