shono
Advertisement

বহুত্বকে সংকুচিত করে 'আমিষ বনাম নিরামিষ'-এর লড়াই আসলে বাংলার নিজস্ব ইতিহাসকেই অস্বীকার করা

নিরামিষ বা আমিষ- কোনওটিকেই ভারতীয় সংস্কৃতির একমাত্র 'স্বাভাবিক' বা 'শুদ্ধ খাদ্যরীতি' বলে দেগে দেওয়া যায় না।
Published By: Biswadip DeyPosted: 01:41 PM Sep 15, 2026Updated: 01:41 PM Sep 15, 2026

বাঙালির পাতে কী থাকবে- তা নির্ধারিত হয়েছে প্রকৃতি, ভূগোল, ইতিহাসের উপর ভিত্তি করে। ধর্ম বা সামাজিক পরিচয়ের প্রশ্নে নয়।

Advertisement

আমিষ, না, নিরামিষ খাদ্যাভ্যাসের এই বিতর্কটিকে সম্প্রতি ধর্ম এবং সামাজিক পরিচয়ের প্রশ্নে পরিণত করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অথচ, বাংলার খাদ্য সংস্কৃতির ইতিহাস বলছে, বাঙালির পাতে কী থাকবে, তা অনেকাংশেই নির্ধারিত হয়েছে প্রকৃতি, ভূগোল, খাদ্যের প্রাপ্যতা, অর্থনীতি এবং সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে। ফলে, বাঙালির খাদ্যাভ্যাসকে কোনও একটি মাত্র ধর্মীয় বা সামাজিক ছাঁচে ফেলে দেখা যেমন ঐতিহাসিকভাবে ভুল, তেমনই আমিষ খাওয়াকে বাঙালির চিরন্তন পরিচয় বলে দাবি করাও অতিসরলীকরণ।

জনগণনা সংক্রান্ত পরিসংখ্যানের উল্লেখ করে সূত্র বলছে, দেশের সবচেয়ে বেশি আমিষভোজী জনগোষ্ঠীর অন্যতম হল বাঙালিরা প্রায় ৯৯ শতাংশ বাঙালি মাছ ও মাংস খায়, অর্থাৎ আমিষাশী। অন্ধ্রপ্রদেশ, ওড়িশা এবং কেরলেও আমিষভোজীর হার অত্যন্ত বেশি। অন্যদিকে, রাজস্থানে আমিষভোজীর হার তুলনামূলকভাবে অনেক কম। এই 'পার্থক্য' আসলে সেই সত্য যে, মানুষের খাদ্যাভ্যাস অনেকটাই নির্ভর করে সে কোথায় বসবাস করে, চারপাশে কী খাবার সহজে পাওয়া যায় তার উপর।

বাঙালির খাদ্যাভ্যাসকে কোনও একটি মাত্র ধর্মীয় বা সামাজিক ছাঁচে ফেলে দেখা যেমন ঐতিহাসিকভাবে ভুল, তেমনই আমিষ খাওয়াকে বাঙালির চিরন্তন পরিচয় বলে দাবি করাও অতিসরলীকরণ।

বাংলার ক্ষেত্রে মাছের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তার প্রকৃতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। নদী, খাল, বিল, পুকুর, দিঘি ও জলাভূমিতে সমৃদ্ধ এই ভূখণ্ডে মাছ ছিল সহজলভ্য। একই সঙ্গে বাংলার আর্দ্র জলবায়ু এমন ছিল না যে, অন্যান্য অনেক অঞ্চলের মতো ডালকে সহজেই প্রধান উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের উৎস করে তোলা যায়। ফলে বহু শতাব্দী ধরে মাছ বাঙালির খাদ্যতালিকায় প্রোটিনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে ওঠে। অর্থাৎ বাঙালি মাছ খায় শুধুমাত্র রসনাতৃপ্তির জন্য নয়, এর নেপথ্যে রয়েছে পরিবেশ ও অর্থনীতির গভীর সম্পর্ক। ফলে, খাদ্যকে ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি বানানোর আগে মনে রাখা অবশ্যই প্রয়োজন, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যে তাদের পরিবেশ অনুযায়ী ভিন্ন খাদ্য সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। ফলে নিরামিষ বা আমিষ- কোনওটিকেই ভারতীয় সংস্কৃতির একমাত্র 'স্বাভাবিক' বা 'শুদ্ধ খাদ্যরীতি' বলে দেগে দেওয়া যায় না।

মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন বই, পুরাণ এবং মঙ্গলকাব্যে বিভিন্ন ধরনের প্রাণী ও পাখির মাংস খাওয়ার উল্লেখ পাওয়া যায়। হাঁস, ছাগল, হরিণ, পায়রা, খরগোশ, কচ্ছপ-সহ নানা প্রাণী মানুষের খাদ্যের অংশ ছিল। তবে তার অর্থ এই নয় যে, সমাজের প্রতিটি শ্রেণি একইভাবে আমিষ খেত। খাদ্যের সঙ্গে বরাবরই জড়িয়ে ছিল অর্থনৈতিক সামর্থ্য, সামাজিক অবস্থান এবং স্থানীয় প্রাপ্যতা।

খাদ্যকে ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি বানানোর আগে মনে রাখা অবশ্যই প্রয়োজন, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যে তাদের পরিবেশ অনুযায়ী ভিন্ন খাদ্য সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। ফলে নিরামিষ বা আমিষ- কোনওটিকেই ভারতীয় সংস্কৃতির একমাত্র 'স্বাভাবিক' বা 'শুদ্ধ খাদ্যরীতি' বলে দেগে দেওয়া যায় না।

বাংলার খাদ্য সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় সত্যটি এই যে, বাঙালির পাতে প্রকৃতি ও ইতিহাস পাশাপাশি অবস্থান করে। নদীর মাছ থেকে ডালের বড়া, ছাগলের মাংস থেকে শাকসবজি, মোগলাই রান্না থেকে চাউমিন- সবই সময়ের সঙ্গে বাঙালির খাদ্য-পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে। সেই বহুত্বকে সংকুচিত করে 'আমিষ বনাম নিরামিষ'-এর লড়াইয়ে নামিয়ে আনা শুধু অপ্রয়োজনীয় নয়, বাংলার নিজস্ব ইতিহাসকেও অস্বীকার করা।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement