‘দি অরিজিন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফ দি বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ’ রচনা করে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় জাতি রূপে বাঙালিকে মহিমান্বিত করেছেন। শুধু বাংলা নয়, নব্য ভারতীয় আর্য ভাষার আলোচনাতেও ‘ও-ডি-বি-এল’ তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রেখেছে। এই মহাগ্রন্থটি এবার শতবর্ষ পূরণ করল। লিখেছেন মানস ভট্টাচার্য।
ভাষাতত্ত্বের নিয়মতান্ত্রিক শাখায় বাংলা ভাষার ইতিহাস অনুসন্ধানের আকর গ্রন্থ ১৯২৬ সালে প্রকাশিত ‘দি অরিজিন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফ দি বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ’ সংক্ষেপে ‘ও-ডি-বি-এল’ বিভিন্ন ভাষার ভাষাতাত্ত্বিকদের কাছে ধর্মগ্রন্থ বললে অতিশয়োক্তি হয় না! ইংরেজি ভাষায় রচিত বইটিতে লেখক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তঁার মাতৃভাষা বাংলারই প্রাচীন ইতিহাস অনুসন্ধান করেছেন। এখন থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে যেখানে এমন একটি কালজয়ী কাজের পরিকল্পনা করাও ছিল দুঃসাধ্য, সেখানে তিনি তা সফলভাবে রূপায়ণ করেছিলেন।
প্রকৃতপক্ষে ‘ও-ডি-বি-এল’ শুধুমাত্র বাংলা ভাষার ইতিহাস নয়, এটি নব্য ভারতীয় আর্য ভাষারও সামগ্রিক ইতিহাস। বাংলা ভাষার ইতিহাসের সঙ্গে অসমিয়া, ওড়িয়া, মৈথিলি, হিন্দি, গুজরাতি, মারাঠি ইত্যাদি যাবতীয় ভারতীয় ভাষার ইতিহাসেরও সুলুকসন্ধান। পৃথিবীতে অপর কোনও দেশের ভাষার এত তথ্যসমৃদ্ধ ও বিপুলায়তন ইতিহাস লেখা হয়নি বলেই মনে হয়।
১৯২১ সালে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাপত্র ‘ও-ডি-বি-এল’-এর পুনর্লিখন, পুনর্বিন্যাস ও পরিবর্ধন হয়ে রূপ নিয়েছিল এখনকার ‘ও-ডি-বি-এল’।
কালজয়ী সেই গ্রন্থ
প্রকৃতপক্ষে ‘ও-ডি-বি-এল’ শুধুমাত্র বাংলা ভাষার ইতিহাস নয়, এটি নব্য ভারতীয় আর্য ভাষারও সামগ্রিক ইতিহাস। বাংলা ভাষার ইতিহাসের সঙ্গে অসমিয়া, ওড়িয়া, মৈথিলি, হিন্দি, গুজরাতি, মারাঠি ইত্যাদি যাবতীয় ভারতীয় ভাষার ইতিহাসেরও সুলুকসন্ধান।
আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের ঐকান্তিক সহযোগিতায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এই বৃহৎ বইটি প্রকাশের দায়িত্ব নেয়; প্রকাশে সময় লাগে প্রায় ৩ বছর। নানা প্রতিকূলতা কাটিয়ে ১৯২৬ সালে বইটি যখন প্রকাশিত হয়, তখন ‘স্যর’ আশুতোষ মুখোপাধ্যায় প্রয়াত হয়েছেন, তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সে-সময় বাংলা ভাষায় স্ব-মহিমায় বিরাজিত। সুলিখিত এই বইয়ের জন্য তিনি সুনীতিকুমারকে ‘ভাষাচার্য’ আখ্যা দেন। বইটি কেবল বাংলা ভাষার উৎস এবং ইতিহাসের অনুসন্ধান নয়, প্রাচীন থেকে আধুনিক কালের ভাষার বিবর্তনেরও বিস্তৃত আলোচনা। ভাষার ইতিহাস-আলোচনা ও ধ্বনিতত্ত্ব– ভাষাতত্ত্বের এই দু’টি জায়গার আলোচনায় ‘ও-ডি-বি-এল’ অনন্য। বইটির জন্য জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ার্সন সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়কে ‘নব্য-পাণিনি’ বলে অভিহিত করেছিলেন।
কলকাতায় ‘স্যর’ উইলিয়াম জোন্সের দেওয়া একটি বক্তৃতার সূত্র ধরে আধুনিক ভাষাতত্ত্বের সুস্পষ্ট একটি ধারণা তৈরি হয়, এবং পরবর্তী সময়ে জার্মান ভাষাবিজ্ঞানীদের আলোচনায় তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের আলোচনার পথ প্রশস্ত হয়। তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের ধারণার প্রেক্ষিতেই আবার ঐতিহাসিক ভাষাতত্ত্বের ভিত প্রস্তুত হয়। ঐতিহাসিক ভাষাতত্ত্বের চর্চার ফলে কিছু জার্মান নব্য-বৈয়াকরণিকরা ভেবেছিলেন যে, ভাষা বিবর্তনের সমস্ত নিয়ম তঁারা আবিষ্কার করে ফেলেছেন। ভাষাতত্ত্বের ক্ষেত্রে আর নতুন করে কিছু বলার কথা নেই।
বইটি কেবল বাংলা ভাষার উৎস এবং ইতিহাসের অনুসন্ধান নয়, প্রাচীন থেকে আধুনিক কালের ভাষার বিবর্তনেরও বিস্তৃত আলোচনা। ভাষার ইতিহাস-আলোচনা ও ধ্বনিতত্ত্ব– ভাষাতত্ত্বের এই দু’টি জায়গার আলোচনায় ‘ও-ডি-বি-এল’ অনন্য।
এর কিছু সময় পরে ভাষাতত্ত্বের ক্ষেত্রে বর্ণনামূলক ধ্বনিতত্ত্বের আলোচনার নতুন একটি ধারণা তৈরি হয়। এই বর্ণনামূলক ধ্বনিতত্ত্ব বলতে আমরা এখন ঠিক যা বুঝি, ‘ও-ডি-বি-এল’-এ বর্ণিত ধ্বনিতত্ত্বের সামান্য প্রভেদ আছে, ‘ও-ডি-বি-এল’-এ বর্ণিত ধ্বনিতত্ত্ব একইসঙ্গে ধ্বনিতত্ত্ব ও স্বনিমতত্ত্ব। এতে বাংলা ভাষায় কী কী ‘স্বনিম’ ব্যবহার হয় তার বিবরণ যেমন আছে, তেমনই সেগুলির উচ্চারণগত লক্ষণও অত্যন্ত বিশদে বর্ণিত হয়েছে। তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক ভাষাতত্ত্বের ধারাবাহিকতা রক্ষা করেই সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ১৯২৬ সালে তঁার ‘ও-ডি-বি-এল’ প্রকাশ করেন। অন্বয় সম্বন্ধে আলোচনা না থাকলেও ‘ও-ডি-বি-এল’ গ্রন্থে ধ্বনি পরিবর্তন এবং পদ পরিবর্তনের যথাযথ নিয়ম এমন সুনির্দিষ্টভাবে ব্যক্ত হয়েছে যা পৃথিবীতে সুনির্দিষ্ট ভাষার যত ইতিহাস লেখা হয়েছে তার মধ্যে সম্ভবত সর্বোত্তম।
বিভিন্ন সময় ভাষাতত্ত্বে নানা দৃষ্টিভঙ্গির প্রবেশ ঘটেছে, ভাষাবিজ্ঞানী সোস্যুরের তত্ত্বের প্রেক্ষিতে ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের পাশাপাশি ভাষাবিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নতুন তত্ত্ব গড়ে উঠেছিল। সোস্যুরের বর্ণনামূলক ভাষাতত্ত্বের আলোচনার প্রেক্ষিতে পৃথিবীর ভাষাতত্ত্ব চর্চার মানচিত্রে তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক ভাষাতত্ত্ব ক্রমশ সরে যেতে থাকল। আরও পরে চমস্কি প্রবর্তিত নতুন ভাষাচিন্তার আবির্ভাব হয়েছিল। আপাতদৃষ্টিতে এই মতবাদগুলিকে একে অপরের প্রতিপক্ষ বলে মনে হলেও মানবভাষার মূলসূত্রগুলি কিন্তু আদতে এক, আসলে ভাষার প্রাণ তার সচল ব্যবহারের মধ্যেই রয়েছে, আর এরা প্রত্যেকেই ভাষার সেই ব্যবহারগত দিকটি যথাযথভাবে ধরতে সক্ষম হয়েছিলেন।
