দিব্যেন্দু মজুমদার, হুগলি: ২০১৮-র শেষ রবিবার ‘বন্ধু’হারা হলেন কুণাল সেন। কারণ কুণাল তাঁর বাবা মৃণাল সেনকে বন্ধু বলে ডাকতেন। মৃণাল সেন ও তাঁর স্ত্রী গীতা সেন কেউই আজ আমাদের মধ্যে নেই। এই পৃথিবী বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক মৃণাল সেনের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে আমরা অনেক কথাই জানি না। সেই অজানা কথা তুলে ধরতে উত্তরপাড়ার অরিন্দম সাহা সর্দারের পরিচালনায় মৃণাল সেন ও গীতা সেনকে নিয়ে একটি তথ্যচিত্রের শুটিং শুরু হয়েছে। যে তথ্যচিত্রে বাবা ও মা সম্পর্কে বেশ কিছু মূল্যবান কথা বলেছেন মৃণাল সেনের পুত্র কুণাল সেন। পরিচালক তথ্যচিত্রের নাম রেখেছিলেন ‘সেন ১৯২৩’৷ কিন্তু তথ্যচিত্র শেষ হওয়ার আগে সকলের প্রিয় মৃণাল সেন চলে যাওয়ায় তার নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে ‘সেন ১৯২৩ টু ২০১৮’।
[স্মৃতিতে থাকবেন মৃণাল সেন, পরিচালকের বাড়ি মিউজিয়াম করার প্রস্তাব]
এই তথ্যচিত্রের প্রথম পর্বের শিরোনাম রাখা হয়েছে ‘মাই বন্ধু অ্যান্ড মাই মাদার’। বাবা-মাকে নিয়ে এই ধরনের তথ্যচিত্র তৈরির বিষয়ে কুণালবাবু নিজেও রীতিমতো উৎসাহিত। দু-তিন মাস অন্তর সুদূর আমেরিকার শিকাগো শহর থেকে বাবার সঙ্গে দেখা করতে ভবানীপুরের বাড়িতে ছুটে আসতেন তিনি। সেই সময় ক্যামেরার সামনে কুণাল সেন অকপটে বাবা-মা সম্পর্কে অনেক কথাই বলেছেন যা অনেকেই জানেন না। কুণাল সেন বাবা মৃণাল সেনকে বন্ধু বলে ডাকতেন। তাঁর কথায়, “আমি আমার বাবাকে বন্ধু বলি।” কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, অপুর সংসারের শেষ দৃশ্যে অপু তার ছেলে কাজলকে নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে বন্ধু বলেছে। কুণাল সেন আরও বলেছেন, “রাত দেড়টা দু’টো পর্যন্ত মায়ের সঙ্গে শুটিং সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনার সময় প্রচণ্ড তর্কবিতর্ক হত। কিন্তু বাবা এমনই মানুষ ছিলেন পরের দিন ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ মুডে সিনেমার কাজ শুরু করে দিতেন।” কুণালবাবু নিজে ফিল্মমেকার না হওয়া সত্ত্বেও মৃণাল সেন যখনই কোনও সিনেমার কথা ভাবতেন সেই সিনেমার আইডিয়া, চিন্তাভাবনা আমেরিকায় তাঁকে পাঠিয়ে দিতেন। সেখানে অনেক ক্ষেত্রেই তিনি বাবার চিন্তাভাবনার সঙ্গে সহমত হতেন না, বিরোধিতা করতেন। কোনও কোনও ক্ষেত্রে তাঁর বাবা সেটা মেনে নিতেন, আবার কখনও মেনে নিতেন না। তবে আবার অনেক সময় সিনেমা রিলিজ করার মাস দু’য়েক পর বাবা তাঁকে বলেছেন, তুই ঠিক ছিলি। আমার ভাবনায় ভুল ছিল।
[‘দ্বিতীয়বার পিতৃবিয়োগের যন্ত্রণা পাচ্ছি’, মৃণাল সেনের মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ ‘মম’]
অন্যদিকে, মৃণাল সেনের সঙ্গে কেউ দেখা করতে এলে প্রথম প্রশ্ন থাকে এই মানুষটা কি তার ফিল্ম দেখে? যদি দেখে থাকে তবে সে সম্পর্কে অভিমত কী? কুণালবাবু জানিয়েছেন, বিখ্যাত চিত্র পরিচালকদের ছেলেরা চিত্র পরিচালক হয়েছেন, কিন্তু তিনি তা হতে না পারার জন্য বাবার কোনও আক্ষেপ নেই। বরং বাবা তার জন্য গর্ববোধ করতেন। কারণ কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে পড়াশোনা করে তিনি তাঁর জগতে উৎকর্ষতা দেখিয়েছেন। তাঁর কথায় ছোটবেলা থেকেই বাবা তাঁকে চিন্তার স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। পাশাপাশি বাবা নিজেকে চিরতরুণ মনে করতেন। কুণালবাবুর বন্ধুরা তাঁর বাবাকে মৃণালদা বলে ডাকতেন। কোনওদিন কাকা বলে ডাকেননি। ছেলে তাঁকে বন্ধু বলে ডাকত এটা যেরকম ঠিক সেরকম ছেলের বন্ধুদের কাছেও তিনি মৃণালদা হয়েছিলেন। এরকমভাবে ছেলের চোখ দিয়ে বাবাকে দেখার মধ্যে দিয়ে মৃণাল সেন সম্পর্কে বহু তথ্য এই তথ্যচিত্রের মাধ্যমে সকলের সামনে নিয়ে আসা হয়েছে।
[শেষ হল ‘অক্লান্ত পদাতিক’-এর পথচলা, শোকের ছায়া চলচ্চিত্র জগতে]
শুধু তাই নয়, পরিচালক ২০১১ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে ইংরেজি ও বাংলায় তিন বার মৃণাল সেনের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিয়েছেন যা এই তথ্যচিত্রের বিশেষ একটা দিক নির্দেশ করে। এই তথ্যচিত্র রিলিজ হওয়ার পর চলচ্চিত্র জগতের এই নক্ষত্র সম্পর্কে আরও অনেক অজানা তথ্য প্রকাশ্যে আসবে।
The post তথ্যচিত্রে ‘বন্ধু’ বিয়োগের কথা শোনাবেন মৃণালপুত্র appeared first on Sangbad Pratidin.
