shono
Advertisement
Time

৬০ মিনিটে ঘণ্টা, ২৪ ঘণ্টায় দিন, কীভাবে শুরু 'আশ্চর্য' হিসাব? কবে মানুষের হাতে ধরা দিল 'সময়'?

Published By: Biswadip DeyPosted: 05:42 PM Mar 21, 2026Updated: 05:42 PM Mar 21, 2026

''সময় বসে নেই, সময় কেবলই চলে যাচ্ছে।'' 'ডাকঘর' নাটকে প্রহরীর এই কথা শুনে অমল বলেছিল, ''কোথায় চলে যাচ্ছে? কোন দেশে?'' জবাবে প্রহরী বলেছিল, ''সে কথা কেউ জানে না।'' এই সংলাপ কেবল প্রহরী ও অমলের নয়। তা যেন মানুষের শাশ্বত জিজ্ঞাসার এক লেখ্য রূপ! আদিম যুগ থেকে মানুষকে ভাবিয়েছে সময়। দিন হচ্ছে, রাত হচ্ছে, গ্রীষ্ম আসছে, বর্ষা, শীত, বসন্ত... বদলে বদলে যায় চারপাশ। সময়ের এই হিসেবকে ধরতেই মানুষ সময়কে হাতের মুঠোয় ধরে রাখতে চেয়েছে। আজকের ঘড়ির সরল হিসেবে পৌঁছতে তাকে বিস্তর ঘাম ঝরাতে হয়েছে।

Advertisement

যান্ত্রিক ঘড়ি (পেন্ডুলাম ঘড়ি আসতে তখন অবশ্য অনেক বাকি) পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছিল ত্রয়োদশ শতাব্দীতে। তার আগে পর্যন্ত মূলত সূর্যঘড়ি, জলঘড়ি, বালিঘড়ির রাজত্ব। কিন্তু সময়কে ভাগ করতে শিখল মানুষ। কীভাবে তাকে ধরতে শিখল হাতের মুঠোয়।
আদিম মানুষ কোনও যন্ত্রের ব্যবহারই জানত না। তারা চাঁদ, তারা, সূর্যকে পর্যবেক্ষণ করে একটা মোটামুটি সময়ের হিসেব শিখে নিয়েছিল। আসলে সময়ের প্রয়োজনীয়তা চিরকালই ছিল। শিকারে যাওয়া, ফেরা ইত্যাদি সব হিসেব করতে সময়ের দরকার ছিল প্রতি পদে। তাই চাঁদের বাড়া-কমা, এককথায় চন্দ্রকলা, ঋতু পরিবর্তন ইত্যাদি দেখে তারা হিসেব কষে ফেলত।

স্মার্ট ওয়াচ কেবল ততক্ষণই, যতক্ষণ দরকার

দিন হচ্ছে, রাত হচ্ছে, গ্রীষ্ম আসছে, বর্ষা, শীত, বসন্ত... বদলে বদলে যায় চারপাশ। সময়ের এই হিসেবকে ধরতেই মানুষ সময়কে হাতের মুঠোয় ধরে রাখতে চেয়েছে।

কিন্তু এই নিয়ম যথেষ্ট ছিল না। নির্দিষ্ট হিসেব ধরে রাখতে দরকার আরও পাকাপোক্ত কিছু। আর সেই কারণেই ২২০০ থেকে ২৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে উদ্ভাবন হল সূর্যঘড়ির। তবে এরও অনেক আগে ৪১০০ থেকে ১৭৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার মানুষ শিখে ফেলেছিল দিন মোটামুটি ২৪ ঘণ্টায়। ৬০ মিনিটে একটি ঘণ্টা। সূর্য, নক্ষত্র ও জলঘড়ির হিসেবেই তারা এই হিসাব শিখেছিল। এর মধ্যে জলঘড়ি এমন এক যন্ত্র, যেখানে এক পাত্র থেকে অন্য পাত্রে জল যাওয়ার সময়কে হিসেব করেই গোটা সময়টাকে পড়ে ফেলা যেত। ১৫৫০-১০৬৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে প্রাচীন মিশরীয়রাও জেনে গিয়েছিল ২৪ ঘণ্টায় একদিন হয়। কিন্তু তাদের দিনের হিসেব ছিল কিছুটা গোলমেলে। গরমকালে এক ঘণ্টা যতক্ষণে হত, শীতে সেই হিসেব আরও দীর্ঘ হত। যাই হোক, দিন ও রাতকে বারোটি অংশে ভাগ করা গিয়েছিল বলেই সেখান থেকে ২৪ ঘণ্টা ও ৬০ মিনিটের হিসেবটা এসেছিল।

এখানে একটা কথা বলা যাক। সময়ের হিসেবের ক্ষেত্রে ধর্মেরও একটা ব্যাপার ছিল। ডেভিস এস ল্যান্ডস তাঁর 'রেভোলিউশন ইন টাইম' বইয়ে দাবি করেছেন, ইসলাম ও অন্য ধর্মের চেয়ে খ্রিস্টধর্মে সময়ের কড়াকড়ি বেশি ছিল। অর্থাৎ ক্যাথলিক চার্চে মোটামুটি সাতটি প্রার্থনার প্রহর ছিল। যেমন মধ্যরাতে ছিল একটি প্রার্থনা। এভাবেই দিনের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রার্থনা। আর সেই হিসেব রাখতে প্রতিটি প্রার্থনার সঙ্গে পরেরটির পার্থক্য সমান হতে হত। তাই যান্ত্রিক ঘড়ির প্রয়োজনীয়তাও বেড়ে গিয়েছিল। তাছাড়া ইউরোপের মতো মহাদেশে, সূর্যের মুখ প্রায়ই ভার থাকে। মেঘের আড়ালে সে কখন কোথায় থাকছে ধরা মুশকিল। ছায়ার হিসেবেও করা কঠিন। তাই যাকে এককথায় টাইমপিস বলা হয় সেটার দরকার ছিল প্রবল ভাবেই।