‘ও-ডি-বি-এল’ বইয়ে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও অগ্রগতির ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেছেন। গ্রন্থে আলোচনা করা হয়েছে, বাংলা ভাষা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত ইন্দো-ইরানীয় বা আর্য ভাষা-উপগোষ্ঠীর শাখার অন্তর্ভুক্ত। মাগধি অপভ্রংশ এর উৎস হলেও সংস্কৃত, প্রাকৃত, দ্রাবিড়ীয়, আরবি, ফারসি, পর্তুগিজ, ইংরেজি ইত্যাদি নানা ভাষার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অবদান নিয়েই বাংলা ভাষার সমৃদ্ধি এবং ধ্বনি, বর্ণমালা ও লিপির ইতিবৃত্তও গ্রন্থে সঠিকভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। ধ্বনিতত্ত্বের যুক্তিযুক্ত আলোচনা-সহ ৮টি অধ্যায় জুড়ে দেশি-বিদেশি নানা ভাষার তুলনামূলক প্রভাব বিস্তারিত আলোচিত হয়েছে। দ্বিতীয় খণ্ডের পঁাচ অধ্যায় জুড়ে বাংলা ভাষার রূপতত্ত্ব, প্রত্যয়, বিভক্তি, উপসর্গ তাদের উৎস ও পরিণতি নিয়ে যেমন বিস্তারিত আলোচিত হয়েছে, তেমনই বিশেষ্য, সর্বনাম, শ্বাসাঘাত ও ছন্দ নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে। তৃতীয় খণ্ডটি লেখা হয়েছিল মূলত দ্বিতীয় খণ্ডের সংযোজনী ও সংশোধনী হিসাবে। প্রথম প্রকাশের প্রায় ৪৫ বছর পরে, ১৯৭১ সালে দুই খণ্ডের সঙ্গে অতিরিক্ত এই তৃতীয় খণ্ড জুড়ে ‘ও-ডি-বি-এল’ পুনরায় প্রকাশিত হয়।
যে বই পরবর্তী সময়ে যেকোনও ভাষার ভাষাতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে। ‘ও-ডি-বি-এল’ প্রকাশিত হওয়ার দু’বছর পরে ঐতিহাসিক ভাষাতত্ত্বে এক গুরুত্বপূর্ণ নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। ভাষাবিজ্ঞানী সোস্যুরের ভাষাবিজ্ঞানের আলোচনার বিষয়গুলি সুনীতিকুমার তঁার ‘ও-ডি-বি-এল’ বইটিতে সরাসরি গ্রহণ না করলেও ধ্বনিতত্ত্ব অধ্যায়ে বাংলা ভাষার বিভিন্ন স্তর এবং ধ্বনি পরিবর্তনের খুঁটিনাটি বিষয়গুলি নিয়ে তিনি যে আলোচনা করেছেন তা সত্যিই অভিনব। ভাষাবিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে নানান তত্ত্বের উদ্ভাবন হলেও প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষা, নব্য ভারতীয় আর্য ভাষার আলোচনায় ‘ও-ডি-বি-এল’ গ্রন্থটির অবদান গুরুত্বপূর্ণ।
ক্রমবিবর্তনের ধারাপথে যে বাংলা ভাষার গৌরব বৃদ্ধি করেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর– সেই ভাষার উৎস ও অগ্রগতির অনুপুঙ্খ ইতিহাস রচনা করে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় জাতি রূপে বাঙালিদের মহিমান্বিত করেছেন। সমগ্র বিশ্বের ভাষাতাত্ত্বিকদের কাছে, বাংলা ভাষার ভাষাতত্ত্বের ধর্মগ্রন্থ শততম বর্ষে পা দেওয়া ‘ও-ডি-বি-এল’ বইটি সঠিক অর্থেই বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়ের নির্ভরযোগ্য দলিল।
(মতামত নিজস্ব)
