বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে জীবনানন্দ দাশের পর সেরা কবির শিরোপা অনেকেই দিয়ে থাকেন "রাস্তা বদল হয় 'মাঝ রাতে'র কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে। তাঁর বন্ধু প্রতীম সুহৃদ এবং কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় পর্যন্ত শক্তির কবিতায় বাংলা ভাষার ব্যবহারকে রীতিমত সমীহ করতেন। কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের আরও একটা বড় পরিচয় ছিল বোহেমিয়ান, ছন্নছাড়া, মদপ্রেমী এবং জীবনের প্রতি আসক্তি। বাড়ি থেকে বাজার করতে বেরিয়ে তিনি ধলভূমগড় বা হেসাডির বাংলোয় অনায়াসে চলে যেতেন বাড়িতে ফেলে আসা স্ত্রী মীনাক্ষী ও দুই সন্তানের কথা ভুলে বন্ধু এবং প্রকৃতি ও কবিতার অমোঘ টানে। সময়ে অসময়ে একমাত্র তিনিই পারতেন অবনীর দরজায় কড়া নাড়তে। এহেন একটি ব্যতিক্রমী কবি ও মানুষের জীবন বৃত্তান্ত নিয়ে নাটক বাঁধা সহজ কাজ নয় মোটেই। কিন্তু সেই কঠিনতম কাজটিই করেছেন উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়।
'আ-শক্তি' নাটকের দৃশ্যে দেবশঙ্কর হালদার, ছবি: সংগৃহীত।
"কবিকে পাবেনা..." শব্দবন্ধটির বাইরে দাঁড়িয়ে তিনি কবির জন্মের গ্রাম বহড়ু থেকে কলকাতা শহরে পরিযায়ী হয়ে আসা এবং কলকাতা কর্পোরেশনের জল এবং মদ পেটে পড়ার পর তাঁর কবিতায় একের পর এক যে বাঁক এসেছে সেটা যেমন তুলে এনেছেন। তেমনই জায়গা দিয়েছেন তাঁর সঙ্গীসাথীদের সঙ্গে মেলামেশা, আড্ডা, এবং কবির নিজের অন্তর্দ্বন্দ্বের সংকটও। উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায় কবি শক্তিকে তাঁর রোজকার জীবনের দিনলিপিতে আটকে রাখেননি, তিনি তাঁর জীবনের দর্শন, আবেগ, কবিতার প্রতি ভালোবাসা, রাগ, অভিমানকে যথেষ্ট মর্যাদা দিয়েই বুনেছেন নাটকটি। পরিচালক দেবাশীষ নাট্যকারের সেই চলনকে 'প্লাস্টিক ইমেজারি' দেওয়ার জন্য অ্যাকাডেমির মঞ্চটিকে তিনটি জোনে ভাগ করে নিয়েছেন। বাড়ির দরজা, জানালার পাশে জায়গা পেয়েছে মধ্যকলকাতার বারদুয়ারি, কফি হাউস। ইত্যাদির সঙ্গে শক্তি-মীনাক্ষীর গরীবের সংসারও। পূর্ব-পশ্চিম'-এর প্রযোজনায় নাটকটি সম্প্রতি দেখা গেল তাঁদেরই নাট্যোৎসবে। যাঁরা কবিকে নিজের চোখে দেখেছেন, পরিচিত ছিলেন তাঁদের কাছে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের অন্তর্জীবন কিছুটা সাজানো মনে হতেই পারে, কিন্তু উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায় এবং পরিচালক দেবাশীষ দু'জনেই জোর দিয়েছেন তাঁর মতো একজন দার্শনিক কবির চিরন্তন মানবিকতা, এবং ওঁর আপাত বোহেমিয়ানার মধ্যেও জীবনকে নিজের শর্তে বাঁচার আপসহীনতাকে। সুনীল, শক্তি, সন্দীপন, তারাপদ, পৃথ্বীশ এমনকি স্বাতী-মীনাক্ষীদেরও হাজির করেছেন যথেষ্ট সাবধানতার সঙ্গে। সবচাইতে ভালো লাগলো কলকাতা শহর এবং বহড়ু গ্রামকেও সশরীরে দুটি চরিত্র করে তোলায়। পার্থ ভৌমিক অভিনীত কলকাতা চরিত্রটি নাটকে কথকের ভূমিকে নিয়ে দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছে সারাক্ষণ।
