গ্রামবাংলার সেই মেঠো পথ। শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। আর দিগন্ত বিস্তৃত কাশবন। সেই কাশবনের বুক চিরে ধোঁয়া উড়িয়ে চলে যাচ্ছে রেলগাড়ি। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী সৃষ্টি ‘পথের পাঁচালী’ বললেই বাঙালির মানসপটে ভেসে ওঠে এমনই এক চিরন্তন ছবি। সেই ছবিকেই এবার সুরের ফ্রেমে বাঁধলেন বিশিষ্ট সঙ্গীত পরিচালক দেবজ্যোতি মিশ্র। কালজয়ী সাহিত্যিকের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি সৃষ্টি করলেন সম্পূর্ণ নতুন এক রাগ— ‘রাগ বিভূতি’।
নিজস্ব ছবি।
সম্প্রতি কলকাতার কেসিসি অ্যাম্পিথিয়েটারে আয়োজিত এক বিশেষ সন্ধ্যায় এই নতুন রাগের আত্মপ্রকাশ ঘটল। অনুষ্ঠানের নাম ছিল ‘অপুর বাজনা’। মূলত সত্যজিৎ রায়ের ‘অপু ট্রিলজি’-র আবহসঙ্গীত ঘিরেই সাজানো হয়েছিল গোটা আয়োজন। সেখানেই দেবজ্যোতি (Debajyoti Mishra) শোনালেন তাঁর নবসৃষ্ট রাগের মাহাত্ম্য। এই রাগের চলন বেশ অভিনব। আরোহণে রয়েছে রাগ দুর্গার আমেজ, আবার অবরোহণে স্পষ্ট হয়ে ওঠে রাগ ভৈরবীর করুণ রস। যেন গ্রামবাংলার মাটির সুর আর বিষাদ মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে এই রাগ বিভূতিতে। শুধুমাত্র রাগ সৃষ্টি করেই থেমে থাকেননি শিল্পী, সাত মাত্রার ছন্দে বেঁধেছেন একটি নিটোল বন্দিশও।
নিজস্ব ছবি।
এদিনের অনুষ্ঠানটি ছিল আদতে সুরের মাধ্যমে বিভূতি-স্মরণ। সত্যজিতের ছবিতে পন্ডিত রবিশঙ্করের সেই কালজয়ী সুর কীভাবে বিশ্বদরবারে বাংলার মেঠো সুরকে পৌঁছে দিয়েছিল, তারই চালচিত্র ফুটে ওঠে শিল্পীর বয়ানে। উঠে আসে দক্ষিণামোহন ঠাকুর কিংবা আলোকনাথ দে-র মতো গুণী মানুষদের অবদানের কথা। মঞ্চে দেবজ্যোতির সঙ্গে ছিলেন একঝাঁক তরুণ তুর্কি। সরোদে মৈশিলী, বাঁশিতে সৌম্যজ্যোতি, এস্রাজে দেবায়ন এবং সেতারে সুভাষের সঙ্গত শ্রোতাদের মুগ্ধ করে। বিশেষ প্রাপ্তি ছিল কিংবদন্তি আলোকনাথ দে-র নাতি হাম্পটুর বাঁশিতে ‘পথের পাঁচালী’-র সেই চেনা সুর।
নিজস্ব ছবি।
অপু-দুর্গার সেই বৃষ্টিতে ভেজার দৃশ্য কিংবা সর্বজয়া-হরিহরের হাহাকার— সবটাই যেন বাদ্যযন্ত্রের আলাপ আর গানে প্রাণ ফিরে পেয়েছিল। দেবজ্যোতি মিশ্রের কথায়, "আমি খুব খুশি যে বাংলার তথা ভারতবর্ষের অন্যতম বিশিষ্ট সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মরণে আমি একটা রাগ সৃষ্টি করেছি। রাগ বিভূতি। সেই রাগে আমারই সৃষ্টি করা বন্দিশ গাওয়া হল এই বিশেষ অনুষ্ঠানে।" সব মিলিয়ে রবিবারের সেই মায়াবী সন্ধ্যায় সুর আর সাহিত্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন প্রত্যক্ষ করল শহর কলকাতা।
