মাদক বা শুকনো নেশার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনিবার্য বিপর্যয়, অনিশ্চিত অসহায় অন্ধকার, গভীর বেদনার অনুষঙ্গ। সংসার, সমাজ, জীবনের চরমতম শত্রু মাদক। এ কথা আমরা জানি না, তা নয়। অথচ এই দুঃসংবাদ সত্য, রাজ্যে ক্রমে বাড়ছে মাদকের পাচার ও গোপন বিক্রি এবং শুকনো নেশার সংক্রাম। মাদকের বিপর্যয়ে আক্রান্ত হচ্ছে রাজ্যের তরুণ প্রজন্মের একাংশ। এবং তাদের এই পথে নিয়ে যাচ্ছে ড্রাগ পাচারকারীদের প্রসারিত ভয়ংকর চক্র। খবরে প্রকাশ: বিশেষ করে মালদা, মুর্শিদাবাদ, এবং ২৪ পরগনার সীমান্ত অঞ্চল বাংলায় মাদক প্রবেশের একটি পথ তো বটেই। এছাড়া উত্তরবঙ্গ, অসম, মণিপুরেও পাওয়া
গিয়েছে এই রাজ্যে মাদক পাচারের রুট।
সম্প্রতি রাজ্য পুলিশের বিশেষ টাস্ক ফোর্স এবং পুরুলিয়া জেলা পুলিশের তৎপরতায় ধরা পড়েছে বেলকুড়ি টোল প্লাজার কাছে মিনি ট্রাক থেকে ৩২২ কেজি গাঁজা। এবং গ্রেপ্তার হয়েছে ৭ জন আন্তঃরাজ্য মাদক পাচারকারী। যেসব মাদকের পাচার ও মারাত্মক নেশা ছড়িয়ে পড়ছে রাজ্যে, তাদের মধ্যে রয়েছে-ব্রাউন সুগার, ইয়ারা ট্যাবলেট, কোকেন, হেরোইন। সবথেকে জরুরি প্রশ্ন: এসব মাদক বিক্রির কোটি কোটি 'অবৈধ' টাকা যাচ্ছে কোথায়? উত্তর: এই টাকাই ভারতের বিভিন্ন জায়গায় 'টেরর ফান্ডিং'-এ খরচ হচ্ছে। অর্থাৎ, মাছের তেলে মাছ ভাজা। এই প্রসঙ্গে মনে পড়তে পারে, কয়েক বছর আগে গুজরাটের মুদ্রা বন্দর থেকে প্রায় ৩ হাজার কেজি মাদক বাজেয়াপ্ত হওয়ার খবর। সেই মাদকচক্রের সঙ্গে পহেলগাঁওয়ে জঙ্গিহানার যোগ পেয়েছিলেন এনআইএ-এর তদন্তকারীরা।
মাদকের পাল্লায় পড়ে যারা নরকের অন্ধকারে, তাদের স্বাভাবিক যাপনে ফিরিয়ে আনতে উপযুক্ত রিহ্যাব সেন্টারও গড়ে তুলতে হবে সরকারকে।
এই মুহূর্তের জরুরি সুখবর হল, এই রাজ্যে বেআইনি মাদকের চোরা কারবার বন্ধ করতে 'অ্যান্টি নারকোটিক্স টাস্ক ফোর্স' (এএনটিএফ) গড়ার সিদ্ধান্তে সিলমোহর দিয়েছে রাজ্য মন্ত্রিসভা। এই বিশেষ বাহিনীর দায়িত্ব শুধু মাদক সংক্রান্ত অপরাধের তদন্ত নয়, বিভিন্ন ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই ধরনের অপরাধের মূল চক্রীদের শিকড় ও মাথা পর্যন্ত পৌঁছনো।
মাদক সংক্রান্ত অপরাধের তদন্তের জন্য তো কেন্দ্রীয় সরকারের 'নারকোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরো' (এনসিবি) আছেই। কিন্তু গত কয়েক বছরে মাদক পাচারের সংগঠিত অপরাধ এতটাই বেড়েছে যে, এবার তেলঙ্গানা মডেলে 'এএনটিএফ' গড়ার সিদ্ধান্ত নিল রাজ্য সরকার। অর্থাৎ মাদক অপরাধ ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে এই রাজ্যেও নামতে চলেছে 'ঈগল ফোর্স'।
তবে এইখানেই শেষ কথা নয়। যারা ইতিমধ্যেই ড্রাগ বিপর্যয়ের শিকার, তাদের কথা ভুলে গেলে চলবে না। মাদকের পাল্লায় পড়ে যারা নরকের অন্ধকারে, তাদের স্বাভাবিক যাপনে ফিরিয়ে আনতে উপযুক্ত রিহ্যাব সেন্টারও গড়ে তুলতে হবে সরকারকে। আর আমাদের মনে রাখতে হবে অলডাস হাক্সলির লেখা 'গেটস টু হেভেন অ্যান্ড হেল' বইয়ে ড্রাগ নিয়ে শেষকথা- মাদক কিছুক্ষণ স্বর্গের দরজায় আমাদের নিয়ে গিয়ে খুলে দেয় অনন্ত নরকের দরজা। সেই কৃষ্ণগহবর থেকে মুক্তি সহজ নয়।