১৫৫০-১০৬৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে প্রাচীন মিশরীয়রাও জেনে গিয়েছিল ২৪ ঘণ্টায় একদিন হয়। কিন্তু তাদের দিনের হিসেব ছিল কিছুটা গোলমেলে। গরমকালে এক ঘণ্টা যতক্ষণে হত, শীতে সেই হিসেব আরও দীর্ঘ হত।

প্রথম যান্ত্রিক ঘড়ি কে বানিয়েছিলেন, তা অবশ্য জানা যায় না। তবে ত্রয়োদশ শতাব্দী নাগাদ তা তৈরি হয়েছিল তা নিশ্চিত। প্রথম প্রথম ঘড়ি সময়কে নির্ধারণ করত মূলত অভিকর্ষকে কাজে লাগিয়ে। বলাই বাহুল্য, এতে সময়ের নিখুঁত হিসেব করা যেত না। মোটামুটি ১৫-৩০ মিনিটের মধ্যবর্তী সময়কেই কেবল তারা হিসেব করতে জানত। আর এই সব ঘড়ির ঠাঁই হত শহরের কেন্দ্রে। কিন্তু তখনও দাগ কাটা ঘড়ি আসেনি। তাই বিভিন্ন সময়ে ঘণ্টা বাজিয়ে সময় জানিয়ে দেওয়া হত।

পঞ্চদশ শতাব্দীতে প্যাঁচানো স্প্রিংয়ের সাহায্যে ঘড়ির 'এনার্জি'কে ধরে রাখার ব্যাপারটা শুরু হয়। তবে এক্ষেত্রেও সময়কে একেবারে নিখুঁত করে ধরা যায়নি। মনে করা হয়, তারা সেটা চায়ওনি। তাদের প্রাথমিক লক্ষ্যই ছিল ঘড়িটাকে আয়তনে ছোট করে আনা। যাতে সময় 'ব্যক্তিগত' হয়ে উঠতে পারে।

মোটামুটি ১৫-৩০ মিনিটের মধ্যবর্তী সময়কেই কেবল তারা হিসেব করতে জানত। আর এই সব ঘড়ির ঠাঁই হত শহরের কেন্দ্রে। কিন্তু তখনও দাগ কাটা ঘড়ি আসেনি।

অবশেষে এল ১৬৫৬। ওলন্দাজ বিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান হাইজেনস প্রথম পেন্ডুলামওয়ালা ঘড়ি উদ্ভাবন করতে পারলেন। এতে নির্ভুলতার হিসেবটা কমে দিনে ১৫ সেকেন্ডের সীমার মধ্যে চলে এল। প্রতিটি দোলন সম্পন্ন হতে এখন প্রায় হুবহু একই সময় লাগতে শুরু করেছে। ফলে সময়ের এই নিখুঁত হিসেবকে কাজে লাগিয়ে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা সম্পন্ন করা হতে লাগল।
এটা মোটামুটি ইউরোপের হিসেবে। বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে, সময় পরিমাপক যন্ত্রের ইতিহাসও বহু শতাব্দী প্রাচীন। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে আরবে এমন এক ধরনের যন্ত্র উদ্ভাবিত হল যা সময় গণনা করত। এতে নানা চাকা বা গিয়ার ব্যবহৃত হত। নাবিকরা সমুদ্রে সময়ের হিসেব রাখত এমন সব যন্ত্র দিয়ে। এপ্রসঙ্গে প্রাচীন গ্রিসের ‘অ্যান্টিকাইথেরা মেকানিজম’-এর কথা বলা যায়। একে অনেকেই বিশ্বের প্রথম কম্পিউটার বলে দাবি করেন। এদিকে চিনে ছিল সু সং-এর জ্যোতির্বিজ্ঞানসম্মত ঘড়ি। ১০৮৮ খ্রিস্টাব্দে তৈরি এই ঘড়ি জলশক্তি দ্বারা চালিত হত। সুতরাং, ইউরোপে ঘড়ি আবিষ্কৃত হলেও, আরব ও চিন কিন্তু আরও আগেই অনেকটা এগিয়ে যেতে পেরেছিল।

এরপর ঘড়ি বেয়ে অনেকটা সময় পেরিয়ে এসেছি আমরা। বিংশ শতাব্দীতে কোয়ার্টজ ঘড়ি এসেছে। তারও পরে এসেছে পারমাণবিক ঘড়ি। যা সময়ের চুলচেরা হিসেব করতে পারে। একে একেবারে নিখুঁত বলা চলে। কিন্তু এহেন ঘড়ির কারিগরি ও প্রযুক্তি দেখে বিস্মিক হওয়ার সময় মাথায় রাখতে হবে আমাদের পূর্বপুরুষদের, যাঁরা সামান্য পুঁজিতেই স্রেফ মগজাস্ত্র নির্ভর করে সময়ের টুঁটি কামড়ে ধরতে পেরেছিলেন।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement