তসলিমা নাসরিন আবার বাংলায়। পূর্ব বাংলায় না হলেও, পশ্চিমে। মাঝে দু’-দু’টো দশক কেটে গেছে। ফেলে আসা কলকাতার কী কী কথা মনে পড়ছে?
বাংলা ভাষা থেকে আমি কখনও নির্বাসিত হইনি। নির্বাসনে বাংলা ভাষাই ছিল আমার দেশ। কিন্তু বাংলা ভাষায় লিখে যাওয়া আর বাংলার রাস্তায় মানুষের মুখে বাংলা শোনা এক নয়। মনে পড়েছে আমার কলকাতার বাড়ি, বইমেলা, কলেজ স্ট্রিট, রবীন্দ্রসদন, ময়দানের শীতের রোদ, বন্ধুদের আড্ডা, পাঠকদের ভালোবাসা— সব কিছু। সবচেয়ে বেশি মনে পড়েছে সেই কলকাতাকে, যেখানে একসময় আমার একটি ঠিকানা ছিল, যেখানে নিজেকে অতিথি মনে হত না। উনিশ বছর আগে এক রাতের মধ্যে শুধু একটি শহর নয়, আমার সেই আপন ঠিকানাটিও হারিয়েছিলাম।
প্রায় কুড়ি বছর পরের কলকাতার কাছে আপনার প্রত্যাশা কী?
কলকাতা আমার হারানো উনিশ বছর ফিরিয়ে দিতে পারবে না, আমি সেই অসম্ভব প্রত্যাশা নিয়ে আসিনি। আমি চাই কলকাতা তার মুক্তচিন্তা, সহিষ্ণুতা এবং প্রতিবাদী সাহসকে রক্ষা করুক। কোনও ধর্মীয় গোষ্ঠীর হুমকির কারণে আর যেন কোনও লেখককে শহর ছাড়তে না হয়। আমি এখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের দাবি নিয়ে আসিনি। কিন্তু অতিথি হিসেবেও ফিরতে চাই না— বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ঘরের মানুষ হিসেবেই স্বীকৃতি চাই। ঘরের মানুষ মানেই একই বাড়িতে বাস করা নয়; ভালোবাসা ও আত্মীয়তার অধিকার পাওয়া।
আপনার নির্বাসনের প্রতিবাদে খুব বেশি মানুষ পাশে থাকেননি। অথচ বাংলায় লেখালিখির সূত্রে আপনার বন্ধুর সংখ্যাও তো কম ছিল না!
বন্ধুর তালিকা দীর্ঘ হতে পারে, কিন্তু বিপদের দিনে প্রকাশ্যে পাশে দাঁড়ানো মানুষের তালিকা প্রায়ই খুব ছোট হয়ে যায়। অনেকে ব্যক্তিগতভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছেন, ভালোবাসা জানিয়েছেন; কিন্তু প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করার সাহস দেখাননি। আমি প্রত্যেকের কাছে তাঁদের জীবন বিপন্ন করার দাবি করিনি। তবে লেখক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীরা সম্মিলিতভাবে প্রতিবাদ করলে ইতিহাস হয়তো অন্য রকম হতে পারত। আমাকে শহর থেকে বের করে দেওয়ার যন্ত্রণা ছিল গভীর; কিন্তু পরিচিত ও কাছের মানুষদের নীরবতা কখনও কখনও তার চেয়েও বেশি কষ্ট দিয়েছে। আমি এখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের দাবি নিয়ে আসিনি। কিন্তু অতিথি হিসেবেও ফিরতে চাই না— বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ঘরের মানুষ হিসেবেই স্বীকৃতি চাই।
নির্বাসনে বন্ধুত্বহীনতায় ভুগতেন?
বন্ধুহীন একেবারেই ছিলাম না। পৃথিবীর নানা দেশে বন্ধু পেয়েছি, পাঠকদের ভালোবাসা পেয়েছি। কিন্তু সব বন্ধুত্ব একে অন্যের বিকল্প নয়। একই ভাষা, একই শহর, একই স্মৃতি ভাগ করে নেওয়া মানুষের অভাব অন্য কোনও সম্পর্ক পুরোপুরি পূরণ করতে পারে না। নির্বাসনের সবচেয়ে বড় নিঃসঙ্গতা হল— চারপাশে অনেক মানুষ থাকা সত্ত্বেও নিজেকে ঠিকানাহীন মনে হওয়া।
নির্বাসন আপনার লেখকজীবনকে কত দূর প্রভাবিত করেছে?
নির্বাসন আমাকে লেখক করেনি; নির্বাসনের আগেই আমি লেখক ছিলাম। তবে নির্বাসন আমার লেখার বিষয়, ভাষা ও দৃষ্টিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। দেশ, সীমান্ত, পরিচয়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ঘর হারানোর যন্ত্রণা আমার লেখায় আরও প্রবল হয়ে উঠেছে। নির্বাসন আমাকে অভিজ্ঞতা দিয়েছে, কিন্তু তার জন্য আমি নির্বাসনের কাছে কৃতজ্ঞ নই। নিপীড়ন লেখককে উপাদান দিতে পারে, কিন্তু তার জীবন থেকে ঘর, স্বাভাবিকতা, সময় ও নিরাপত্তা কেড়ে নেয়। আমার আত্মজীবনীও সেই হারানো জীবন এবং তার বিরুদ্ধে আমার সাক্ষ্য।
একই ভাষা, একই শহর, একই স্মৃতি ভাগ করে নেওয়া মানুষের অভাব অন্য কোনও সম্পর্ক পুরোপুরি পূরণ করতে পারে না। নির্বাসনের সবচেয়ে বড় নিঃসঙ্গতা হল— চারপাশে অনেক মানুষ থাকা সত্ত্বেও নিজেকে ঠিকানাহীন মনে হওয়া।
উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রাজনীতির কারণে আপনাকে পশ্চিমবঙ্গ ছাড়তে হয়েছিল বলে বিশ্বাস করেন?
অবশ্যই, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণেই আমাকে পশ্চিমবঙ্গ ছাড়তে হয়েছিল। ধর্মীয় মৌলবাদীরা হুমকি দিয়েছিল, রাস্তায় অশান্তি সৃষ্টি করেছিল; কিন্তু আমাকে শহরছাড়া করেছিল রাষ্ট্র। আইন ভাঙা এবং হত্যার হুমকি দেওয়া লোকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে একজন লেখককে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এটি শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল না; এর মধ্যে ধর্মীয় তোষণ, ভোটের হিসাব এবং অপ্রিয় সত্য উচ্চারণকারী একটি কণ্ঠকে নীরব করার রাজনীতি ছিল।
যে সরকারের মতবাদের সঙ্গে আপনার এত মতানৈক্য, সেই সরকার আপনার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করছে। এত দিন ফিরতে না পারা এবং এখন ফিরিয়ে আনা, দুটির মধ্যেই কি রাজনীতি রয়েছে?
কারও জীবনে হুমকি থাকলে সাধারণত সরকার নিরাপত্তা দেয়, তার মতের সঙ্গে সরকারের মতের যদি নাও মেলে, তার পরও। ভারতের প্রায় সব সরকারই আমাকে নিরাপত্তা দিয়েছে। বহু বছর থেকেই ভারত এই উদারতা দেখিয়ে আসছে। নতুন পশ্চিমবঙ্গ সরকার নিরাপত্তা দেবেন বলেছেন। আমি কৃতজ্ঞতা জানাই। কিন্তু কৃতজ্ঞতা আমার স্বাধীন চিন্তাকে বন্ধক দেয় না; আবার মতভিন্নতাও আমাকে অকৃতজ্ঞ করে না। আমি কোনও রাজনৈতিক দল বা সরকারের আমন্ত্রণে এবার কলকাতায় আসিনি; সেকুলার মিশনের আমন্ত্রণে এসেছি। সরকার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে। এত দিন আমার ফিরতে না পারার পিছনে অবশ্যই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল। আজকের ফেরার মধ্যেও কেউ রাজনৈতিক অর্থ খুঁজতে পারেন। কিন্তু অন্যের গোপন উদ্দেশ্য নিয়ে অনুমান না করে আমি দৃশ্যমান ফলটিকেই গুরুত্ব দিতে চাই— একজন নির্বাসিত লেখকের জন্য বন্ধ দরজাটি খুলেছে। আমি কারও রাজনৈতিক অলংকার নই; আমার একমাত্র পক্ষ স্বাধীনতা, সমানাধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা ও মানবতা।
কলকাতাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ কোনও লেখা বা উপন্যাস কি পাঠকরা পেতে পারেন?
কলকাতা আমার কাছে শুধু একটি শহর নয়; আমার জীবনের একটি বড় চরিত্র। আমার আত্মজীবনী, প্রবন্ধ ও কবিতায় কলকাতা বহুবার এসেছে। উনিশ বছরের বিচ্ছেদ এবং এই ফেরা— এর মধ্যে একটি দীর্ঘ উপন্যাসের মতোই ভালোবাসা, বিশ্বাসভঙ্গ, অপেক্ষা ও সময়ের ইতিহাস রয়েছে। কোনও উপন্যাসের প্রতিশ্রুতি এখনই দিতে চাই না। তবে এই ফেরা নিশ্চয়ই নতুন লেখার জন্ম দেবে।
আপনার আসল যুদ্ধটা কার বিরুদ্ধে—ইসলামি মৌলবাদ, না কি বামেদের বিরুদ্ধে?
আমার যুদ্ধ কোনও মানুষ বা রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে নয়; আমার যুদ্ধ অশুভ মতাদর্শের বিরুদ্ধে, মৌলবাদ, পিতৃতন্ত্র, সাম্প্রদায়িকতা, সেন্সরশিপ এবং মানুষের স্বাধীনতা হরণের বিরুদ্ধে। ইসলামি মৌলবাদের বিরুদ্ধে আমাকে সবচেয়ে বেশি লড়তে হয়েছে, কারণ এই মৌলবাদই সারা বিশ্ব জুড়ে নারীর অধিকারে, মানবাধিকারে, মত প্রকাশের অধিকারে, ধর্মনিরপেক্ষতায় সব চেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বামপন্থীদের বিরুদ্ধে আমার কোনও ব্যক্তিগত যুদ্ধ নেই। পশ্চিমবঙ্গের বাম সরকার আমার সঙ্গে যে অন্যায় করেছিল, আমি তার সমালোচনা করি। কোনও দল ভালো কাজ করলে স্বীকৃতি দেব, অন্যায় করলে প্রতিবাদ করব। দল নয়, নীতিই আমার অবস্থান নির্ধারণ করে।
আজকের ফেরার মধ্যেও কেউ রাজনৈতিক অর্থ খুঁজতে পারেন। কিন্তু অন্যের গোপন উদ্দেশ্য নিয়ে অনুমান না করে আমি দৃশ্যমান ফলটিকেই গুরুত্ব দিতে চাই— একজন নির্বাসিত লেখকের জন্য বন্ধ দরজাটি খুলেছে। আমি কারও রাজনৈতিক অলংকার নই; আমার একমাত্র পক্ষ স্বাধীনতা, সমানাধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা ও মানবতা।
মুসলিম সমাজকে অন্ধকার থেকে আলোয় আনার যে কথা বলেছেন, সেই কাজ কতটা পূর্ণ হয়েছে?
