কণ্ঠস্বরে লুকিয়ে বিপুল তথ্য। শরীর-মনের স্বাস্থ্য, সাংস্কৃতিক পটভূমি, শিক্ষার স্তর, রাজনৈতিক ঝোঁক! যন্ত্র সেসবকে ভুল হাতে দিলে সর্বনাশ!
প্লেটো ও অ্যারিস্টটল কণ্ঠস্বরকে মানুষের চরিত্র, আবেগ, অন্তর্জগতের প্রতিফলন রূপে দেখেছেন। আমরা ক্লান্ত কি না, ভীত কি না, প্রেমে পড়েছি কি না– এসব অনেক সময়ই মুখের বলা ভাষার চেয়ে কণ্ঠের সূক্ষ্ম ওঠা-নামার মধ্য দিয়ে ফঁাস হয়ে যায়। কিন্তু এই প্রযুক্তির যুগে প্রশ্নটা অন্যরকম– আমাদের কণ্ঠস্বর কি এখন ব্যক্তিগত তথ্যের খনি? এখন আমরা শুধু ফোনে কথাই বলি না, আমাদের ঘর, গাড়ি, সর্বত্র শব্দগ্রহণ যন্ত্র আমাদের দৈনিন্দিন জীবনের সঙ্গী। স্মার্ট স্পিকার, ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট, টিভি রিমোট, এমনকী বহু ক্ষেত্রে রান্নাঘরের বৈদ্যুতিন যন্ত্রপাতিও এখন শব্দে সাড়া দেয়। অনেকগুলিতে আবার তথাকথিত ‘অলওয়েজ লিসনিং’ ব্যবস্থা আছে। অর্থাৎ আপনি সরাসরি নির্দেশ না-দিলেও তারা আশপাশের ‘শব্দ’ পর্যবেক্ষণ করে, কোনও ‘ট্রিগার’ শব্দ পেলেই সক্রিয় হয়। সমস্যা এখানেই।
বিজ্ঞানীরা এখন বলছেন, কণ্ঠস্বরের ভিতরে লুকিয়ে থাকে বিপুল তথ্য। কী সেই তথ্য? আপনার শারীরিক স্বাস্থ্য, মানসিক অবস্থা, সামাজিক-সাংস্কৃতিক পটভূমি, শিক্ষার স্তর, এমনকী রাজনৈতিক ঝোঁকও আন্দাজ করা সম্ভব হতে পারে আপনার কণ্ঠস্বরে। একজন মানুষ কথা বললেই তার উচ্চারণ, টোন, গতি, থেমে-থেমে বলা, শব্দবাছাই– সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক ধরনের ‘ভোকাল ফিঙ্গারপ্রিন্ট’। কম্পিউটার এই সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্যগুলি বিশ্লেষণ করতে মানুষের চেয়েও অনেক বেশি দক্ষ হয়ে উঠছে। অর্থাৎ, আপনি সোশ্যাল মিডিয়ায় চূড়ান্ত সাবধানতা অবলম্বন করলেও রেহাই নেই। আপনার গোপনীয়তা মোটেই নিরাপদ নয়।
বিপদ কোথায়? এই তথ্য যদি ভুল হাতে যায়, তাহলে সেটি বিভিন্নভাবে ব্যবহার হতে পারে। যেমন: আপনার বিমার প্রিমিয়াম বাড়াতে, আপনার আবেগ বুঝে বিজ্ঞাপন সাজাতে, চাকরির জন্য আপনাকে বাছাই বা বাতিল করতে, এমনকী হয়রানি, নজরদারি বা ব্ল্যাকমেলের মতো অপরাধেও এই তথ্য ব্যবহার হতে পারে। অর্থাৎ, আপনি কী বলছেন তার চেয়েও বড় হয়ে উঠছে– আপনি কীভাবে বলছেন। প্রযুক্তি যে-গতিতে আগুয়ান, সুরক্ষা তার ধারে-কাছেও নেই। ভয়েস প্রযুক্তি দ্রুত উন্নত হচ্ছে, কিন্তু গোপনীয়তা রক্ষার নিয়ম ও কাঠামো সেই গতিতে এগচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রেই ডিভাইস ভুলবশত ব্যক্তিগত কথা রেকর্ড করে ফেলে। ‘শেয়ার’ করা ডিভাইসে একজনের তথ্য অন্যজনের সামনে ফঁাস হয়ে যেতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগের– মানুষ অনেক সময় জানেই না তার কণ্ঠ থেকে কত তথ্য বেরিয়ে যাচ্ছে। আমরা ভাবি, আমরা শুধু কথা বলছি; কিন্তু যন্ত্র শুনছে তার চেয়ে অনেক বেশি।
গবেষকরা কিছু সম্ভাব্য রক্ষার পথ দেখাচ্ছেন। কণ্ঠস্বর বিকৃত বা আংশিক গোপন করে প্রেরণ, শুধু প্রয়োজনীয় তথ্য রেখে বাকি অংশ বাদ দেওয়া, কণ্ঠ থেকে শব্দ, পরিচয়, আবেগ– এসব আলাদা করার চেষ্টা, সর্বোপরি এনক্রিপশনের ব্যবহার। দায়বদ্ধতা থাকতে হবে এসব সরঞ্জাম উৎপাদনকারী সংস্থারও। এমন ‘সিস্টেম’ তৈরি করা জরুরি, যা ব্যক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করবে না, শুধু কাজ করে যাবে কাজের নিয়মে।
