১৯ এপ্রিল ১৯৭৫। আকাশে উড়ল আর্যভট্ট। এদেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ। প্রথম ভারতীয় মহাকাশচারী রাকেশ শর্মার অনন্ত শূন্যকে স্পর্শ করতে তখনও এক দশক বাকি। কিন্তু তার আগে, গত শতকের সাতের দশকের ওই সময় থেকেই ভারতের মহাকাশ যাত্রার সোনালি সূচনা। কিন্তু একথা বললে আসলে সত্যের অপলাপ করা হবে। আর্যভট্টের উৎক্ষেপণ ছিল আত্মপ্রকাশ। কিন্তু তারও বহু আগে থেকেই ছিল সলতে পাকানো। সেই ইতিহাসকে ছুঁতে না পারলে ইসরোর ইতিহাসকে ছোঁয়া যাবে না।
এর প্রায় দেড় দশক আগে, ছয়ের দশকের শুরুর দিক থেকে এদেশে মহাকাশ গবেষণার শুরুয়াৎ। পরবর্তী সময়ে সেখান থেকেই ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশন তথা ইসরোর জন্ম। গবেষণার শুরুর সেই দিনগুলিতে সীমিত ক্ষমতা নিয়ে অনন্ত স্বপ্ন দেখতে পেরেছিলেন বিজ্ঞানীরা। যাঁদের নেতৃত্বে ছিলেন বিক্রম সারাভাই।
একেবারে শুরুতে দরকার ছিল একটা এমন জায়গা, যেটা চৌম্বক বিষুবরেখার বেশ কাছাকাছি অবস্থিত। তাহলে সেখান থেকে বায়ুমণ্ডলের একেবারে উপরের দিকের অঞ্চলগুলির উপরে নজরদারি চালানো সম্ভব হবে। খুঁজতে খুঁজতে সন্ধান মেলে। গ্রামটির নাম থাম্বা। তিরুঅনন্তপুরমের কাছেই শান্ত এই গ্রামটির বাসিন্দা ছিলেন মূলত মৎস্যজীবীরা। আর সেই গ্রামের মাঝামাঝি অবস্থিত সেন্ট মেরি ম্যাগডালেন চার্চ। এই চার্চকে বাদ দিয়ে এদেশের বিজ্ঞানচর্চার ইতিবৃত্ত সম্পূর্ণ হতে পারে না।
অঞ্চলের খ্রিস্টানরা ওই চার্চটি ছেড়ে দেন মহাকাশ গবেষণার জন্য। সেখানকার চার দেওয়ালের মধ্যেই আকাশকে ছোঁয়ার বীজ বপণ করেছিলেন বিজ্ঞানীরা। ওই চার্চই ইসরোর প্রথম গবেষণাগার ও কন্ট্রোল রুম। চার্চের বিশপের বাড়ি হয়ে ওঠে অফিসঘর। আর কাছের নারকেল গাছের সারির মাঝেই অস্থায়ী ওয়ার্কশপ। কোনও অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি নেই, প্রযুক্তি নেই। এমনকী রকেটের যন্ত্রাংশ সাইকেলেও নিয়ে আসা হত। গুগলের সার্চ করলে সেই ছবি বোধহয় পাওয়া যাবে। তখন কেউ ভাবতে পেরেছিল বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে নামার মতো অসামান্য সাফল্য একদিন অর্জন করবে ইসরো? আজকের চন্দ্রযানের সেই সাফল্যের রূপকথার প্রথম অক্ষর কিন্তু নির্জন এক গ্রামের ছোট্ট চার্চের অন্দরমহলেই লেখা হয়েছিল।
গ্রামটির নাম থাম্বা। তিরুঅনন্তপুরমের কাছেই শান্ত এই গ্রামটির বাসিন্দা ছিলেন মূলত মৎস্যজীবীরা। আর সেই গ্রামের মাঝামাঝি অবস্থিত সেন্ট মেরি ম্যাগডালেন চার্চ। এই চার্চকে বাদ দিয়ে এদেশের বিজ্ঞানচর্চার ইতিবৃত্ত সম্পূর্ণ হতে পারে না।
সেই শুরুর দিনে একেবারে ছোট ছোট ধাপ পেরনোর পরিকল্পনাই করা হয়েছিল। প্রাথমিক ভাবে ঠিক করা হয়, আবহাওয়ার খোঁজ নিতে সাউন্ডিং রকেট পাঠানো হবে। হয়তো সাফল্য হিসেবে খুব বড় সাফল্য নয়। তবু এগুলিই যে প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে সহায়তা করেছিল তা নিশ্চিত করে বলা যায়। আর সেই পথে হেঁটেই আর্যভট্টর উড়ানের ইতিহাস নির্মিত হয়।