আমি নিজেকে কোনও সমাজের উদ্ধারকর্তা মনে করি না। একজন লেখক একা একটি বিশাল সমাজকে অন্ধকার থেকে আলোয় নিয়ে যেতে পারেন না। আমার কাজ মানুষকে প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করা, বিশেষ করে নারীকে নিজের অধিকার, স্বাধীনতা ও মর্যাদা সম্পর্কে সচেতন করা। আমি মুসলমান মানুষের বিরুদ্ধে লিখিনি; ইসলামের নারী-বিরোধী, অমানবিক ও বৈষম্যমূলক বিধানের সমালোচনা করেছি। ধর্মের সমালোচনা মুসলমানবিদ্বেষ নয়; সমাজের সংস্কার ও বিবর্তনের জন্য সমালোচনা জরুরি। আজ অনেক তরুণ-তরুণী প্রশ্ন করছে, অনেক নারী ধর্মীয় শৃঙ্খল প্রত্যাখ্যান করছে। আবার মৌলবাদও প্রবল হয়েছে। সুতরাং কাজ শেষ হয়নি, মুক্তচিন্তার কাজ কোনও দিনই সহজে শেষ হয় না।
বলা হয়, কোনও লেখাই অরাজনৈতিক নয়। প্রথম লিখতে আসার সময়ও কি এভাবে ভাবতেন?
প্রথম যখন লিখতে শুরু করি, তখন হয়তো ‘কোনও লেখাই অরাজনৈতিক নয়’—এভাবে তত্ত্ব সাজিয়ে ভাবিনি। আমি নিজের অভিজ্ঞতা, নারীর জীবন, প্রেম, বৈষম্য ও অন্যায় নিয়ে লিখেছি। পরে বুঝেছি, নারীর শরীর, সংসার, প্রেম, পোশাক, চলাফেরা—সব কিছুর ওপরই ক্ষমতা ও রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ব্যক্তিগত জীবনও তাই রাজনৈতিক। তবে সাহিত্যকে দলীয় প্রচারপত্র হতে হবে, এমন বিশ্বাস আমার নেই। সাহিত্যের প্রথম শর্ত স্বাধীনতা।
বিশ্বজুড়ে মৌলবাদ ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মেয়েরা দাঁড়াচ্ছে। তাদের পূর্বসূরি হিসাবে আপনি এই সাহস পেলেন কোথা থেকে?
সাহস মানে ভয় না পাওয়া নয়; ভয় পেয়েও সত্য উচ্চারণ করা। আমিও ভয় পেয়েছি। কিন্তু ভয়কে আমার সিদ্ধান্ত নিতে দিইনি। ছোটবেলা থেকে নারীর ওপর বৈষম্য, অপমান ও নির্যাতন দেখেছি। চিকিৎসাবিজ্ঞান আমাকে যুক্তি ও প্রমাণের গুরুত্ব শিখিয়েছে। প্রশ্ন করার অভ্যাস আমাকে ধর্ম, সমাজ ও পরিবারের অন্যায় বিধানকে মেনে নিতে দেয়নি। একবার সত্য বলা শুরু করলে পরের সত্যটি আর গোপন করা যায় না। আমার সাহস এসেছে অন্যায়ের প্রতি ঘৃণা এবং মানুষের স্বাধীনতার প্রতি গভীর বিশ্বাস থেকে।
লেখালিখির জায়গায় পিতৃতান্ত্রিক শাসন কি এখনও তীব্রভাবে রয়েছে?
