তিনি সাবঅল্টার্ন বাংলা কবিতার সম্রাট। বঙ্গীয় সাহিত্যকে ‘এলিট’ ছোঁয়া থেকে মুক্ত করে প্রান্তিক মানুষের মাঝখানে দাঁড় করাতে চেয়েছেন আজীবন। সেই ‘মৃৎশকট’-এর কবি কৃষ্ণনাগরিক দেবদাস আচার্য প্রয়াত হলেন ৮৫ বছর বয়সে। জীবনানন্দ উত্তর বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবির প্রয়াণে শোকগ্রস্ত বাংলার সারস্বত সমাজ।
দেবদাসের প্রয়াণ সংবাদ নিশ্চিত করেছেন পরবর্তী প্রজন্মের কবি ও প্রকাশক গৌতম মণ্ডল। বার্ধক্যজনিত বেশ কিছু সমস্যা ছিল কবির। রবিবার গভীর রাতে শ্বাসকষ্টের সমস্যা দেখা দেয় তাঁর। পরিবারের লোকেরা তড়িঘড়ি স্বাস্থ্যকেন্দ্র নিয়ে যাচ্ছিলেন। যদিও মাঝপথে ভোর ৪টে বেজে ১৫ মিনিট নাগাদ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন 'কালক্রম ও প্রতিধ্বনি'র কবি।
দেবদাস আচার্যের জন্ম ১৯৪২ সালের ৩ জুলাই। অবিভক্ত বাংলার কুষ্টিয়া জেলার বন্ডবিল গ্রামে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পশ্চিমবঙ্গবাসী হয় আচার্য পরিবার। এক সময় ঠিকানা হয় কৃষ্ণনগর। কৃষ্ণনগর গভর্নমেন্ট কলেজ থেকে বাংলা অনার্স নিয়ে পাশ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন দেবদাস। যদিও শিক্ষার্থী অবস্থায় কৃষি দপ্তরে চাকরি পেয়ে পড়াশোনায় ইতি টানেন। স্কুলে জীবনেই সাহিত্য রচনায় হাতেখড়ি। প্রথম দিকে গল্প ও উপন্যাস লেখাতেই বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন। পরে কবি অরুণ বসুর অনুপ্রেরণায় তাঁর কবিতা লেখা শুরু। প্রকাশিত হতে থাকল একের পর এক কাব্যগ্রন্থ--- ‘কালক্রম ও প্রতিধ্বনি’ , ‘মৃৎশকট’, ‘মানুষের মূর্তি’, ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’ ও ‘আচার্যর ভদ্রাসন’ ইত্যাদি।
প্রতিটি কাব্যগ্রন্থ যেন বিদ্রোহের সংলাপ। বাংলা কবিতার পাঠক চেখে দেখল নতুন ধারার এক কাব্যভাষাকেও। দরবারি ঘরানা থেকে কবিতাকে বার করে এনে মানুষের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিলেন তিনি। শ্রমজীবী জনজীবন ও সমাজ, মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত সংগ্রামী জনজীবন প্রাণ পেল তাঁর কাব্যে। প্রথম থেকে বাহুল্য বর্জিত শব্দশিল্পী ছিলেন তিনি, 'তর্পণ' ও 'তিলক মাটি' কাব্যগ্রন্থ থেকে আরও বেশি করে অন্তরঙ্গের ভাষায় স্বচ্ছন্দ হলেন। দেবদাসের কবিতা হয়ে উঠল গভীর সত্যের উপলব্ধি ও বোধের কৃষিখেত। বাংলা কবিতায় সম্পূর্ণ নতুন মাত্রা যোগ করলেন ষাটের দশকের শক্তিশালী কবি।
নয়ের দশকের কবি এবং দেবদাস আচার্যের একধিক গ্রন্থের প্রকাশক-সম্পাদক গৌতম মণ্ডলের বক্তব্য, "প্রান্তিক মানুষের জীবন, তাঁদের আনন্দ-বেদনাকে বাংলা কবিতায় প্রথম নিয়ে আসেন দেবদাস আচার্য। যদিও সেখানেই তিনি সীমাবদ্ধ থাকেননি। পরবর্তী সময়ে নির্ভার বোধের কবিতা লিখেছেন। ফলে তাঁকে একটা নির্দিষ্ট বর্গে ফেলা যাবে না।"
উল্লেখ্য, সাতের দশকে 'ভাইরাস' নামের একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন দেবদাস আচার্য। মাত্র চার পাতার ওই কাগজটি হয়ে উঠেছিল সাতের দশকের নতুন কবিদের ধাত্রীভূমি। যেখানে লিখতেন জয় গোস্বামী, মৃদুল দাশগুপ্ত, গৌতম চৌধুরী প্রমুখ। বাংলা কবিতার বাজার জানে দেবদাস আচার্য পুরস্কার লোভীদের দলে ছিলেন না, কোনওদিন প্রতিষ্ঠানের পরোয়া করেননি তিনি। তথাপি পেয়েছেন ছোট-বড় সম্মাননা। ২০১২ সালে তাঁকে দেওয়া হয় ‘পশ্চিমবঙ্গ বাংলা একাডমি’ পুরস্কার। পেয়েছেন আদম সম্মাননাও।