আর্যভট্ট অবশ্য বেশিদিন কর্মক্ষম ছিল না। রাশিয়ার (তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন) রকেটে উৎক্ষেপণ হয়েছিল সফল ভাবেই। কিন্তু সেই যে বিদ্যুৎ সরবরাহের গোলমাল দেখা দিল আর তা ঠিক করা যায়নি। তবু ওই কয়েকদিনের আয়ুতেই আর্যভট্ট সাফল্য-গাথা রচনা করেছিল। ভারত যে কৃত্রিম উপগ্রহ তৈরি করতে পারে, এই আত্মবিশ্বাসটা একান্তই দরকার ছিল।
প্রাথমিক ভাবে ঠিক করা হয়, আবহাওয়ার খোঁজ নিতে সাউন্ডিং রকেট পাঠানো হবে। হয়তো সাফল্য হিসেবে খুব বড় সাফল্য নয়। তবু এগুলিই যে প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে সহায়তা করেছিল তা নিশ্চিত করে বলা যায়।
ইসরো কতদূর এগিয়ে গিয়েছে, তা বুঝতে চন্দ্রযান-পরবর্তী সময়ের সাফল্যের খতিয়ান একবার দেখা যেতে পারে। ২০২৫ সালে মহাকাশে স্বয়ংক্রিয় ভাবে ‘করমর্দন’ বা সংযুক্ত হয় ইসরোর দুটি কৃত্রিম উপগ্রহ। তৈরি হয়েছিল ইতিহাস। এরপর মার্চে আনডকিং’ করতে সমর্থ হয় তারা। এই পদক্ষেপকে ‘যুগান্তকারী’ বলে মনে করছেন মহাকাশ গবেষকরা। স্পেডেক্স মিশন বলে পরিচিত এই মিশনের মূল লক্ষ্য ছিল স্পেডেক্স ১ ও স্পেডেক্স ২, এই দুই কৃত্রিম উপগ্রহকে একত্রিত করা। ২০২৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর সেই দুই উপগ্রহকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। এদের মধ্যে স্পেডেক্স ১ হল চেজার। স্পেডেক্স ২ টার্গেট। নতুন বছরের শুরুতে সম্পন্ন হয় ‘ডকিং’। মাস দুয়েক পরে সম্পন্ন হয় ‘আনডকিং’ও। তাছাড়া ওই বছরের শুরুতে আরেক মাইলফলক স্পর্শ করে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা। অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীহরিকোটার সতীশ ধাওয়ান মহাকাশকেন্দ্র থেকে উৎক্ষেপণ করা হয় জিএসএলভি এফ-১৫ রকেট। কৃত্রিম উপগ্রহ এনভিএস-২-কে নিয়ে ওই রকেটের সফল উৎক্ষেপণের সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয় ইতিহাস। কারণ সেটাই ছিল ইসরোর শততম উৎক্ষেপণ। ৪৬ বছর আগে শ্রীহরিকোটা থেকে উৎক্ষেপণ হয়েছিল প্রথম উপগ্রহ। এবার তা ছুঁয়ে ফেলল শততম মিশনের সফলতাকেও।
এবং শুভাংশু শুক্ল। গ্রুপ ক্যাপ্টেন শুভাংশু আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন তথা ISS-এ পা রাখেন গত জুনে। ২৫ জুন ‘অ্যাক্সিওম মিশন ৪’-এর মিশন পাইলট হিসেবে মহাকাশে পাড়ি দেন তিনি। অন্তরীক্ষে ১৮ দিন কাটিয়ে ১৫ জুলাই ২০২৫-এ সফলভাবে পৃথিবীতে ফিরে আসেন। তৈরি হয় ইতিহাস। ISS-এ ত্রিবর্ণরঞ্জিত জাতীয় পতাকা দেখতে পাওয়া যে কোনও ভারতীয়র জন্য গর্বের। ‘গগনযান’-এর জন্য নির্বাচিত চার মহাকাশচারীর মধ্যে অন্যতম শুভাংশু। তাঁর এই অনন্য অভিজ্ঞতা ভারতের অভিযানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
এমন বহু... ইসরোর আগামী পথ স্বর্ণখচিত বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। আর সেই দিকে তাকানোর সময় তাই পিছনে তাকিয়ে দেখাটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। থুম্বার সেই গির্জাটি বিক্রম সারাভাই স্পেস সেন্টার ক্যাম্পাসের ভেতরে একটি জাদুঘর হিসেবে সংরক্ষিত আছে। যা নীরবে মনে করিয়ে দেয় শুরুর দিনটা কেমন ছিল। প্রার্থনা কক্ষ থেকে তৈরি গবেষণাগারেই তৈরি হয়েছিল নীল নকশা। উদ্ভাবনী শক্তির সাহায্যে সীমিত সামর্থেও আকাশ ছোঁয়া যায়। আকাশ পেরিয়ে মহাকাশে রেখে আসা যায় স্পর্ধার তেরঙা আশ্বাস।