অবশ্যই রয়েছে, যদিও তার চেহারা কিছুটা বদলেছে। পুরুষের ক্রোধকে বলা হয় প্রতিভার তেজ, নারীর ক্রোধকে বলা হয় হিস্টিরিয়া। পুরুষ যৌনতা নিয়ে লিখলে সাহসী, নারী লিখলে অশ্লীল। পুরুষের আত্মজীবনীকে ইতিহাস বলা হয়, নারীর আত্মজীবনীকে ব্যক্তিগত কেচ্ছা বলা হয়। মেয়েদের প্রকাশের সুযোগ বেড়েছে, কিন্তু বিচার করার এই দ্বৈত মানদণ্ড এখনও প্রবল। সামাজিক মাধ্যম নারীর কণ্ঠ বাড়িয়েছে, আবার নারীবিদ্বেষকেও আরও দৃশ্যমান করেছে।
আপনাকে ‘নারীবাদী লেখক’ বললে কি আপনার লেখা ও লড়াইকে সীমিত করে দেওয়া হয়?
নারীবাদী লেখক পরিচয়ে আমার কোনও আপত্তি নেই; বরং আমি গর্বিত নারীবাদী। আপত্তি তখনই, যখন এই পরিচয়কে একটি ছোট খাঁচা বানিয়ে বলা হয়, আমি বুঝি শুধু নারীদের জন্য বা শুধু নারীদের বিষয়েই লিখি। নারীর সমানাধিকার আমার লেখার কেন্দ্রীয় বিষয়, কিন্তু আমি ধর্মনিরপেক্ষতা, বাক্স্বাধীনতা, নির্বাসন, সাম্প্রদায়িকতা, মানবাধিকার, প্রেম ও রাজনীতি নিয়েও লিখেছি। নারীবাদ শুধু নারীর মুক্তির দর্শন নয়; বৈষম্যহীন মানবসমাজ নির্মাণের দর্শন।
সিনেমার মতো সাহিত্যেও কি ‘কাস্টিং কাউচ’ রয়েছে? মেয়েদের লেখার সুযোগ পাওয়ার জন্য কি মূল্য দিতে হয়?
সাহিত্যে হয়তো সিনেমার মতো একই কাঠামোয় ‘কাস্টিং কাউচ’ নেই, কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহার অবশ্যই আছে। কোনও সম্পাদক, প্রকাশক, সমালোচক বা প্রতিষ্ঠিত লেখক সুযোগ, প্রকাশনা বা স্বীকৃতির বিনিময়ে কোনও তরুণী লেখকের কাছে ব্যক্তিগত বা যৌন সুবিধা চাইতে পারেন। প্রভাবশালী পুরুষের প্রশ্রয়কে কখনও কখনও প্রতিভার স্বীকৃতি হিসেবে চালানো হয়। তবে এ কথাও পরিষ্কারভাবে বলা জরুরি, সব নারী কোনও আপস করে সাহিত্যে জায়গা পান, এমন ধারণা ভয়ংকর নারীবিদ্বেষী। অসংখ্য নারী নিজের প্রতিভা, পরিশ্রম ও মেধায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। সমস্যাটি নারীর যোগ্যতায় নয়; ক্ষমতার অসম কাঠামো এবং সেই কাঠামোকে ঘিরে থাকা নীরবতায়।
ছাত্র আন্দোলনকে কীভাবে দেখেন? তার স্পর্ধা ও নমনীয়তা কেমন হওয়া উচিত?
ছাত্র আন্দোলন সমাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তরুণরা ক্ষমতাকে প্রশ্ন করবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ছাত্র আন্দোলন বলেই কোনও আন্দোলন স্বয়ংক্রিয়ভাবে গণতান্ত্রিক বা মহৎ হয়ে যায় না। একটি আন্দোলনের লক্ষ্য, নেতৃত্ব, পদ্ধতি এবং পরিণতির পরিকল্পনা থাকতে হয়। স্পর্ধা থাকবে ক্ষমতার সামনে সত্য বলার; কিন্তু হিংসা, ভিন্নমত দমন বা সংখ্যালঘুর ওপর আক্রমণের স্পর্ধা নয়। নমনীয়তা থাকবে তথ্য শোনা ও কৌশল বদলানোর ক্ষেত্রে; কিন্তু মৌলিক নীতি বিসর্জন দেওয়ার ক্ষেত্রে নয়। শুধু সরকার ফেলে দেওয়ার পরিকল্পনা নয়—তার পর কী হবে, সেই দায়িত্ববোধও আন্দোলনের থাকতে হবে।
বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যন্তর মন্তরের আন্দোলনের কোনও মিল পেয়েছিলেন? না কি ভারতের আন্দোলনটি সংগঠিত এবং বাংলাদেশেরটির মতো উচ্ছৃঙ্খল নয়?
