বাঙালির সঙ্গে কমিক্সের সম্পর্ক কম দিনের নয়। খোদ সুকুমার রায় এই মাধ্যমে কাজ করেছেন। পরবর্তী সময়ের নারায়ণ দেবনাথ, ময়ূখ চৌধুরী হয়ে আজকের সুযোগ বন্দ্যোপাধ্যায়– তালিকাটা কিন্তু খুব ছোট নয়। সেই সঙ্গে অনুবাদের মাধ্যমে টিনটিন, অ্যাসটেরিক্স, ফ্যান্টম, ম্যানড্রেক, ফ্ল্যাশ গর্ডনও বাঙালি পাঠকের ভালোবাসা পেয়েছে। হালফিলের বঙ্গভাষী নিল গাইম্যানের ‘স্যান্ডম্যান’ও পড়ে মুগ্ধ হয়েছে। তবু এই মাধ্যম নিয়ে একপ্রকার 'নাক সিঁটকানি' কি নেই বঙ্গভাষী পাঠকের একটা বড় অংশের মধ্যে? এহেন পরিস্থিতিতে বনগাঁর ছেলে চার্বাক দীপ্ত (Charbak Dipta) যে সম্মান পেলেন, তা কেবল তাঁরই নয়, সমস্ত কমিক্সপ্রেমী পাঠকেরই যেন প্রাপ্তি! আইসনার অ্যাওয়ার্ডের ডিজিটাল কমিক বিভাগে মনোনীত ‘লুবলুর পৃথিবী’। যদিও মেলেনি সেরার পুরস্কার, তবু যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রাক্তনীর কাজ শর্টলিস্টেড হয়েছে। স্থান পেয়েছে প্রথম পাঁচের মধ্যে।
ভারত তো বটেই, গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় এই প্রথম কোনও চিত্রকাহিনি এই প্রতিযোগিতায় মনোনয়ন পেয়েছে। বলে রাখা ভালো, উইল আইসনার কমিক ইন্ডাস্ট্রি অ্যাওয়ার্ডসকে কমিক বই শিল্পের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার হিসেবে ধরা হয়। কমিক জগতের 'অস্কার' হিসেবেই গণ্য করা হয় একে। এদিকে হার্ভে অ্যাওয়ার্ডের ডিজিটাল বুক অফ দ্য ইয়ার ক্যাটাগরিতেও ঠাঁই পেয়েছে কমিক্সটি।
এমন অভূতপূর্ব সাফল্যের পর কথা হচ্ছিল 'লুবলুর পৃথিবী'র প্রকাশনা সংস্থা বুক ফার্মের কর্ণধার শান্তনু ঘোষের সঙ্গে। সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটালের তরফে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ''চার্বাক দীপ্তর সঙ্গে আমার পরিচয় বছর দশেক আগে। ও তখন এলিয়েন নিয়ে কাজ করছিল। তবে মাঝখানে যোগাযোগ ছিল না। একদিন আমাকে মেসেঞ্জারে যোগাযোগ করে ফোন নম্বর চাইল। এরপর আমার সঙ্গে দেখা করে জানাল ও একটা একদম নতুন বিষয় নিয়ে কাজ করছে। সেটাই 'লুবলুর পৃথিবী'।''
যদিও মেলেনি সেরার পুরস্কার, তবু যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রাক্তনীর কাজ শর্টলিস্টেড হয়েছে। স্থান পেয়েছে প্রথম পাঁচের মধ্যে। ভারত তো বটেই, গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় এই প্রথম কোনও চিত্রকাহিনি এই প্রতিযোগিতায় মনোনয়ন পেয়েছে।
অনেক প্রকাশকের দোরে ঘুরেও আমল না পাওয়া চার্বাকের কাজ দেখে চমকে ওঠেন শান্তনু। পাশাপাশি তাঁর আরও যেটা ভালো লেগেছিল, সেটা হল বাজার ধরার জন্য অ্যাডভেঞ্চার কমিক্স না করে একেবারে ভিন্ন ধাঁচের একটা কাজ করেছেন তিনি। দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন তাঁরাই প্রকাশ করবেন 'লুবলুর পৃথিবী'।
শান্তনুর কথায়, ''আমি এটা বুঝতে পেরেছিলাম এটা টিনটিন, অ্যাসটেরিক্সের মতো সহজবোধ্য কমিক্স নয়। তাই এর মার্কেটিংটাও জরুরি। পাশাপাশি এই কমিক্সের প্রথম বিষয়টাই হল রং। কাহিনির স্থান তার পরে। এখন রংটা ফুটিয়ে তুলতে গেলে ভালো কাগজ দরকার। আমরা বেঞ্চমার্ক হিসেবে টিনটিনকে মাথায় রেখেছিলাম। টিনটিনের কমিক্স ছাপা হয় ১৩০ জিএসএম কাগজে। আমরা লুবলু ছেপেছি ১৫০ জিএসএমে। টিনটিন কমিক্সের কভারের বোর্ড ২৫০ জিএসএম। আমরা কভার করলাম ৩৫০ জিএসএমে।''
বিশেষ ইভেন্ট, লুবলু টিশার্টের মতো প্রচারের কৌশলে প্রাথমিক ভাবে পাঠকের আগ্রহ তৈরি হলেও দ্রুত তা স্বীকৃত হয় বিষয়ের অনন্যতার জন্যই। চার্বাকের বাবার প্রিয় বিষয় ছিল দর্শন। ছোটবেলা থেকেই তাই দর্শনকে ভালোবাসতে শিখেছিলেন তিনিও। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। লুবলুর কমিক্সের মূল ভিত্তিও সেই দর্শনই। আসলে ‘লুবলুর পৃথিবী’ আমাদের প্রত্যেকের দৃষ্টিভঙ্গিকে আতশকাচের তলায় ফেলতে চায়। বইয়ের পিছন-মলাটে লিখিত বিবরণে লেখা ‘দৃশ্যমান জগতের অস্তিত্ব অনুসন্ধান’… এককথায় সেটাই লুবলুর মনোজগৎ। সেই জগৎ অচেনা বর্ণ-গন্ধ-স্পর্শের ভিতরে এক অন্যতর ভ্রমণের সুযোগ করে দিয়েছিল বাঙালি পাঠককে।
সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে 'বীরপুরুষ' ও 'বনলতা সেন'-কে নিয়ে করা গ্রাফিক সিরিজ। এবার 'লুবলুর পৃথিবী'র জন্য মিলল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। আপাতত 'লুবলুর পৃথিবী'র দ্বিতীয় ভাগের অপেক্ষায় পাঠক। উদাসীন যুবা লুবলু তাঁর বান্ধবী কিমের সঙ্গে আমাদের এবার কোথায় নিয়ে যায়, সেটাই দেখার। পাশাপাশি, লুবলুর স্রষ্টা চার্বাক দীপ্ত আগামিদিনে আরও নতুন কোন কোন সাফল্য পায়, তারও অপেক্ষায় থাকবে বাঙালি।