'আ-শক্তি' নাটকের দৃশ্যে দেবশঙ্কর হালদার, ছবি: সংগৃহীত।
যাঁরা কবিকে নিজের চোখে দেখেছেন, পরিচিত ছিলেন তাঁদের কাছে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের অন্তর্জীবন কিছুটা সাজানো মনে হতেই পারে, কিন্তু উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায় এবং পরিচালক দেবাশীষ দু'জনেই জোর দিয়েছেন তাঁর মতো একজন দার্শনিক কবির চিরন্তন মানবিকতা, এবং ওঁর আপাত বোহেমিয়ানার মধ্যেও জীবনকে নিজের শর্তে বাঁচার আপসহীনতাকে।
তরুণ শক্তিকে কলকাতা কীভাবে টেনে আনলো সেটা পার্থ ভৌমিকের অভিনয়ে অত্যন্ত সুন্দর ও সাবলীল ভাবে ফুটে উঠেছে। এবং শেষ দৃশ্যে তিনি যখন উচ্চারণ করেন,"অযুত নিযুত কোটি কোটি পদ্য গায়ে মেখে ফিরে আসবে.." তখন যেন শক্তির আত্মঘাতী এক ভোরে শান্তিনিকেতনের ছায়ায় হারিয়ে যাওয়া এক করুণতম মুহুর্তের জন্ম দেয় মঞ্চে। দু'বার বহড়ু সেজে (অরূপরতন গাঙ্গুলী) শক্তির মুখোমুখি হয়ে ফেলে আসা গ্রামের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। সবচাইতে ভালো লেগেছে সম্পাদক সাগরময় ঘোষের শক্তির বাড়িতে এসে মীনাক্ষীর সঙ্গে ঘরোয়া আড্ডা পর্বটি। একজন আন্তরিক সংবেদনশীল সম্পাদকের নিজের কলমটি উপহার দিয়ে যাওয়া শুধু নয়,তাঁর আলোচনায় একটি মানবিক দিকও উঠে আসে। স্বল্প সময়ের উপস্থিত সৌমিত্র মিত্র সম্পাদকের ভূমিকাটি খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন। আর এই নাটকের মধ্যমণি তো দেবশঙ্কর হালদার নিজে। শক্তির সঙ্গে তাঁর চেহারার কোনো সাদৃশ্য নেই, তাঁর ব্যবহারিক ডিটেইলস দেবশঙ্কর কতটা জানেন বা লক্ষ্য করেছেন জানিনা। সম্ভবত তিনি মূল চরিত্রের অন্তরের যন্ত্রণা। এ একজন কবির দ্বিধা দ্বন্দ, সাংসারিক খুঁটিনাটির মধ্যেও কল্পনা বাস্তবকে নিজের মধ্যে আত্মস্থ করেই শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন। নাটকের প্রথমার্ধে সত্যি বলতে দেবশঙ্করকে শক্তির অন্তরাত্মা প্রকাশে একটু দুর্বলই লাগছিল। তবে দ্বিতীয় পর্বে তিনি অনেকটাই ঢুকে পড়েন শক্তির আত্মার মধ্যে। মৃত্যুর পরেও তিনি যেন বেঁচে ওঠেন এবং মীনাক্ষীর উদ্দেশ্যে বলে ওঠেন নিজেরই কবিতার লাইন "তোমার করে তোমাকেব কখনও ভাবিনি। জগতে দোঁহে একা। আর তো হলো না দেখা চিরদিন ছাড়াছড়ি" মুহূর্তটি একজন প্রেমিক স্বামীর কথা মনে করিয়ে দেয়। শক্তির ঘনিষ্ঠ সঙ্গীদের মধ্যে সুনীল (কৌশিক প্রধান), স্বাতী (ঈপ্সিতা গঙ্গোপাধ্যায়),সন্দীপন (অমিত দেব), পৃথ্বীশ (মনোজিত দাশ), তারাপদ (চন্দনবিকাশ) এবং দাদু (দীপেন ভট্টাচার্য)র চরিত্রে নজর কাড়েন। বিভিন্ন গানে দীপেন বাবুর কণ্ঠটি বেশ দড় মানতেই হচ্ছে। এবং আলাদাভাবে মীনাক্ষী চরিত্রে অনন্যার অভিনয়কে "সাধ সাধু" বলতেই হচ্ছে। পূর্ব-পশ্চিম এর এই প্রযোজনা সাম্প্রতিক বাংলা কবিতার সেরা মানুষ শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের প্রতি এক সশ্রদ্ধ নিবেদন হয়ে রইলো। এবং পরিচালক দেবাশীষ প্রমাণ করে দিলেন তাঁর আস্তিনে এখনও কিছু লুকোনো তীর রয়েছে।