যন্তর মন্তরের একটি ছোট ভিডিও দেখে আমার বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের কথা মনে পড়েছিল। আমি দুটি আন্দোলনকে এক বলে রায় দিইনি; বাংলাদেশের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকে একটি আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলাম। জমায়েত, তারুণ্যের ক্ষোভ ও সরকারবিরোধী স্লোগানে বাহ্যিক মিল থাকতে পারে। কিন্তু একটি আন্দোলনের প্রকৃতি বুঝতে হলে তার দাবি, নেতৃত্ব, সংগঠন, অর্থায়ন, পদ্ধতি এবং পরবর্তী আচরণ দেখতে হয়। বাংলাদেশের আন্দোলন ন্যায্য একটি দাবিতে শুরু হয়েছিল; পরে তা সরকার পতনের আন্দোলনে পরিণত হয় এবং মৌলবাদী ও জেহাদি শক্তির জন্য ক্ষমতার দরজা খুলে দেয়। যন্তর মন্তরের আন্দোলনের ক্ষেত্রেও সম্পূর্ণ তথ্য ছাড়া তাকে উচ্ছৃঙ্খল বা ষড়যন্ত্রমূলক বলা ঠিক হবে না। আমার বক্তব্য ছিল সতর্কতার—অন্ধ সমর্থন বা চূড়ান্ত রায় নয়।
শেখ হাসিনার সঙ্গে আপনার মতাদর্শে মিল নেই। তার পরও তাঁকে দেশে ফিরে বিরোধী আসনে বসার কথা বলেছিলেন কেন?
গণতন্ত্র ব্যক্তিগত পছন্দ বা মতাদর্শগত মিলের নাম নয়। শেখ হাসিনার বহু নীতি ও কাজের আমি তীব্র সমালোচনা করেছি। তাঁর দীর্ঘ শাসনকালেও আমাকে বাংলাদেশে ফিরতে দেওয়া হয়নি। তাঁর সরকারের কর্তৃত্ববাদ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ এবং ধর্মীয় শক্তির সঙ্গে আপসের বিরুদ্ধেও আমি লিখেছি।
কিন্তু তাই বলে একটি রাজনৈতিক দলকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া, তার সমর্থকদের অধিকার কেড়ে নেওয়া বা গণপিটুনির রাজনীতিকে সমর্থন করতে পারি না। অপরাধের অভিযোগ থাকলে স্বাধীন আদালতে বিচার হবে। কে সরকারে এবং কে বিরোধী আসনে থাকবে, তা ভোটাররা নির্ধারণ করবে। শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অধিকার স্বীকার করা তাঁর মতাদর্শকে সমর্থন করা নয়; এটি গণতান্ত্রিক নীতিকে সমর্থন করা।
আপনার লেখা বইগুলোর মধ্যে কোনটি সবচেয়ে প্রিয় এবং কেন?
একটি বইকে আলাদা করা খুব কঠিন। ‘লজ্জা’ সম্ভবত আমার সবচেয়ে আলোচিত ও ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বই। কিন্তু আমার সবচেয়ে কাছের হল আত্মজীবনী, সাতটি খণ্ডকে আমি একটি দীর্ঘ বই হিসেবেই দেখি। সেখানে আমি নিজেকে মহৎ বা নির্ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করিনি। নিজের ভুল, দুর্বলতা, সংশয়, প্রেম, অপমান এবং অপ্রিয় সত্য, কিছুই ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন করিনি। অন্যের সত্য লেখা কঠিন, নিজের সত্য লেখা আরও কঠিন। সেই কঠিন কাজটি করার কারণেই আত্মজীবনী আমার সবচেয়ে আপন।
এপার বাংলা ও বাংলাদেশের সাহিত্যের তুলনা করলে কাঁটাতারের কোন দিককে এগিয়ে রাখবেন?
সাহিত্যের বিচার কাঁটাতার দিয়ে করা কঠিন। দুই বাংলাতেই অসাধারণ সাহিত্য আছে, আবার দুর্বল সাহিত্যও আছে। পশ্চিমবঙ্গে প্রকাশনা, সম্পাদনা, সাহিত্যচর্চা এবং পুরোনো বই সংরক্ষণের পরিকাঠামো তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। বাংলাদেশের সাহিত্যে ভাষার জীবন্ত শক্তি, গ্রামীণ জীবন, সামাজিক টানাপোড়েন এবং ইতিহাসের প্রত্যক্ষ অভিঘাত প্রবল।তবে বাংলাদেশে ধর্মীয় মৌলবাদ, সেন্সরশিপ ও মতপ্রকাশের ভয় সাহিত্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। পশ্চিমবঙ্গেও দলাদলি, গোষ্ঠীবাজি ও রাজনৈতিক আনুগত্য সাহিত্যের স্বাধীন বিচারে বাধা দেয়। এক দিককে বিজয়ী ঘোষণা করার চেয়ে দুই বাংলার সাহিত্যকে আরও বেশি আদান-প্রদান ও অনুবাদের মাধ্যমে সমৃদ্ধ করা জরুরি।
ইউরোপ-আমেরিকায় ইংরেজিতে লেখা উপন্যাসকেই যখন ‘ভারতীয় সাহিত্য’ হিসেবে পরিচিত করা হয়, তখন কেমন লাগে?
ইংরেজিতে লেখা ভারতীয় সাহিত্য অবশ্যই ভারতীয় সাহিত্যের অংশ, কিন্তু সেটিই সমগ্র ভারতীয় সাহিত্য নয়। বাংলা, তামিল, মালয়ালম, উর্দু, মারাঠি, অসমিয়া এবং আরও বহু ভাষার সাহিত্যকে বাদ দিয়ে ভারতের পূর্ণ সাহিত্যিক পরিচয় পাওয়া অসম্ভব। সমস্যা ইংরেজিতে লেখা নিয়ে নয়; সমস্যাটা হল ইংরেজিকে একমাত্র প্রতিনিধিত্বকারী ভাষা হিসেবে তুলে ধরা। আন্তর্জাতিক প্রকাশনা ও অনুবাদের ক্ষমতা ঠিক করে দেয় কোন সাহিত্য দৃশ্যমান হবে। ফলে অনেক অসাধারণ লেখক শুধু অনুবাদের অভাবে পৃথিবীর কাছে অদৃশ্য থেকে যান। ভারতীয় সাহিত্যের বহুভাষিক সত্যটিই বিশ্বকে জানানো দরকার।
পরজন্মে বিশ্বাস করেন? করলে কোন দেশে জন্মাতে চান, বাংলায় না বাংলাদেশে?
আমি পরজন্মে বিশ্বাস করি না। আত্মায়ও বিশ্বাস করি না। আমার মৃত্যুর পর দেহ চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য দান করেছি; আত্মার জন্য অন্য কোনও ঠিকানা রাখিনি। তবে যদি একে কবির কল্পনার প্রশ্ন হিসেবে নিই, তা হলে বলব—- আমি আবার বাংলা ভাষাতেই জন্মাতে চাই, কিন্তু এমন একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও স্বাধীন দেশে, যেখানে সত্য বলার অপরাধে কোনও লেখককে নির্বাসিত হতে হয় না।
